‘সর্ববাধা প্রশমনং ত্রৈলোক্যস্যাখিলেশ্বরী।
এবমেব ত্বয়া কার্য্যসম্পদ বৈরী বিনাশনম।।’
জপ শেষ হলে বাঁ-হাতের অনামিকার নখ দিয়ে পুতুলটার তলপেট লম্বালম্বিভাবে চিরে দিলাম। উঠে গিয়ে নিয়ে এলাম ছিপি আঁটা শিশিটা। একটা কাঁটা দিয়ে খুঁচিয়ে রক্তমাখা সুতোগুলো বের করে নিলাম। ওগুলো গুঁজে দিলাম পুতুলটার তলপেটে। তারপর ভালো করে টিপে-টিপে চেরা জায়গাটা বন্ধ করে মসৃণ করে দিলাম। পুতুলটার তলপেটে আর কোনও ক্ষতচিহ্ন রইল না।
পরপর দু-দিন আমি উপোস করলাম। তৃতীয় দিনে আমার সরঞ্জামের তাক থেকে শালিঞ্চ গাছের শুকনো শেকড় বের করে নিলাম। সেটা গুঁড়ো করে আমার নগ্ন দেহে ছড়িয়ে দিলাম। সপ্তমুখী রুদ্রাক্ষের একটা ছোট্ট টুকরো জল দিয়ে গিলে ফেললাম। তারপর অনেকক্ষণ ধরে স্নান করলাম। কারণ আজই সেই পবিত্র দিন। আজই শেষ হবে আমার কাজ।
সারাটা দিনে কতবার যে ঘড়ি দেখেছি মনে নেই! শেষে যখন রাত পৌনে বারোটা হল তখন ঘরের সব ক’টা জানলা খুলে দিয়ে শুয়ে পড়লাম বিছানায়।
আজ শনিবার। পূর্ণিমার রাত। জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ল অন্ধকার ঘরে, আমার নগ্ন দেহে, আর পুতুলটার ওপরে।
একটু পরে উঠে বসে একটা ছোট পিঁড়ি নিলাম। পুতুলটাকে তার ওপরে বসিয়ে তার তিন দিকে তিনটে মোমবাতি জ্বেলে দিলাম। তারপর একটা ছোট শিশি খুলে কয়েক ফোঁটা সুগন্ধি তেল ছিটিয়ে দিলাম পুতুলটার গায়ে। আর একটা ধূপকাঠি জ্বেলে দিলাম।
কপালে খানিকটা সিঁদুর আর কাজল মেখে আমি পুতুলটার সামনে ধ্যানস্থ হয়ে বসলাম। তারপর প্রার্থনা শুরু করলাম।
একটু পরেই আমার শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হল। ভাঙা কাচের টুকরো দিয়ে কেউ যেন কাটাছেঁড়া করছে আমার ভেতরটা। নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করছে বারবার!
হে নিরাকার কৃষ্ণশক্তি! এসো, আমার মনস্কামনা পূর্ণ করো। রক্তের ঋণ শোধ হোক রক্ত দিয়ে। হে দেবী! তোমার ঘৃণা ও বিদ্বেষ থেকে আমাকে পরিত্রাণ করো। তোমার অনুগতকে আশীর্বাদ করো। শত্রুকে নাশ করো। হে নিরাকার অন্ধকারের রাজা! হে অন্ধকার তন্ত্রলোকের রানি! আমার মনোবাসনা পূর্ণ করো।
যন্ত্রণায় আমার তলপেট ছিঁড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করলাম। ঠোঁট কেটে রক্ত বেরিয়ে এল। কিন্তু আমার আকুল প্রার্থনা চলতেই লাগল। সেই সঙ্গে বিধি অনুযায়ী মন্ত্র উচ্চারণ।
সেই যন্ত্রণার মধ্যেই যেন দেখলাম, পুতুলটার হাত-পা নড়ে উঠল, কিলবিল করে উঠল।
হঠাৎই আমার শরীর এক বিচিত্র ক্লান্তি ও অবসাদে ছেয়ে গেল। ভীষণ ঘুম পেল আমার। আমি বিছানায় আবার শুয়ে পড়লাম। চাঁদের আলোয় আমার নগ্ন শরীর মাখামাখি হয়ে গেল।
তারপর ঘুমে আমার চোখ ঢুলে এল। সেই অবস্থাতেই দেখলাম, পুতুলটা যেন জীবন্ত হয়ে তীব্র লাল চোখে আমাকে দেখছে।
দিনের পর দিন যেতে লাগল। তলপেট ফুলে পুতুলটার রোগা-ভোগা চেহারা ক্রমে বেঢপ হয়ে উঠতে লাগল। একইসঙ্গে আমিও উলটোপালটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম।
স্বপ্নগুলো ধীরে-ধীরে দুঃস্বপ্নের চেহারা নিল। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে মন হাতড়ে শত চেষ্টাতেও সেগুলোকে আর খুঁজে পেলাম না। কোথা থেকে তিলতিল করে মনে একটা সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল। অবাক হলেও সন্দেহটা মন থেকে ঠেলে সরাতে পারলাম না। ওটা ক্রমে গাঢ় হতে লাগল।
আমি কাজটা ঠিক করছি তো? সত্যিই কি রক্ত দিয়েই শোধ করতে হয় রক্তের ঋণ?
মনে পড়ছে, শুভদীপ কেঁদেছিল। আমার দু-হাত চেপে ধরে ক্ষমা চেয়েছিল বারবার। ভুল শোধরাতে চেয়েছিল অনুনয়ের সুরে। সত্যিই কি বিশ বছর আগের ব্যাপারটা ওর আকস্মিক ভুল? কে জানে, বিশ বছরে ও হয়তো সত্যিই বদলে গেছে। মানুষ তো বদলায়। মানুষই তো বদলায়! আমিই হয়তো জেদের বশে একটা ভুল করতে চলেছি। নিষ্ঠুর ভুল। যে-ভুল একবার হয়ে গেলে আর শোধরানো যায় না।
সুতরাং চরম ভুল করে বসার আগে একবার খোঁজ করে দেখতেই হবে।
কার্ডে লেখা শুভদীপের ঠিকানা নিয়ে একদিন দুপুরে সোজা চলে গেলাম ওর যোধপুর পার্কের বাড়িতে।
বাড়িটা খুঁজে পেতে কোনও অসুবিধে হল না।
ওর বাড়ি দেখে তাজ্জব বনে গেলাম। বড়লোকের বাড়ি কাকে বলে!
তিনতলা বাড়ি, সঙ্গে ছোট একটুকরো বাগান। বাড়ির দেওয়ালের নানা জায়গায়-মার্বেল পাথরের ডিজাইন। ছাদে টিভি অ্যানটেনা আর হাওয়া-মোরগ।
আমার চোখে সানগ্লাস। মাথায় রঙিন ছাতা। পিচের রাস্তা দুপুরের রোদে জ্বলছে।
শুভ নিশ্চয়ই এখন বাড়িতে নেই। অফিসে বা ফ্যাক্টরিতে গেছে। এই সুযোগে সুস্মিতার সঙ্গে একটু আলাপ করে নেওয়া যেতে পারে। তা হলেই বুঝতে পারব, শুভদীপ সত্যিই বদলে গেছে কি না।
বাড়ির কাছাকাছি গিলে লাল-সবুজ শাড়ি পরা একটি মেয়েকে দেখতে পেলাম। বছর পঁচিশ বয়েস। স্বাস্থ্য মন্দ নয়। রঙ কালোর দিকেই, তবে মুখ-চোখ ভালো।
মেয়েটির কানে রুপোর দুল, আর নাকে রুপোর নাকছাবি। শাড়ির আঁচল ডানকাঁধের ওপর দিয়ে পিঠে নেমেছে। দেখে কাজের লোক বলেই মনে হল।
ইশারা করে ডাকতেই মেয়েটি কাছে এল।
ওকে শুভদীপের কথা জিগ্যেস করলাম।
মেয়েটি হিন্দি মেশানো বাংলায় বলল যে, সাহেব বাড়ি নেই। ফ্যাক্টরিতে গেছে।
তখন আমি মেমসাহেবের কথা জিগ্যেস করলাম। বললাম, ‘আমি সুস্মিতাজীর দোস্ত। একসঙ্গে স্কুলে পড়তাম। শ্যামবাজারে থাকি—।’
