এক
বলব না বলব না করেও শেষ পর্যন্ত লোকটার কথা নন্দিনীকে বলে ফেললাম।
লোকটাকে আমি গত তিনদিন ধরে লক্ষ্য করছি। সবসময় চোরের মতো আড়চোখে তাকিয়ে রয়েছে। প্রথম-প্রথম ভাবতাম, লোকটা বুঝি লুকিয়ে-চুরিয়ে আমাকে দ্যাখে। কিন্তু এই তিনদিনেই বুঝেছি, তা, আমাকে না—লোকটা লুকিয়ে-লুকিয়ে নন্দিনীকেই দেখার চেষ্টা করে।
অবশ্য সবসময় যে দ্যাখে তা নয়। লুকিয়ে দেখার জন্যে ও ঠিক মোক্ষম মুহুর্তগুলোই বেছে নেয়। যেমন, নন্দিনী বাথরুম থেকে স্নান সেরে ঘরে এলেই লোকটা তৈরি হয়ে যায়। ওর চোখের মণি ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়। গলার শিরা ফুলে ওঠে। ফরসা মুখে রক্তের ফোয়ারা ছোটে। সব মিলিয়ে লালসা মাখানো কামুকনজরে ও চোখ বড়-বড় করে নন্দিনীকে দেখতে থাকে। কারণ ও জানে, এক্ষুনি নন্দিনী কাপড় ছাড়বে। তারপর…ওঃ, অসহ্য!
আর নন্দিনীকেও বলিহারি যাই! জানি, সুন্দর করে সাজানো অ্যাটাচড বাথওয়ালা এই মাঝারি ফ্ল্যাট একেবারে আমাদের নিজের। বাথরুম থেকে স্নান সেরে নন্দিনী খালি গায়ে বেরোলেই-বা কে দেখতে পাবে—আমি ছাড়া! তখন ওর ফরসা গায়ে, বুকে, চুলে জলের ফোঁটা আটকে থাকে। এমনকী নাকের ডগায়, চোখের পাতায়, অথবা ঠোঁটেও ছুঁয়ে থাকে জলবিন্দু। তখন আমার তো আর মাথার ঠিক থাকে না, তাই ওকে জাপটে ধরে ঠোঁট দিয়ে সারা শরীরের জলের ফোঁটা মুছে নিই। আর স্পষ্ট বুঝতে পারি, কেন জলের আর-এক নাম জীবন। কারণ, ওই সময়ে নন্দিনীকে আদর করতে না-পারলে আমি মরে যেতাম।
বিয়ের পর তিনটে বছর দারুণ কেটে গিয়েছিল। দিনে বা রাতে আমাদের ভালোবাসায় কোনও হেরফের হত না। মনে হত, ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আমাদের ভালোবাসা যেমন ছিল, এখন তারই অ্যাকশান রিপ্লে চলছে। তা-ই চলত—যদি না মাঝখান থেকে ওই অসভ্য লোকটা এসে দেখা দিত।
ভোরবেলা নন্দিনী যখন বিছানা ছেড়ে ওঠে তখন সে এক দেখার মতোই দৃশ্য! যাকে বলে টপ। মানে টপলেস। ব্লাউজ-এর বালাই নেই। আর শাড়ি-সায়াটা বায়না-করা বাচ্চার মতো কোনওরকমে ওর কোমর আঁকড়ে ধরে ঝুলছে। তখন ঘুম জড়ানো চোখে যেই আমি নন্দিনীকে দেখি অমনি আমার ঘুম ছুটে যায়। হ্যাংলার মতো ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। অথচ, কিছুক্ষণ আগেই, সারারাত ধরে ওকে নিয়ে কত-না হামলা-হামলি করেছি। শরীর-মন-বিছানা সব উথালপাথাল। তবুও সকালের আলোয় ওর ওই ফরসা ইয়েগুলো দেখলে আমি কেমন ইয়ে হয়ে যাই। এইজন্যেই বোধহয় মুনি-ঋষিরা বলেছেন: লোভ অতি বিষম বস্তু।
তা এই লোভের টানেই বোধহয় ওই অসভ্য লোকটা তাক বুঝে উঁকিঝুঁকি মারে। ভোরবেলা নন্দিনীর ঘুমভাঙা থেকে শুরু হয় লোকটার নজরদারি কাজ। তারপর স্নান করতে যাওয়ার আগে-পরে। কাপড় ছাড়ার সময়। রাতে শুতে যাওয়ার সময়। এমনকী আধো-আঁধারি বিছানার দিকেও ওর নজর থাকে। অবশেষে সকালবেলার ব্যাপারটা তো আছেই।
লোকটার অসভ্যতার এত খুঁটিনাটি আমি টেরও পেতাম না, যদি-না অফিস থেকে দশদিনের ছুটি নিতাম। অফিসে কাজের টেনশান দিনকে-দিন বেড়েই চলেছিল। তাই ডাক্তারি পরামর্শে দশদিন ছুটি নিয়েছি—বিশ্রামের জন্যে। কিন্তু ওই লোকটা আমাকে বিশ্রাম দিল কই!
তিন-তিনটে দিন লোকটাকে ভালো করে লক্ষ করার পর আজ সকালে নন্দিনীকে ডেকে বললাম, অ্যাই শোনো—।
কী?
জানো, একটা অসভ্য লোক সবসময় লুকিয়ে-লুকিয়ে তোমাকে দ্যাখে!
নন্দিনী হেসে বলল, সে আর জানি না, সেই লোকটা তো এখনও আমাকে হ্যাংলার মতো দেখছে।—বলে আমার বুকে আঙুল দিয়ে টোকা মারল দু-বার।
আমি অধৈর্য হয়ে বললাম, আমি না, আমি না—একটা অন্য লোক।
নন্দিনী তখন বেশ ঘাবড়ে গেল। এক-পা পিছিয়ে গিয়ে চারপাশে তাকাল। তারপর অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, কে? কোথা থেকে দ্যাখে?
আমি দেখলাম, আর লুকিয়ে লাভ নেই। সুতরাং ওকে বলেই ফেললাম, লোকটাকে চিনি না। তবে লোকটা দ্যাখে ওই আয়নার ভেতর থেকে। —বলে আমি আঙুল তুলে ড্রেসিং-টেবিলের আয়নাটার দিকে দেখালাম।
এই ড্রেসিং-টেবিলটা বিয়ের সময় নন্দিনীর মা আমাদের দিয়েছিলেন। এটা তিনি আবার পেয়েছিলেন তাঁর মায়ের কাছ থেকে। অর্থাৎ অ্যান্টিক। আর চেহারা দেখেই তার আভিজাত্য দিব্যি বোঝা যায়। যেমন, মেহগনি কাঠ। সূক্ষ্ম কারুকাজ—যার মধ্যে রয়েছে শিল্পীর ধৈর্য ও দক্ষতার প্রমাণ। এ ছাড়া আয়নাটাও মাপে বেশ বড়। প্রায় ছ-ফুট উঁচু, আর চওড়ায় প্রায় দু-ফুট। তার ওপর আবার দু-পাশে দুটো ভাঁজ করা আয়নার ফালি জোড়া রয়েছে—পাখির ডানার মতো।
বিয়ের পর সময় করে আমি ড্রেসিং-টেবিলটাকে ভালো করে পালিশ করিয়ে নিয়েছিলাম। আর সুন্দর ঝালর দেওয়া সরু লেসের কাজ-করা পরদা ঝুলিয়ে দিয়েছি ওটার ওপরে। আমাদের ফ্ল্যাটে যে-ই আসুক, ড্রেসিং-টেবিলটা দেখে তারিফ না করে পারে না। বলে, দামি কাঠ, বেলজিয়ামের কাচ, ব্রিটিশ আমলের জিনিস, এর দাম কম করে দশ-পনেরো হাজার টাকা হবে।
এখন সেই অভিজাত ড্রেসিং-টেবিলের আয়নার আড়ালেই আশ্রয় নিয়েছে নির্লজ্জ বেহায়া অসভ্য লোকটা।
নন্দিনীকে আয়নাটা আঙুল দিয়ে দেখাতেই ওর মুখ পলকে খানিকটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। চট করে আমাকে টেনে নিয়ে গেল বিছানার কাছে। নরম গদির ওপরে ঠেলে বসিয়ে দিল আমাকে। গায়ে, মুখে, কপালে হাত বোলাতে-বোলাতে জিজ্যেস করল, সকালে ওষুধ খেয়েছিস?
© 2023 BnBoi - All Right Reserved
© 2023 BnBoi - All Right Reserved