আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, ‘আর এগিয়ো না। আমাকে সুস্মিতা পাওনি। একটু বেচাল দেখলেই তোমার হাল আরও খারাপ করে ছাড়ব।’
বেশ বুঝতে পারছিলাম, শুভদীপের চোখ ওর দেখা লীলাকে আর একটুও চিনতে পারছিল না।
‘তুমি এক্ষুনি বেরিয়ে যাও!’ হুমকি দিয়ে বলল ও।
‘হ্যাঁ, যাব। এ সময়ে তোমার বিশ্রাম দরকার।’
‘আউট! কোনও কথা আমি শুনতে চাই না! আউট!’ আঙুল তুলে ও দরজা দেখিয়ে দিল আমাকে।
আর-একটা মিষ্টি নিয়ে মুখে দিলাম আমি। আজ তো মিষ্টিমুখ করারই দিন!
লক্ষ করলাম, শুভর চুল এলোমেলো, দু-চোখে ভয়।
আমি দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। পুতুলটার সব কথা ওকে বলা দরকার।
‘একটা কথা তোমাকে এখনও বলিনি—।’
‘তুমি এক্ষুনি বেরিয়ে যাও।’
‘চেঁচিয়ে কোনও লাভ নেই, শুভ। শোনো। পুতুলটা হচ্ছে অনেকটা অর্ধনারীশ্বর। ওটার ওপরের পোরশানটা মেয়ে, আর নীচের পোরশানটা ছেলে—।’
শুভ বিভ্রান্ত নজরে দেখতে লাগল আমাকে। আমার কথা ও ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেনি।
‘পুতুলটার পক্ষে মা হওয়া কী কষ্টের এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। ঠিক একইরকম কষ্ট তোমারও হবে।’
শুভদীপ থম মেরে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। ব্যাপারটা এখনও ওর কাছে বোধহয় স্পষ্ট হয়নি। পরে বুঝবে। দশ মাস দশ দিন যখন পূর্ণ হবে।
ওকে একটা চুমু ছুড়ে দিয়ে বিদায় নিলাম।
ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় আমার পা কাঁপছিল, মাথা টলে যেতে চাইছিল।
জ্বালাধরা চোখ নিয়ে আমি স্মৃতিকণাকে দেখতে পেলাম। আমার পাশে-পাশে নাচতে-নাচতে চলেছে। তীব্র উল্লাসের নাচ।
শুনতে পেলাম, বাবা কপাল চাপড়ে ইনিয়েবিনিয়ে কাঁদছে।
মা জলভরা চোখে আমার সামনে এসে ভর্ৎসনার সুরে বলল, ‘লীলা, এ তুই কী করলি!’
আমি ঝাঁঝিয়ে উঠলাম, ‘বেশ করেছি! এতদিনে বিশ বছরের ঋণ শোধ হল।’
অন্ধকার পিচের রাস্তা থেকে তাপ উঠছিল। বাড়ি ফিরে আমাকে স্নান করতে হবে।
এমন সময় পেছন থেকে শুভদীপের বুক-ফাটা চিৎকার শুতে পেলাম—যন্ত্রণা আর আতঙ্কের চিৎকার। সে-চিৎকারে বুক কেঁপে ওঠে।
হঠাৎই মনে হল, চিৎকারটা বোধহয় আমার কল্পনা।
কারণ, এখনও তো দশ মাস দশ দিন হয়নি।
আমার বাঁ-হাতের পাঁচ আঙুল
মৌমিতাকে আমার বাঁ-হাতের পাঁচ আঙুলের আসল ব্যাপারটা খুলে বলিনি। কারণ, খুলে বলাটা খুব সহজ নয়। কিন্তু ও যে বারবারই আমার বাঁ-হাতের দিকে তাকায় সেটা আমি লক্ষ করেছি। এখনও দেখছি, ও কোল্ড ড্রিঙ্কের গ্লাসে চুমুক দিতে-দিতে আমার বাঁ-হাতের দিকে চেয়ে আছে।
আমি বাঁ-হাতের সবসময় সাদা দস্তানা পরে থাকি। কাপড়ের দস্তানা। ঠাটবাটওলা রেস্তরাঁয় বেয়ারারা যেমন পরে থাকে। এখনও আমাদের টেবিলের আশেপাশে দু-তিনজন বেয়ারা এরকম সাদা দস্তানা পরে আছে।
মৌমিতাকে আজ ডিনার খাওয়াতে ‘দ্য অর্কিড’-এ নিয়ে এসেছিলাম। ই এম বাইপাসের ধারে এই ‘দ্য অর্কিড’ রেস্তরাঁটা মন্দ নয়। এখানে জগঝম্প নাচ-গান নেই। তার বদলে শান্ত নিস্তব্ধ পরিবেশ। খুব সফট টোনে খুশির মুড তৈরির মিউজিক বাজছে। এসি-র তীব্রতা প্রায় শীত করার মতো। বেশিরভাগ টেবিলই ভরতি থাকলেও কারও কথা শোনা যাচ্ছে না। সবাই নিশ্চয়ই নীচু গলায় কথা বলছে। আমাদেরই মতো।
‘একটা কথা জিগ্যেস করব?’ মৌমিতা হঠাৎ মাথার চুল ঝাঁকিয়ে বলল।
‘করো।’ আমি জানতাম ও কী জিগ্যেস করবে।
‘তুমি বাঁ-হাতে সবসময় গ্লাভস পরে থাকো কেন?’
‘গ্লাভস নয়—গ্লাভ বলো…’ হেসে বললাম আমি, ‘আমি তো শুধু বাঁ-হাতে পরেছি—দু-হাতে পরিনি।’
‘তুমি আনসারটা এড়িয়ে যাচ্ছ।’ কোল্ড ড্রিঙ্কের গ্লাস লম্বা চুমুক দিয়ে বায়নার সুরে ও বলল, ‘বলো না! বলতে কোনও প্রবলেম আছে?’
আমার মনটা হঠাৎ কেমন-কেমন হয়ে গেল। প্রবলেম? ভালো কথাই বলেছে মৌমিতা। প্রবলেম নেই আবার!
একহাতে দস্তানা পরে থাকি বলে অনেকের কাছেই আমাকে জবাবদিহি করতে হয়। কাউকে বলি, এটা আমার এক বিচিত্র শখ। কাউকে বলি, হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ার সময় এই অভ্যেসটা ডেভেলাপ করেছে। আবার কাউকে বা তিতিবিরক্ত হয়ে বলি, আমার বাঁ-হাতে স্কিন ডিজিজ আছে।
কিন্তু আসল ব্যাপারটা যে কী সেটা একজন ছাড়া কাউকে বলিনি—অন্তত এখনও।
কৌতূহল থাকাটা দোষের নয়। সুতরাং মৌমিতার কোনও দোষ নেই। ব্যাপারটা ওর জানতে ইচ্ছে করতেই পারে। তাই ওর প্রশ্নের উত্তরে বললাম, ‘মৌ, বলতে কোনো প্রবলেম নেই। তবে…মানে…এর পেছনে একটা ইন্টারেস্টিং স্টোরি আছে…।’
ও বড়-বড় চোখ মেলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাই? তা হলে বলো—প্লিজ…।’
রেস্তরাঁর ছায়া-ছায়া আলোয় আমি ওকে ভালো করে দেখতে চাইলাম।
মৌমিতা। লম্বা স্লিম চেহারা। মাথার একরাশ চুলে সোনালি রঙের ঝিলিক। লম্বাটে ফরসা মুখ। টানা-টানা চোখ। এই চোখে চোখ পড়লে নজর ফেরানো যায় না। চোখা নাক। সামান্য ফোলা দু-ঠোঁট যেন সবসময়েই দুষ্টু হাতছানি দিচ্ছে।
মৌমিতাকে আমি ভালোবাসা। খুব সাধ ওকে নিয়ে বাকি জীবনটা একসঙ্গে থাকব। আমার ভেসে-বেড়ানো দিকশূন্য ছন্নছাড়া জীবনে ও সারথি হয়ে আসুক। আমাকে সামলে নিক। আমার সুখ-দুঃখের শরিক হোক। আমার অভিভাবক হয়ে উঠুক।
মৌমিতাকে এখনও এসব কথা বলিনি। দস্তানার গল্পটা বলার পর বলব। মনে হয় না ও আমাকে ফিরিয়ে দেবে।
আমি বেয়ারাকে ডেকে বিল দিতে বললাম। তারপর মৌ-কে চাপা গলায় বললাম, ‘এখানে নয়—গল্পটা তোমাকে গাড়িতে যেতে-যেতে বলব।’
