‘তোমাকে তো কতবার করে বলছি কুড়ি বছর আগে আমি…আমি ভুল করেছিলাম…অন্যায় করেছিলাম। কিছুতেই কি আমাকে ক্ষমা করা যায় না, লিলু?’
আমি শুধু হাসলাম। সেই মুহূর্তে বিশ বছরের পুরোনো রক্তের গন্ধ পেলাম। মাংস চিরে যাওয়ার যন্ত্রণা টের পেলাম।
তৈরি হয়ে নিয়ে ঘরের টিউবলাইটটা জ্বেলে দিলাম।
শুভদীপের মুখ কেমন বিবর্ণ লাগছিল। ও বিছানা ছেড়ে উঠে চেয়ারে কাছে গেল। সিগারেটে শেষবারের মতো লম্বা টান দিয়ে ওটা ফেলার জায়গা খুঁজল। তারপর সেরকম কিছু খুঁজে না পেয়ে উবু হয়ে বসে পড়ল। মেঝেতে ঘষে ওটা নেভাল। তারপর চেয়ার থেকে ওর শালটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘কাল কখন দেখা হচ্ছে?’
আমি কোনও জবাব না দিয়ে তাড়া দিলাম, ‘তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। মা এখুনি চলে আসবে।’
‘তোমার মায়ের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিলে না?’
‘না। কারণ মা কে বলার মতো কোনও যোগ্য পরিচয় তোমার নেই। নাও, জলদি তৈরি হয়ে নাও।’
ও পোশাক পরে নিতে শুরু করল। তারপর আমার খুব কাছে এসে দাঁড়াল: ‘লিলু, তোমার সঙ্গে দেখা না হলে আমি মরে যাব।’
আমি হেসে বললাম, ‘তাই? তা হলে ধরে নাও আর দেখা হবে না।’
শুভদীপ কয়েক মুহূর্ত হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর রুক্ষভাবে বলল, ‘তা হলে আমাকে এভাবে ডাকলে কেন? শুলে কেন? নাকি তোমাকে শোওয়ার টাকা দিতে হবে?’
আমার হাসি পেল। পুরোনো জানোয়ারটা বিশ বছরের পথ ডিঙিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে।
ওর থুতনিতে হাত দিয়ে বাচ্চা ছেলেকে আদর করার মতো করে নেড়ে দিলাম। বললাম, ‘শুভ, লাখ টাকার প্রশ্ন করেছ তুমি। সত্যি, কেন যে তোমাকে আদর করে ডাকলাম, কেন যে শুলাম, তা যদি তুমি জানতে!’
আর কথা না বাড়িয়ে ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। যাওয়ার আগে ও নাছোড়বান্দার মতো বলল, ‘কাল তোমাকে ফোন করব—।’
আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম। দরজার কাছের আঁধারি জায়গায় দাঁড়িয়ে চুপ করে কিছুক্ষণ ভাবলাম। আমি যা করেছি সেটা ঠিক, না ভুল? ন্যায় না অন্যায়?
বিশ বছর আগে ন্যায়-অন্যায়ের হিসেব কে কষেছিল?
আমার গা ঘিনঘিন করছিল। তাই গ্যাস-স্টোভে গরম জল চাপিয়ে দিলাম। এক্ষুনি স্নান করতে হবে।
সারাটা রাত আমি ঘুমোতে পারলাম না।
পাগলের মতো কাঁদলাম। খোলা জানলা দিয়ে শীতের রাত দেখলাম, আকাশের তারা দেখলাম। এলোমেলো গান গাইলাম। শুভকে যা-তা গালিগালাজ করলাম। বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক কষ্ট হতে লাগল। বারবার ভাবতে লাগলাম, যা করতে চলেছি তা উচিত হবে কি না।
ঠিক তখনই আমার চোখের সামনে বাবার ঝুলন্ত মৃতদেহটা দুলতে লাগল। মায়ের বুকফাটা হাহাকার শুনতে পেলাম। আর শূন্য বয়েসে চলে যাওয়া খুদে দস্যিটা চিৎকার করে আমাকে চৌচির করে দিতে লাগল।
আমার চোখের জল জমাট বেঁধে বরফের কুচি হয়ে গেল। না, শুভদীপকে ক্ষমা করা যায় না।
এইভাবে দোলাচলের মধ্যে কয়েকটা দিন কেটে গেল। তারপর আমি অনেকটা শান্ত-স্বাভাবিক হয়ে গেলাম। শুভদীপ পরপর চারদিন আমাকে ফোন করেছিল, কিন্তু আমি ঠান্ডা গলায় ওকে একই কথা বলেছি। আর মনে করিয়ে দিয়েছি সুস্মিতার কথা। ও তাতে খেপে উঠেছে পাগলের মতো। তারপর থেকে আমাকে ফোন করা বন্ধ করে দিয়েছে।
কিছুদিন পরেই বুঝলাম, ‘গুহ্যসূত্র’, ‘গর্ভপ্রবেশ’ ও ‘সৃষ্টিশাস্ত্র’-এর নির্দেশ ব্যর্থ হয়নি।
আরও দু-মাস যেতে পুরোপুরি নিশ্চিত হলাম।
আমার হিসেব অনুযায়ী চার মাস সতেরো দিন পর উপযুক্ত সময় এল। শরীরে সব ক’টা প্রয়োজনীয় লক্ষণই নজরে পড়ল আমার। তখনই কাজ শুরু করলাম। অসহ্য যন্ত্রণায় একটা গোটা রাত ছাগলের মতো ছটফট করলাম। ভীষণ জ্বর এল। রক্তপাতও হল। সকালবেলা রক্তমাখা কাপড় থেকে রক্তাক্ত সাতটা সুতো ছিঁড়ে নিলাম। সেগুলোকে পরিষ্কার একটা শিশিতে ছিপি এঁটে রেখে নিলাম। তারপর ব্যথা কমানোর দুটো ট্যাবলেট খেয়ে শুয়ে রইলাম বিছানায়।
আমার মধ্যে কিছু-কিছু পরিবর্তন মায়ের চোখ ধরা পড়েছিল। মায়ের চোখে নীরব প্রশ্ন থাকলেও মুখে কোনও নতুন কথা ছিল না। বিড়বিড় করে শুধু বলতে লাগল, ‘তুই সাবধানে থাকিস। নিজের যত্ন নিস।’
ন’-দশ দিনের মধ্যেই আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম। শরীরে, মনে, জোর ফিরে পেলাম। তখন কাশী মিত্তির ঘাটের শ্মশানে গিয়ে দু-চিমটে ছাই আর খানিকটা মাটি নিয়ে এলাম।
একদিন রাতে আমি পুতুলটা তৈরি করতে বসলাম।
মাটি আর ছাইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দিলাম শিরীষের আঠা আর খানিকটা সিঁদুর। তারপর বেশ মনোযোগ দিয়ে পুতুলটা তৈরি করলাম। হাত-পা-মাথা…সব। চোখের জায়গায় দুটো লাল পুঁতি বসিয়ে দিলাম।
পুতুলটা তৈরি হয়ে যাওয়ার পর রাতে স্নান সেরে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে উত্তরদিকে মুখ করে পদ্মাসনে বসলাম। পুতুলটা দু-হাতে ধরে একদৃষ্টে ওটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
হে অন্ধকারের রাজা, প্রেতসিদ্ধ সম্রাট, শক্তি দাও। এই জড় পদার্থে তোমার তীব্র ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করো, প্রাণ সঞ্চার করো। শত্রুকে নাশ করো, অনুগতকে রক্ষা করো।
সাদা সরষে, কালো মরিচ আর ঘি দিয়ে একটা মণ্ড তৈরি করে রেখেছিলাম। সেটাতে আগুন দিয়ে হোম শুরু করলাম। তারপর পাশে রাখা একটা রুদ্রাক্ষের মালা নিয়ে শত্রুনাশের মন্ত্র জপ করতে লাগলাম। পুতুলটা তখন আমার অন্য হাতে স্থির।
