আমার ভালোবাসায় বাধা দেওয়ার ছল করে নন্দিনী বলল, একটু ঘুমোও না, তা হলে টেনশানটা একটু কমবে।
আমি হাসলাম, বললাম, টেনশান কমানোর এটাই সবচেয়ে ভালো ওষুধ—ট্যাবলেট বা সিরাপ নয়।
জানলাগুলোয় পরদা টানা ছিল। তাই ঘরে হালকা ছায়ায় একটা আস্তরণ ছিল। কিন্তু তাতে নন্দিনীকে আগাপাস্তলা দেখতে কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না আমার। ওর শরীর নিয়ে পাগলামি করতে-করতেই কী যে হল, হঠাৎ করে চোখ গেল আয়নার দিকে।
আবছা আঁধার এবং লেসের কাজ করা পরদা থাকা সত্ত্বেও লোভী ছায়াটাকে আমি দেখতে পেলাম। আমি ঝটকা মেরে উঠে বসতেই ছায়াটা সড়াৎ করে সরে গেল।
নন্দিনী অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, কী হল?
ওই লোকটা।—আয়নার দিকে দেখালাম আমি, বললাম, ওঃ, অসহ্য হয়ে উঠেছে।
নন্দিনী কোনও কথা না বলে চুপচাপ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ পর ছোট্ট করে বলল, এবার শুয়ে পড়ো। সন্ধেবেলা দীপেশ এলে ওকে বলে দেখি কী বলে—।
ওর কথামতো চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম বিছানায়। চোখের ওপর হাত চাপা দিয়ে নানান কথা ভাবতে লাগলাম। নাঃ, সন্ধেবেলা দীপেশকে ব্যাপারটা বলতেই হবে।
সন্ধেবেলা দীপেশ এল। ওর কলিংবেল বাজানোর নিজস্ব একটা ঢং আছে। শুধু কলিংবেল কেন, সব ব্যাপারেই ওর নিজস্ব কতকগুলো ঢং আছে। মনে পড়ে, ইউনিভার্সিটির দিনগুলোয় আমি লুকিয়ে-লুকিয়ে ওকে নকল করার চেষ্টা করতাম। ওকে আমার মাঝে-মাঝে হিংসে হত। এখনও যে হয় না তা নয়।
ডাইনিং স্পেসে টিভি চালিয়ে চায়ের আসর বসিয়েছিলাম আমরা তিনজনে। এ-কথা সে-কথার মাঝে নন্দিনীই ফস করে বলে বসল লোকটার কথা। আমি ভেবেছিলাম দীপেশ হো-হো করে হেসে উঠবে, কিন্তু ও হাসল না। সিরিয়াস মুখ করে লোকটার সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করতে লাগল আমাকে কেমন দেখতে, কখন-কখন উঁকি মেরে নন্দিনীকে দ্যাখে, আমাকে দেখিয়ে নন্দিনীকে কোনওরকম কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে কি না, ইত্যাদি-ইত্যাদি।
আমি তখন একটু ভরসা পেয়ে সামান্য ইতস্তত করে নতুন থিয়োরিটার কথা দীপেশকে বলে ফেললাম।
আমার কী মনে হয় জানিস? ড্রেসিং-টেবিলের ওই আয়নাটা আসলে একটা দরজা—।
দরজা!—অবাক হয়ে নন্দিনী বলল।
আর-একটু বুঝিয়ে বল তো।—দীপেশ চেয়ারে নড়েচড়ে বসল। হাতের সিগারেটে টান দিতে ভুলে গেল।
আমি হয়তো বিব্রত হয়ে পড়তাম, কিন্তু দীপেশের আগ্রহ আমাকে ভরসা দিল।
একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে আমি বললাম, হ্যাঁ, দরজা। দরজার একপাশে হচ্ছে আমাদের জগৎ—মানে, আমাদের এই ফ্ল্যাট, শোওয়ার ঘর, রান্নাঘর, এইসব। আর অন্যদিকে ওই লোকটার দুনিয়া। আয়নাটা হচ্ছে এই দুটো জগতের মাঝের দরজা। আমরা সেই দরজা দিয়ে যাতায়াত করতে পারি না, কিন্তু লোকটা হয়তো পারে—কে জানে!
আমি ভাবছিলাম, আমার কথায় দীপেশ আর নন্দিনী হয়তো হো-হো করে হেসে উঠবে। কিন্তু না, ওরা কেউই হাসল না আমার থিয়োরি শুনে। নন্দিনী একবার চিন্তিত মুখে তাকাল দীপেশের দিকে। দীপেশ গম্ভীরভাবে আমাকে কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে দেখল। তারপর জিগ্যেস করল, আর কী-কী মনে হয় তোর?
এইজন্যেই দীপেশের জবাব নেই। ও আর-একজনের মনের অবস্থা সবসময় ঠিক-ঠিক বুঝতে পারে। এইজন্যেই কারও কাছের মানুষ হয়ে উঠতে ওর এতটুকু দেরি হয় না।
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললাম, আমার আরও কী মনে হয় জানিস! ওই লোকটা নির্ঘাত কোনও বদ মতলবে ঘুরঘুর করছে।
কী মতলব?
সেটাই তো এখনও বুঝতে পারছি না।
তারপর কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ।
একসময় দীপেশ বলল, সন্দীপ, তুই লোকটাকে যেমন লক্ষ রাখছিস সেরকম লক্ষ রাখ। এটা নিয়ে এক্ষুনি থানা-পুলিশ করা ঠিক হবে না। ব্যাপারটা নিজেদের মধ্যে থাকাই ভালো। আমি আজ চলি, নন্দিনী, তোরা একটু সাবধানে থাকিস।
দীপেশ চলে যাওয়ার পর সুখীকে একপ্যাকেট সিগারেট কিনতে পাঠালাম। নন্দিনীকে একা পেয়ে জাপটে ধরে দুটো চুমু খেয়ে বললাম, শুনলি তো, এখন থেকে তোকে সাবধানে থাকতে হবে।
নন্দিনী অদ্ভুত হেসে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, এখন না, রাতে।—তারপর চলে গেল রান্নাঘরের দিকে।
আমি টিভিটা অফ করে দিয়ে চলে এলাম শোওয়ার ঘরে। প্যাকেটের শেষ সিগারেটটা ধরিয়ে ড্রেসিং-টেবিলের আয়নার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালাম। আয়নার পরদা সরিয়ে দিয়ে ঠান্ডা কাচে হাত দিলাম। এটা আসলে দরজা! ভাবা যায়! ওই লোকটা কোথায় গেল?
আয়না লক্ষ করে কয়েকবার সিগারেটের ধোঁয়া ছুড়ে দিলাম। তারপর আয়নার খুব কাছে ঝুঁকে পড়ে চাপা গলায় জিগ্যেস করলাম, আয়না, তুই সত্যি করে বল, কাকে তুই লুকিয়ে রেখেছিস—।
আয়না কোনও উত্তর দিল না।
শুধু আমার প্রতিবিম্ব আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তিন
আজ একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছে। তবে আমি সেটা জানতে পেরেছি এটা নন্দিনী বা দীপেশ—কাউকে বুঝতে দিইনি।
সন্ধের পর একটা ফোন এল। আমিই ফোনটা ধরলাম। তারপর ‘হ্যালো’ বলা সত্ত্বেও ও-প্রান্ত থেকে কোনও উত্তর নেই। তবে মনোযোগ দিয়ে কান পেতে শুনতে পেলাম ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।
নন্দিনী বাথরুমে গা ধুতে ঢুকেছে। সুতরাং আরও কয়েকবার চেঁচিয়ে ‘হ্যালো’ বলে ফোন রেখে দিতে যাচ্ছি, শুনতে পেলাম ‘খটাস’ করে বাথরুমের দরজার ছিটকিনি খোলার শব্দ। তাকিয়ে দেখি, ভেজা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে নন্দিনী এগিয়ে আসছে।
