দাও তো, আমি একবার দেখি।
নন্দিনীকে রিসিভারটা দিয়ে শোওয়ার ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। তারপর জলে ভেজা নন্দিনীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগলাম। ও ছোট-ছোট আদুরে শব্দের ফাঁকে-ফাঁকে ফোনে কথা বলতে লাগল। আমি আদর করতে-করতে ওর কথাগুলো শুনতে পাচ্ছিলাম।
হ্যালো, নন্দিনী বলছি। হ্যাঁ, বলো। এই তো, ঘরেই রয়েছে। না, ডক্টর বাসুকে ফোন করিনি। পরশুদিন একেবারে ওকে নিয়ে যাব। তুমি কী করছ এখন? আমি? আমি এই তো গা ধুয়ে বেরোলাম। ইয়ারকি কোরো না। তুমি কবে আসছ? আচ্ছা। রেখে দিই তা হলে—।
ফোন রেখে দিল নন্দিনী। ওর ‘উঁ’, ‘আঃ—’ শব্দগুলো এবার জোরে হতে লাগল। ও আমাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যেসব আলগা আপত্তি করছিল সেগুলো যে আসলে কোনও আপত্তিই নয় তা এই তিন বছরে আমি ভালো করে জেনে গেছি।
সুতরাং ভিজে শাড়িটা ওর গা থেকে খসিয়ে দিলাম। তারপর ওকে নিয়ে গেলাম বিছানার কাছে। ঘরের জানলা-দরজা বন্ধ, আর পরদা ঢাকা আয়নায় আবছাভাবেও কাউকে নজরে পড়ছে না। তা হলে ফুলশয্যা হতে আর বাধা কী!
আদর-ভালোবাসার দমকে আয়নার দিকে তাকানোর কথা খেয়াল ছিল না। কিন্তু সবকিছুর শেষে ক্লান্ত দেহে যখন শুয়ে আছি, তখনই লোকটাকে দেখতে পেলাম। আয়নার বাঁ-দিকের এককোণে ওর বাঁ-চোখ আর চুলের খানিকটা দেখা যাচ্ছে।
আমি বিছানায় উঠে বসতেই লোকটা সরে গেল।
নন্দিনী অবাক চোখে আমাকে একবার দেখল, তারপর বলল, কী হল!
সেই লোকটা।—আমি আয়নার দিকে চোখ রেখেই জবাব দিলাম।
ও—।
নন্দিনী বিছানা ছেড়ে উঠে মেঝেতে পড়ে থাকা ভিজে শাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল।
আমি কিছুক্ষণ অলসভাবে শুয়ে রইলাম। ভাবতে লাগলাম আমার থিয়োরিটার কথা। লোকটার নিশ্চয়ই কোনও খারাপ মতলব আছে। হয়তো সুযোগ বুঝে ও ওই দরজা পেরিয়ে চলে আসবে আমাদের জগতে। ঢুকে পড়বে আমাদের ফ্ল্যাটে। তারপর সাংঘাতিক কিছু একটা কাণ্ড করে…।
আমার মাথাটা কেমন দপদপ করছিল। বোধহয় টেনশানটা বাড়ছে। নাঃ, একটু রাস্তায় বেরোই, পায়চারি করে মাথাটা হালকা করে আসি।
নন্দিনীকে বলে ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। কাছেই একটা মাঠ আছে, সেখানে বসে একটু জিরিয়ে নেব।
ফুটপাথ ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় গাড়ির হেডলাইটের আলোয় একটা লোককে হঠাৎই দীপেশ বলে মনে হল। আমি চেঁচিয়ে ওকে ডাকতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু গাড়িটা চলে যেতেই রাস্তাটা এমন অন্ধকার হয়ে গেল যে, ধন্দে পড়ে গেলাম। বোধহয় দীপেশ না, অন্য লোক। দীপেশকে কাছে পেলে আমি খুব ভরসা পেতাম। তাই কখনও ওকে কাছছাড়া করতে চাইতাম না। কিন্তু সেসব দিন এখন কোথায়!
খোলা মাঠে ঠান্ডা বাতাসে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে ফিরে চললাম বাড়ির দিকে।
ফ্ল্যাটের দরজায় এসেই ভেতর থেকে হাসি আর কথাবার্তার শব্দ শুনতে পেলাম। কী ভেবে কান পাতলাম দরজায়।
ওঃ, সন্দীপের নতুন থিয়োরির জবাব নেই!—কোনও পুরুষের ভারি গলা। তারপর আমার গলা নকল করে ব্যঙ্গের সুরে সে বলল, আমার কী মনে হয় জানিস? ড্রেসিং-টেবিলের ওই আয়নাটা আসলে একটা দরজা।—তারপরই দরাজ গলায় অট্টহাসি।
এবার নন্দিনীর গলা শুনলাম: ওর আজগুবি ফ্যানটাসি নিয়ে ওকে থাকতে দাও। ওষুধপত্র খাচ্ছে—কদিনেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ডক্টর বাসু বলেছেন, ওকে কখনও কনট্রাডিক্ট না-করতে। বলেছেন, ওর সব গল্পে সায় দিয়ে যেতে।
তাই তো দিচ্ছি। ও কোথায় গেছে এখন?
এই আশেপাশে একটু পায়চারি করতে গেছে। এখুনি এসে পড়বে।
আমি কলিংবেলের বোতামে চাপ দিলাম। সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের ভেতরে কথাবার্তা থেমে গেল।
নন্দিনী দরজা খুলল। আমাকে দেখেই মিষ্টি করে হাসল, বলল, কী, বেড়ানো হল?
আমি অল্প হেসে ‘হুঁ’ বলে জবাব দিলাম। ওকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দীপেশকে দেখতে পেলাম। ও সহজভাবে হাসতে চেষ্টা করল, বলল, কী রে, কেমন আছিস?
না, কিছুতেই ওদের বুঝতে দেব না যে, ওদের কথাবার্তা আমি শুনে ফেলেছি। তাই বললাম, ভালো।—তারপর শোওয়ার ঘরের দিকে যেতে-যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে যোগ করলাম: ওষুধ তো খাচ্ছি—কদিনেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
লক্ষ করলাম, পলকের জন্যে নন্দিনী আর দীপেশের মধ্যে চোখাচোখি হল।
আমি শোওয়ার ঘরে ঢুকে গায়ের জামাটা খুলে সটান বিছানায় শুয়ে পড়লাম। বেশ বুঝতে পারছিলাম, সাংঘাতিক একটা কিছু না-হওয়া পর্যন্ত ওই লোকটার কথা ওরা কিছুতেই বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আগের দিন আমার থিরোরির কথা শুনে দীপেশ তো একটুও ঠাট্টা করেনি! আর নন্দিনীও তো কখনও আমার কথায় প্রতিবাদ করেনি! এ-সবই কি ওদের অভিনয়? নাকি ডক্টর বাসু ওদের যেরকম শিখিয়ে দিয়েছেন ওরা সেরকমই ব্যবহার করছে আমার সঙ্গে।
একটু পরেই ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করার আওয়াজ পেলাম। বুঝলাম, দীপেশ চলে গেল।
আমি চোখ বুজে শুয়ে রইলাম। নন্দিনীর সঙ্গেও এখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ওরা ওদের বিশ্বাসে নিয়ে থাক। দীপেশ যত পারে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করুক আমাকে। কিন্তু আমার বিশ্বাস ওরা চিড় ধরাতে পারবে না কিছুতেই।
আমার মন বলছে, আয়নার ওই লোকটার মতলব মোটেই ভালো নয়।
শেষ
যা ভয় করছিলাম শেষ পর্যন্ত তাই হল। লোকটাই জিতে গেল শেষ পর্যন্ত। ওকে কিছুতেই আটকাতে পারলাম না।
রাত্র তখন কটা হবে? বড়জোর সাড়ে এগারোটা। আমি বাথরুমে গিয়েছিলাম। বাথরুম থেকে বেরিয়ে শোওয়ার ঘরে ঢুকেই দেখি নন্দিনী কেমন অদ্ভুতভাবে বিছানায় শুয়ে আছে। একটা হাত বুকের ওপরে, আর একটা হাত ছড়ানো। শাড়িটা উঠে গেছে হাঁটু পর্যন্ত। চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
