দক্ষিণ দিকের শেষ ঘরটায় শুভদীপ ছিল। বিছানায় কাত হয়ে বসে টিভি দেখছিল। আমাকে দেখেই রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টিপে টিভি অফ করে দিল। সোজা হয়ে উঠে বসতে-বসতে ক্লিষ্ট হাসল। বলল, ‘আরে, এসো এসো…বোসো…।’
আমি টিভির প্লাগ পয়েন্টের সুইচটা অফ করে দিলাম। ঘরের ভেতরটায় একপলক চোখ বুলিয়ে নিলাম।
সর্বত্র বড়লোকী ছাপ। সবকিছুই সাজানো ফিটফাট।
আমি শুভদীপকে খুঁটিয়ে দেখলাম। প্রায় পাঁচ মাস পর ওকে আমি দেখছি। এর মধ্যে ও তেমন কিছু একটা পালটায়নি। অন্তত ওর বাইরেটা পালটায়নি।
কিন্তু ওর ভেতরটা যে পালটে যাচ্ছে সে-খবর আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে!
আমি একটা শৌখিন মোড়া টেনে নিয়ে ওর বিছানার কাছে বসলাম। ওর মুখে ক্লান্তি শ্রান্তির পাণ্ডুর ছাপ।
‘শুভ, তোমাকে কয়েকটা জরুরি কথা বলার আছে—।’
শুভ হেসে বলল, ‘তোমার মাত্র কয়েকটা কথা বলার আছে? আর আমার তোমাকে অনেক কথা বলার আছে।’
কথা শেষ করেই ও হেঁচকি তোলার মতো শব্দ করল। জোর করে ঢোক গিলে গলা দিয়ে উঠে আসা কোনও জিনিসকে রুখে দিল।
‘শুভ, আমার কথাগুলো মন দিয়ে শোনো—।’
ও আমাকে প্রায় বাধা দিয়ে বলল, ‘ভাবতেই পারছি না, তুমি আমার বাড়িতে এসে আমার বেডরুমে বসে গল্প করছ!’
ঠান্ডা গলায় বললাম, ‘আরও অনেক কিছুই তুমি ভাবতে পারবে না।’
হঠাৎই ও পেট খামচে ধরল। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। তারপর আমার দিকে একটু মাথা নেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি ঘরে বসেই ওর বমি করার শব্দ শুনতে পেলাম।
একটু পরেই ও মুখ-টুখ ধুয়ে ফিরে এল। ক্লান্ত পা ফেলে বিছানায় গিয়ে বসল।
‘কী, তোমার শরীর খারাপ না কি?’
‘হ্যাঁ, কয়েক মাস ধরেই এরকম হঠাৎ-হঠাৎ পেট ব্যথা করছে, বমি পাচ্ছে, গা গুলোচ্ছে। একটু পরেই আবার সব ঠিকঠাক । কী যে হয়েছে কিছু বুঝতেই পারছি না। ডাক্তার দেখিয়েছি। বলছে, কিছু হয়নি। হয়তো নতুন টাইপের কোনও ভাইরাল ইনফেকশান। কয়েকটা ট্যাবলেট দিয়েছে, কিন্তু তাতে…।’
বুঝলাম, কাজ শুরু হয়েছে। আর কেউ এই শরীর খারাপের রহস্য বুঝতে পারবে না।
আমি নিষ্ঠুর হেসে বললাম, ‘ডাক্তার দেখিয়ে কোনও লাভ নেই। তোমার কী হয়েছে আমি বলে দিচ্ছি।’
শুভ যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকে অবাক চোখে আমাকে দেখল: ‘তুমি আমাকে ভালো করে দাও, লিলু।’
‘এখন ভগবানও তোমাকে ভালো করতে পারবে না। শোনো, শুভ, কাল আমি এ-বাড়িতে এসেছিলাম। সুস্মিতার কথা সব শুনেছি।’
‘কে বলেছে? আশা?’
‘আশা কি ভালোবাসা, কী নাম আমি জানি না—তবে তোমাদের কাজের মেয়েটিই সব বলেছে।’
শুভদীপ বিরক্ত হয়ে চাপা গলায় বলে উঠল, ‘সুস্মিতা নিজের দোষে মরেছে। ওর মাথার দোষ ছিল।’
‘হ্যাঁ, মাথার দোষ তো ছিলই, নইলে তোমার মতো পাবলিককে বিয়ে করে! যাকগে, এবার জরুরি কথাগুলো শোনো—।’
ওকে মন্ত্রতন্ত্রের ব্যাপারগুলো খুলে বললাম।
শুভদীপ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল: ‘লিলু, আমার কাছে উইচও যা, স্যান্ডউইচও তাই। তুমি ঠাট্টা করছ।’
‘না, একটুও ঠাট্টা করছি না। তোমাকে তো আগেও বলেছি, আমি কী করে দিন চালাই। আর আমার বাড়িতে গিয়ে তুমি তুকতাকের জিনিসপত্রও দেখেছ—।’
শুভ ওর তলপেটে হাত বোলাতে লাগল। একটা বালিশ কোলে টেনে নিয়ে আরাম করে বসতে চাইল।
ওকে বললাম, ‘শুয়ে পড়ো, তা হলে আরাম পাবে।’
ও কী ভেবে সত্যিই খাটের মাথার দিকটায় হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ওর বুক ঠেলে।
তখন ওকে পুতুলটার কথা বললাম।
ও অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
নিস্তব্ধতা আমাদের ডুবিয়ে দিল।
তারপর ও হঠাৎ উঠে বসে একটা সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া ছেড়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, ‘তুকতাক, মারণ, উচাটন—তন্ত্রমন্ত্র! হুঁঃ! এসব বুজরুকি যারা বিশ্বাস করে তারাই ওতে ভয় পায়। আমি ওসবে বিশ্বাস করি না।’
আচমকা ওয়াক তুলল শুভদীপ। মুখ কুঁচকে গেল ওর। জোর করে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করল।
‘কিন্তু আমি ওসবে বিশ্বাস করি, শুভ। আর অবিশ্বাসীদের বিশ্বাস করাই। ক’-মাস ধরে তোমার গা-বমি, পেট ব্যথা, গা-ব্যথা, সব কি মিথ্যে? অবশ্য পুতুলটার কথা তখন তুমি জানতে না।’
‘ওসব কাকতালীয় ব্যাপার।’ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে ও বলল।
আমি মোড়া থেকে উঠে ওর কাছে এগিয়ে গেলাম। ওর একটা হাত ধরলাম। নরম গলায় বললাম, ‘শুভ, আজ শুধু তোমাকে সত্যি কথাই বলব। আর ক’-দিন পরেই এসব তন্ত্রমন্ত্রে তুমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে। কারণ, বাচ্চাটা তখন নড়বে-চড়বে, হাত-পা ছুড়বে—তুমি নিশ্চয়ই টের পাবে।’
এক ঝটকায় আমার হাতটা ছাড়িয়ে নিল শুভ। সিগারেটের শেষ টান দিয়ে গুঁজে দিল অ্যাশট্রেতে।
এমন সময় আশা আমার জন্যে জলখাবারের ট্রে নিয়ে এল। একটা টি-টেবিলে মিষ্টির প্লেট, চা-বিস্কুট ইত্যাদি সাজিয়ে দিয়ে ও চলে গেল।
ও চলে যেতেই শুভদীপ চেঁচিয়ে বলল, ‘তোমার ওসব নোংরা কথা আমি শুনতে চাই না। আমার গা ঘিনঘিন করছে। তুমি চটপট এগুলো খেয়ে চলে যাও…প্লিজ…।’
আমি টেবিলের কাছে গিয়ে একটা মিষ্টি মুখে দিলাম। সেটা খেতে-খেতে হাসলাম, বললাম, ‘বিশ বছর আগে আমিও ঠিক এইরকম হাত-পা ছোড়া নড়াচড়া টের পেয়েছিলাম। দাঁতের বদলে দাঁত, চোখের বদলে চোখ, বাচ্চার বদলে…।’
‘তুমি এক্ষুনি আমার বাড়ি থেকে বেরোও! এই মুহূর্তে।’ রাগে অন্ধ হয়ে চিৎকার করে উঠল শুভ। ও বিছানা থেকে নেমে এক পা এগিয়ে এল আমার দিকে।
