নন্দিনীকে ইশারা করে বারণ করলাম, দীপেশকে এখন যেন কিছু না বলে।
নন্দিনী আমাকে আশ্বস্ত করে হাসল। তারপর রিসিভার নামিয়ে রাখল। রাখার সময় স্পষ্ট দেখলাম, রিসিভারটা ওর বাঁ-দিকের বুকে ঘষে গেল। রিসিভারটাকে হিংসে হল আমার।
নন্দিনীকে কাছে ডাকতে যাব, অমনি কলিংবেল বেজে উঠল। ও আমাকে লক্ষ করে জিভ ভেঙাল। বলল, পদ্ম না-এলে আমার কপালে বোধহয় একটি ফোঁটাও বিশ্রাম জুটত না। দীপেশ এলে বলব, তুমি একটুও কথা শোনো না।
নন্দিনী দরজা খুলতে গেল।
আর ঠিক তখনই একটা আবছা ছায়া আয়নার ওপরে আড়াআড়ি সরে গেল যেন।
দুই
নন্দিনী অলস ভঙ্গিতে চিৎ হয়ে শুয়ে ছিল বিছানায়। ঘরের নাইট-ল্যাম্প জ্বলছে। তার নীল আলোয় নন্দিনীর শাড়ির রং ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না। তবে বিছানা ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা চারজন লোককে দিব্যি দেখা যাচ্ছে। ওদের মুখ অস্পষ্ট হলেও উদ্দেশ্য মোটেই অস্পষ্ট নয়। ওদের মধ্যে একজন ক্ষিপ্র হাতে খপ করে চেপে ধরল নন্দিনীর শাড়ি। তারপর একটা উল্লাসের হেঁচকি তুলে শাড়িটা টানতে শুরু করল। বিছানায় নন্দিনীর দেহটা সাপের মতো মোচড় খাচ্ছে, আর শাড়িটা একটু-একটু করে খুলে আসছে ওর শরীর থেকে। বাকি তিনজন লোক নন্দিনীর বস্ত্রহরণ চুপচাপ দেখছে। আবছা আলোতেও ওদের চোখে ফুটে ওঠা তৃপ্তি বেশ বোঝা যাচ্ছে।
আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। ক্ষিপ্তের মতো চিৎকার করে উঠলাম। সঙ্গে-সঙ্গে ওই চারজন দস্যু চমকে উঠে এপাশ-ওপাশ তাকাল। তারপর এক অলৌকিক প্রক্রিয়ায় চারজন গায়ে-গায়ে মিশে একজন মানুষ হয়ে গেল। এবং সেই লোকটা একছুটে চলে গেল ড্রেসিং-টেবিলের আয়নার কাছে। আয়নার পরদা সরিয়ে চোখের পলকে ঢুকে গেল আয়নার ভেতরে।
আমার ঘুম ভেঙে গেল।
স্বপ্নের মধ্যেই বোধহয় চিৎকার করে উঠেছিলাম। কারণ, দেখি, নন্দিনী আলুথালু বেশে উঠে বসে আমার বুকে হাত বোলাচ্ছে, মাথায় হাত বোলাচ্ছে, কপালে-গালে ভয়-ভাঙানো চুমু খাচ্ছে।
কী হয়েছে রে? বাজে স্বপ্ন দেখেছিস?—নন্দিনীর গলায় উৎকণ্ঠা।
হ্যাঁ, খুব বাজে স্বপ্ন।—বড় বড় শ্বাস নিতে-নিতে আমি বললাম, আয়নার ওই লোকটা তোর শাড়ি ধরে…শাড়ি ধরে…।
থাক, থাক। এখন ঘুমো।
আমাকে একগ্লাস জল দিল ও। ঢকঢক করে জল খেয়ে ওর নরম বুকে মুখ গুঁজে আমি শুয়ে পড়লাম।
পরদিন সকাল থেকে লোকটাকে আর দেখতে পেলাম না। আমি নানা অছিলায় আয়নার কাছাকাছি ঘুরঘুর করতে লাগলাম। নন্দিনী ঘরকন্নার কাজের ফাঁকে-ফাঁকে আমাকে লক্ষ করছিল। ওর নজর দেখেই বুঝলাম আমার মতলব ও ধরে ফেলেছে, কিন্তু আমাকে কিছু বলল না।
বেলার দিকে একবার ফোন বেজে উঠতেই আমি ফোন ধরলাম। নন্দিনী রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে-মুছতে ছুটে আসছিল ফোন ধরতে। কিন্তু আমাকে রিসিভার তুলতে দেখেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। অপেক্ষা করতে লাগল।
আমি টেলিফোনে কথা বললাম।
হ্যালা—
কোনও উত্তর নেই। তবে টের পেলাম, ও-প্রাপ্ত শোনা যাচ্ছে ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।
আমি আরও বেশ কয়েকবার ‘হ্যালো-হ্যালো’ বললাম, কিন্তু কোনও লাভ হল না।
আমি আয়নার দিকে একবার তাকালাম। নাঃ, সেখানে কেউ নেই।
রিসিভার নামিয়ে রাখতে যাচ্ছি, নন্দিনী সাত-তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আমাকে দাও, আমি একবার চেষ্টা করে দেখি।
আমি রিসিভারটা ওকে বাড়িয়ে দিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলাম। আয়নার দিকে না-দেখার ভান করে আড়চোখে নজর রাখলাম—যদি শয়তানটা উঁকিঝুঁকি মারে।
হঠাৎই খেয়াল করলাম, টেলিফোনে দিব্যি কথা চলছে। নন্দিনী কথা বলছে আর হাসছে।
একটু পরেই কথা শেষ করে ও রান্নাঘরে চলে গেল। যাওয়ার আগে আমাকে মিষ্টি করে বলে গেল, বারোটার সময় ওষুধটা খেতে ভুলো না।
রান্নাঘর থেকে পদ্মর মশলা বাটার শব্দ আসছিল। আর নন্দিনী সেখানে ঢুকেই কড়াইয়ের ফুটন্ত তেলে বোধহয় কিছু ছাড়ল। কারণ ‘ছ্যাঁক’ করে এমন শব্দ হল যে, মনে হল আমার কপালে ছ্যাঁকা লেগেছে।
বিছানায় চুপচাপ বসে বিশ্রাম নিতে লাগলাম। টেনশান কাটাতে ডাক্তারবাবু আমাকে বিশ্রাম নিতে বলেছেন! কিন্তু ডক্টর বাসু তো আর আয়নার ওই লোকটার কথা জানেন না!
লোকটার কথা ভাবতে-ভাবতেই অলস চোখে জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে রইলাম। আমার মাথার ভেতরে কোথাও একটা টেলিফোন ক্রমাগত বেজে যাচ্ছিল।
জানলার বাইরে চড়া রোদ্দুর। উলটোদিকের ফ্ল্যাটের কার্নিশে একটা মেয়ে-চড়ুই চুপচাপ দাঁড়িয়ে। একটা কাম-জর্জর পুরুষ-চড়ুই দু-পাশে ডানা নামিয়ে মুখটা উদাসীনভাবে ওপরে তুলে মেয়ে-চড়ুইটিকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে।
অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে একটা থিয়োরি মাথায় এল। মানে, ওই অসভ্য লোকটার ব্যাপারে। যতই ভাবতে লাগলাম, থিয়োরিটা ততই কম অবাস্তব ঠেকতে লাগল। কিন্তু না, নন্দিনীকে এখন বলব না। শুনলে ও হয়তো খিলখিল করে হেসে উঠবে। তারপর বলবে, না রে, তোর টেনশান এখনও কাটেনি।
নন্দিনী মনে হয় আমার কথায় খুব একটা আমল দিচ্ছে না। দীপেশ বললে ব্যাপারটাকে ও কিন্তু এরকম হালকাভাবে উড়িয়ে দিতে পারত না। আজ সন্ধেবেলা দীপেশ যদি আসে তা হলে সবকিছু ওকে বলব। বলা দরকার। তা না-হলে আয়নার ওই লোকটা দিন-দিন আমার মাথায় চড়ে বসবে।
ঘোর দুপুরে নন্দিনীকে বিছানায় কাছে পেয়ে আমি কয়েকঘণ্টা আগে দেখা কার্নিশের চড়ুই পাখিটার মতো হয়ে গেলাম। সুখী পাশের ছোট ঘরটার মেঝেতে শুয়ে পড়েছে। আর আমাদের ঘরে ঢোকার সব দরজাই বন্ধ। সুতরাং আমরা দুজনে এখন দুজনের।
