মেয়েটির চোখে আচমকা জল এসে গেল। আঁচল দিয়ে চোখের কোণ মুছে নিয়ে বলল, ‘আপনি জানেন না, বড় মেমসাব খুদকুশি করেছে! এই তো করিব এক মাহিনা হল।’
আমি অবাক হয়ে গেলাম। খুদকুশি! আত্মহত্যা!
ব্যাগ থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে মেয়েটির হাতে দিলাম।
তারপর জিগ্যেস করলাম, ‘কেন, সুইসাইড করল কেন? এরকম ভালো স্বামী, যার এত পয়সা, শান-শওকত, সে কেন হঠৎ সুইসাইড করতে যাবে!’
তখন কাঁদতে-কাঁদতে মেয়েটি যা বলল তার সারাংশ এই:
সুস্মিতাজীর পতি মোটেই ভালো লোক নয়। বাড়িতে বসে সবসময় মদ খায়। উলটোপালটা আওরত ইয়ার-দোস্ত দিয়ে আসে। রোজ বিবির সঙ্গে হুজ্জুতি করত। অথচ বড় মেমসাহেবের পয়সাতেই তার এত বোলবোলা, দুটো বাড়ি, দুটো গাড়ি, ফ্যাক্টরি, অফিস—কী নেই! সুস্মিতাজীর মতো মালকিন হয় না— এত ভালো ছিল। লেকিন সবই তকদীর! অনেক সহ্য করেছিল, শেষ পর্যন্ত আর পারল না।
আমি ভেতরে-ভেতরে পাথর হয়ে যাচ্ছিলাম। আর সেইসঙ্গে স্বস্তিও পাচ্ছিলাম। তা হলে ভুল আমার হয়নি!
ওকে জিগ্যেস করলাম, সুস্মিতাজী কীভাবে খুদকুশি করেছে।
মেয়েটি ভাঙা গলায় জানাল যে, বাথরুমে দরজা বন্ধ করে বড় মেমসাব তার হাত-পায়ের শিরা ব্লেড দিয়ে কেটে দিয়েছে। অনেক খুন বেরিয়েছিল। সাহেব তখন বাড়ি ছিল না। কোম্পানির কী একটা কাজে দিল্লি গিয়েছিল। চিৎকার চেঁচামেচি করে দরজা ভেঙে সবাই সুস্মিতাকে দেখতে পায়। থইথই রক্তের মধ্যে মেমসাব পড়ে ছিল।
ওঃ! সেই রক্ত! কিছুই তা হলে পালটায়নি! শুধু আমিই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম।
কিন্তু সুস্মিতার সুইসাইডের ব্যাপারটা শুভদীপ আমাকে ফোন করে জানাল না কেন! এটা তো ওর রাহুমুক্তির সুখবর! নাকি ওর কোনও মতলব ছিল? কয়েকমাস পর সব থিতিয়ে গেলে তারপর কি ও খবরটা আমাকে জানাবে? তারপর হ্যাংলার মতো আবার বলবে, ‘লিলু, নতুন করে সবকিছু আবার শুরু করা যায় না?’
না, সবকিছু আর শুরু করা যায় না। এখন শেষ করার সময়।
ওঃ! শুভ তা হলে সেই শুভই আছে! আগাপাস্তলা নিখুঁত জানোয়ার!
সুস্মিতার জন্যে আমার কান্না পেল। তলপেটে চিনচিনে ব্যথা শুরু হল। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
মেয়েটিকে বললাম, ‘সাহেব বাড়ি ফিরলে এত সব কথা বলার দরকার নেই। শুধু বলবে, আমি খোঁজ করতে এসেছিলাম।’
‘আপনার নাম?’
‘বলবে শ্যামবাজারওয়ালি মেমসাব। তা হলেই তোমার সাহেব বুঝতে পারবেন।’
‘এখানে নওকরি করতে আমার আর মন লাগে না, দিদি…।’ মেয়েটি কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল।
আমি ঠান্ডা সুরে জবাব দিলাম, ‘কে করতে বলেছে! ছেড়ে দাও চাকরি।’
শুভদীপের বাড়ি থেকে ফিরে আসার পথে গনগনে রোদ্দুর আমার মাথায় যেন আগুন ধরিয়ে দিল। নাকে রক্তের আঁশটে গন্ধ পেলাম।
গন্ধটা বাড়ি ফেরা পর্যন্ত আমার নাকে লেগে রইল।
পরদিন সন্ধে নাগাদ শুভদীপকে ফোন করলাম আমি।
টেলিফোনে আমার গলা পেয়ে ও একেবারে উৎফুল্ল হয়ে উঠল।
‘লিলু, কাল তুমি আমার বাড়িতে এসেছিলে?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ—।’
‘আমি ঠিকই আন্দাজ করেছি, তবে ভয়ে তোমাকে ফোন করিনি।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ও আবার বলল, ‘লিলু, থ্যাঙ্ক গড যে তোমার রাগ পড়েছে। আমি হয়তো তোমাকে দু-এক সপ্তাহ পর ফোন করতাম।’
‘কেন, সুস্মিতা সুইসাইড করেছে এই খবরটা আরও থিতিয়ে গেলে তারপর আমাকে জানাতে?’ আমি নির্লিপ্তভাবে বললাম।
‘ওঃ, লিলু! সবসময় তুমি এত মারমুখী হয়ে থাকো কেন বলো তো?’ গলায় সুর অন্তরঙ্গ করে ও বলল, ‘কবে তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলো—খুব জরুরি কথাবার্তা আছে।’ কথা শেষ করার আগেই হেঁচকি তোলার মতো একটা শব্দ করল শুভ।
আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কী হল!’
‘ও কিছু নয়…।’ আবার সেই একইরকম শব্দ। তারপর: ‘কবে তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলো। অনেক জরুরি কথা আছে।’
‘আমারও তোমার সঙ্গে অনেক জরুরি কথা আছে। আজ রাত আটটার সময় তুমি আমার বাড়িতে আসবে?’
‘ন-না। তার চেয়ে বরং তুমি আমার বাড়িতে এসো।’ শুভদীপ কাহিল সুরে বলল, ‘আমার শরীর ভালো নেই।’
‘তোমারও তা হলে শরীর খারাপ হয়!’ আমি ব্যঙ্গ করে বললাম, ‘আমার কথাটার ডাবল মিনিং আছে কিন্তু—।’
‘আঃ, লিলু, প্লিজ, ঠাট্টা কোরো না। আমার শরীরটা ভালো নেই। তুমি রাত আটটার চলে এসো। তুমি এলে কোনও প্রবলেম হবে না।’ দোতলার দক্ষিণ দিকটায় আমি থাকি।
আমি হাসলাম। বললাম, ‘প্রবলেম কী করে হবে! প্রবলেম তো সুইসাইড করেছে!’
হেঁচকি তোলার মতো শব্দ শোনা গেল আবার। শুভ বলল, লিলু, প্লিজ, রাত আটটায় এসো কিন্তু। এখন রাখছি—।’
রাত আটটায় ওর বাড়িতে যখন পৌঁছলাম তখন প্রচণ্ড গুমোট কেটে গিয়ে বাতাস বইতে শুরু করেছে। ওদের বাগানের গাছের পাতা শব্দ করে এপাশ-ওপাশ দুলছে। আকাশে তারা ফুটেছে বটে, তবে চাঁদ খানিকটা মেঘে ঢাকা।
এক অচেনা বিষণ্ণতা ছেয়ে যাচ্ছিল আমার মনে। শুভদীপের ওপরে মনটা নরম হয়ে আসতে চাইছিল। কিন্তু আমার মনে পড়ে গেল সুস্মিতার কথা, বিশ বছর আগেকার কথা, আর বেঢপ নগ্ন পুতুলটার কথা।
কলিংবেল বাজাতেই গতকালের শ্যামলা মেয়েটি দরজা খুলে দিল। আমাকে সানগ্লাস ছাড়া দেখেও ও সহজে চিনতে পারল। বলল, ‘বড়সাহেব দোতলার ঘরে আছে। সাহেবকে কাল বলেছি, আপনি এসেছিলেন।’
আমি হেসে ওকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে পড়লাম বাড়িতে। তারপর এগিয়ে গেলাম দোতলায় ওঠার সিঁড়ির দিকে।
