বিয়ের আগে আমাদের ‘তুই-তুই’ প্রেম ছিল। বিয়ের পরেও আদুরে ভালোবাসা জানাতে আমরা দুজনে-দুজনকে ‘তুই’ বলে ডাকি। কিন্তু ওর মুখে ‘ওষুধ’ শব্দটা শুনেই আমার আদুরে ভালোবাসা বিগড়ে গেল।
অফিসের কাজের চাপে আমার টেনশান হয় বলে নন্দিনী একরকম জোর করেই আমাকে একদিন ডক্টর সোমেন বাসুর কাছে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে মাসে একবার করে ডক্টর বাসুকে দেখাতে যাই। ইনি কী দেখেন ভগবান জানেন! তবে কী একটা বিচ্ছিরি ট্যাবলেট আর সিরাপ খেতে দিয়েছেন। নন্দিনীর খেয়াল আর যত্নে একটিবেলাও সে-ওষুধ বাদ দেওয়ার জো নেই। আর সাম্প্রতিক ছুটি নেওয়ার পরামর্শটাও ওই মহা-চিকিৎসকের।
নন্দিনীকে আমি রাগাতে চাই না। তাই ওর বুকে মুখ গুঁজে বললাম, হ্যাঁ, ওষুধ খেয়েছি।
নন্দিনী কোনও কথা না-বলে আমার মাথাটা বুকে চেপে রেখে আমার চুলে বিলি কাটতে লাগল।
আমার বেশ ভালো লাগছিল। কিছুক্ষণের জন্যে বেমালুম ভুলে গেলাম অসভ্য লোকটার কথা।
পদ্ম নামে একটি বউ আমাদের ঠিকে কাজ করে দেয়। ওর আসার কথা সকাল আটটায়, কিন্তু প্রায় রোজই আসে সাড়ে ন’টা-দশটায়। ওর দেরি দেখে আমি রেগে যাই, অথচ নন্দিনী ওকে কিছু বলে না। কী করে পদ্ম ওর বউদিমণিকে ম্যানেজ করে রেখেছে কে জানে!
আজও পদ্ম আসতে দেরি করছে। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। নিশ্চিন্তে নন্দিনীর আদর খেতে পারছি। পদ্মর মেয়ে সুখী আসে বেলা বারোটা নাগাদ। এসে সারাটা দিন নন্দিনীর কাছেই থাকে, আর দরকার হলে ফাইফরমাশ খাটে। রাত ন’টা বাজলে খেয়েদেয়ে মেয়েটা মায়ের ডেরায় চলে যায়।
তোর কী হয়েছে বল তো!—নন্দিনী আমাকে আলতো করে জিগ্যেস করল।
আমি ওর বুকের মধ্যেই আড়ষ্টভাবে সামান্য মাথা নেড়ে বললাম, কিচ্ছু না। শুধু ওই অসভ্য লোকটাকে আমি সহ্য করতে পারছি না। লোকটা সবসময় ওই আয়নার আড়াল থেকে তোকে দ্যাখে।
কথাটা বলেই আমি ঘাড় সামান্য ঘুরিয়ে আড়চোখে তাকালাম আয়নাটার দিকে। ওটার ওপরে লেসের পরদা টানা ছিল। কিন্তু তবু যেন আমি একটা অস্পষ্ট ছায়াকে চট করে সরে যেতে দেখলাম। চোখগুলো বড়-বড়। ঠোঁটের কোণে লোভাতুর হাসি।
নন্দিনীকে কিছু বলার আগেই ও বলে উঠল, সন্দীপ, এসব নিয়ে তুই একদম ভাবিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।
নন্দিনী সান্ত্বনা দিলে কী হবে, আমি জানি, এত সহজে সব ঠিক হবে না। ওই লোকটার নিশ্চয়ই কোনও বদ মতলব আছে।
এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল। আমাকে সঙ্গে-সঙ্গে আলতো ঠেলায় সরিয়ে দিয়ে নন্দিনী এগিয়ে গেল টেলিফোনের দিকে। ওর পেছনটা বেশ ভারী। বিয়ের আগে এতটা ভারী ছিল না।
নন্দিনী টেলিফোনে মিষ্টি করে ‘হ্যালো’ বলল।
এটা কি সেই টেলিফোন?
মানে, কিছুদিন ধরে একটা ফোন আসছে, সেটা আমি ধরলেই সব চুপচাপ—কেউ কথা বলে না। শুধু দম নেওয়ার ‘ফোঁস-ফোঁস’ শব্দ শোনা যায় কয়েক লহমা। আর তারপরই লাইন কেটে যায়।
অথচ নন্দিনী যদি ফোন ধরে তা হলে আর লাইন কাটে না। কখনও সেই ফোনে কথা বলে নন্দিনীর মা, অথবা আমার ছোটপিসি, বা আমেরিকা থেকে নন্দিনীর বড়দা, আর নয়তো দীপেশ।
নন্দিনী টেলিফোনে কথা বলছিল। আমি হাঁ করে ওর কথাগুলো শুনছিলাম। কে ফোন করেছে এখন?
আমার মুখ দেখে নন্দিনী বোধহয় নীরব প্রশ্নটা টের পেল। রিসিভারের মুখে হাত চাপা দিয়ে ফিসফিসে গলায় বলল, দীপেশ—।
আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। দীপেশ আমাদের দুজনেরই বন্ধু। ইউনিভার্সিটিতে আমরা তিনজনে একসঙ্গে পড়েছি। দীপেশটা যাচ্ছেতাই নম্বর পেয়ে প্রত্যেক ইয়ারে ফার্স্ট হত। তার ওপর কী দারুণ চেহারা! আমার সঙ্গে তো একেবারে গলায়-গলায় ছিল। একসঙ্গে কত সিনেমা দেখেছি আমরা। তখন নন্দিনীর সঙ্গে আমার অতটা মাখামাখি ছিল না।
পাশ-টাশ করে একটা দারুণ ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে চাকরি নিয়ে দীপেশ স্টেটস-এ চলে গেল। আমিও চাকরি পেলাম। তার কিছুদিন পর নন্দিনীও চাকরিতে ঢুকল। চাকরি করা অবস্থায় আমাদের প্রেম চলেছিল বছরখানেক। কিন্তু তারপর আর পারা যাচ্ছিল না। নন্দিনীর বাবা একটা ফ্ল্যাট গিফট করতেই সব প্রবলেম সলভ হয়ে গেল। নন্দিনী চাকরি ছেড়ে দিল। বলল, সন্দীপ, চাকরির চেয়ে বিয়ে অনেক বেটার। তুই একা চালাতে পারবি না?
আমি ‘খুব পারব’ বলে ওকে জাপটে ধরে কোলে তুলে নিয়েছিলাম। আর তারপরই দু-গালে প্রচণ্ড ‘চকাৎ-চকাৎ’ শব্দে দুটো চুমু। নন্দিনী আচমকা বিব্রত হয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল, কী হচ্ছে! কী হচ্ছে!
আমি হেসে বলেছিলাম, সোনা, চুমুতে যখন বিকট শব্দ হয় তখন তাকে বলে হামি।
করিডর ধরে কে যেন এগিয়ে আসছিল। তাই তাড়াহুড়ো করে নন্দিনীকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছিলাম।
আমাদের বিয়ের মাসতিনেক পর দীপেশ কলকাতায় ফিরল। তারপর থেকে মাঝে-মাঝেই আসে আমাদের আস্তানায়। ওকে দেখলেই আমার ইউনিভার্সিটির দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। নন্দিনীর সঙ্গে পিরিত করার জন্যে ও আমাকে কম ওসকায়নি। বন্ধুবান্ধব সকলের মাঝে লুকিয়ে আমার পেছনে চিমটি কেটে বলেছিল, জাগো বাঙালি, লড়ে যাও।
নন্দিনী টেলিফোনে খুব হাসছিল। তারপরই খেয়াল করলাম ও দীপেশকে আমার কথা বলছে।
আমি আয়নার দিকে একবার আড়চোখে তাকালাম। না, সেখানে কাউকে দেখতে পেলাম না। কিন্তু দীপেশকে এখুনি ওই লোকটার কথা বলার দরকার নেই। ও কী মনে করবে কে জানে!
