ও আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল জোর করে। আমাকে জাপটে ধরে ওর একমাত্র মূলধন ঘষতে লাগল আমার শরীরে। আমার মুখে, গালে, ঠোঁটে, যেখানে সেখানে চুমু খেতে লাগল পাগলের মতো। আমার ডায়মন্ডহারবারের দিনটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। সেইসঙ্গে অসহায় মেয়েটার টেলিফোনের কথাও।
যখন ও প্রায় চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছে গেছে, তখন ওকে থামালাম। ও স্টিম ইঞ্জিনের মতো ফোঁস-ফোঁস করে শ্বাস নিতে লাগল।
আমি ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আজ নয়—পরে। ফোনে বলে দেব।’
শুভদীপ আকাঙ্ক্ষা থেকে বঞ্চিত মানুষের চোখে আমাকে দেখল। হাঁপাতে-হাঁপাতে জিগ্যেস করল, ‘কেন’?
আমি বললাম, ‘এটা আমার ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কথা বলার ঘর। এটা তুকতাক-মারণ-উচাটন-বশীকরণের ঘর। এ-ঘরে আর সবকিছু আছে—শুধু ভালোবাসা নেই। আজ তুমি যাও—।’
শুভ যথেষ্ট আহত হল। কিন্তু আহত হলেও আমার কিছু করার ছিল না। নিজেকে তৈরি না করে ওর সঙ্গে কিছু করতে চাই না আমি।
‘লিলু, কাল আসব?’ ও আকুল গলায় জানতে চাইল।
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, ‘না, কাল নয়, পরশু। সময়টা পরে আমি বলে দেব।’
‘কাল নয় কেন?’ বাচ্চাদের মতো বায়না করল শুভ। ওর শ্বাস-প্রশ্বাস অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
ওর প্রশ্নের উত্তরে হাসলাম আমি। বললাম, ‘অপেক্ষার আনন্দ থেকে তোমাকে বঞ্চিত করতে চাই না বলে—।’
বিশ বছর ধরে আমিও হয়তো অপেক্ষা করেছি। অপেক্ষার আনন্দ থেকে আমিও বঞ্চিত হতে চাই না।
অপ্রসন্ন মন নিয়ে শুভদীপ চলে গেল। আমি ওকে ‘টা-টা’ করে বিদায় জানালাম।
শুভদীপ চলে যাওয়ার পর অনেক রাত পর্যন্ত নানান বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করলাম। দেওয়ালের একেবারে নীচের তাক একটা প্রাচীন পুঁথির কপি বের করলাম। নেপালের দরবার পাঠাগারের একটি দুষ্প্রাপ্য অমূল্য পুঁথি ‘গুহ্যসূত্র’—এটা তারই কপি।
পুঁথির পাতা উলটে অনেকক্ষণ পড়াশোনা করলাম, কাগজে নোট নিলাম। তারপর বের করে নিলাম আরও দুটি বই: ‘গর্ভপ্রবেশ’ ও ‘সৃষ্টিশাস্ত্র’। সেগুলোর কয়েকটা বিশেষ পৃষ্ঠা খুঁটিয়ে পড়ার পর পেয়ে গেলাম আমার আকাঙ্ক্ষিত সমাধান: বন্ধ্যা নারীর নিশ্চিত গর্ভসঞ্চারের হদিস। একবার এক মক্কেলের জন্যে এই টোটকা কাজে লাগিয়েছিলাম। তাতে ফলও পাওয়া গিয়েছিল।
এবারে আমার নিজের পালা।
একটা সাদা কাগজে যাবতীয় তথ্য-আচার লিখে নিতে লাগলাম:
মন্ত্র: ‘ওঁ হং গং নং ষং ফং সং খং মহাকাল ভৈরবায় নমঃ’
দু-চামচ মধু, এক চামচ পোস্ত, পোয়াটাক দুধ, তিল পরিমাণ আফিম ও ধুতুরার দুটি বিচি গুঁড়ো করে ভালো করে মিশিয়ে একটি শুচি কাচপাত্রে রাখবে। দ্রব্যটিকে শুষ্ক করে একটি কাকের পালক ও একটি প্যাঁচার পালক দিয়ে তিনবার করে স্পর্শ করবে। তারপর দ্রব্যটিকে উপরোক্ত মন্ত্রে ১০৮ বার অভিমন্ত্রিত করবে। অভিমন্ত্রিত করার সময় নীচের যন্ত্রটি অষ্টগন্ধের সাহায্যে ভুর্জপত্রে অঙ্কন করে চোখ বুজে বাঁ-হাতের অনামিকা দ্বারা স্পর্শ করে রাখতে হবে। এই আচারের পর গর্ভকামী যুবতী দ্রব্যটি সেবন করবে এবং বীর্যবান পুরুষের সঙ্গে পূর্ণমিলনে লিপ্ত হবে। মিলনকালে মন্ত্রটি নিবিষ্টমনে জপ করবে। এই প্রকারে সিদ্ধিলাভ অবশ্যম্ভাবী।
বইগুলোতে এর পরেও লেখা ছিল পুত্রসন্তান লাভের জন্য কী-কী নিয়ম মানতে হবে, আর কন্যাসন্তানের জন্যেই বা কী নিয়ম। সেসব আমার কোনও দরকার নেই। কারণ, আমি চাই কিছু একটা হোক—তা সে ছেলে, মেয়ে বা হিজড়ে যা-ই হোক, আমার কাজ চলে যাবে।
শুভদীপ এরপর যেদিন আসবে, সেদিন আমাকে তৈরি থাকতে হবে আগে থেকেই। মা-কে আর কাজের মেয়েটাকে দেশবন্ধু পার্কে ভাগবত পাঠ শুনতে পাঠিয়ে দেব, যাতে বাড়ি খালি থাকে। তারপর আমি, শুভ, আর অশুভ—শুধু এই তিন শক্তির খেলা।
পরদিন সকাল শুভদীপ ফোন করল।
‘লিলু, কেমন আছ?’
‘ভালো। তুমি?’
‘তোমার ডাকের জন্যে অপেক্ষা করছি—।’
‘আমিও বিশ বছর ধরে অপেক্ষা করেছি।’ হেসে ওকে বললাম।
‘আমিও। ডায়মন্ডহারবারের সেই দিনটার অ্যাকশন রিপ্লের জন্যে হন্যে হয়ে ওয়েট করছি।’ অন্যরকম ইঙ্গিত দিয়ে হাসল শুভ।
আমি হেসে বললাম, ‘অপেক্ষার আনন্দ টের পাচ্ছ?’
‘আনন্দ নয়, লিলু, যন্ত্রণা। আজ রাতে তোমার বাড়ি যাচ্ছি।’ জেদি গলায় বলল ও।
‘না, আজ নয়।’ ওর আশায় ঠান্ডা জল ঢেলে দিলাম আমি: ‘পরে বলব।’
এই কথা বলে টেলিফোন রেখে দিলাম।
সারাদিনে আমাকে মোট তিনবার ফোন করল ও। কথাবার্তায় বুঝতে পারছিলাম, ওর মাথা আর কাজ করছে না, শুধু শরীর কাজ করতে চাইছে।
আমি হাসলাম মনে-মনে। আপন মনেই বললাম, ‘ধৈর্য ধরো, বৎস, ধৈর্য ধরো।’
তারপর পরদিনও শুভদীপের ফোন এল। ফোন করেই ওর প্রথম প্রশ্ন, ‘কবে, লিলু?’
আমি হেসে বললাম, ‘আজ রাতে।’
ও আনন্দে একেবারে দিশেহারা হয়ে গেল। গদগদ গলায় বলল, ‘সোনামণি, আজ রাতে আর ছলনা কোরো না।
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, ‘তুমি ঠিক রাত আটটায় এসো।’ হেসে আরও বললাম, ‘বাড়ি ফিরতে তোমার রাত হতে পারে—।’
ও উৎসাহী গলায় বলল, ‘নো প্রবলেম। আমার সঙ্গে গাড়ি থাকবে।’
সেদিন সন্ধে থেকেই তৈরি হওয়ার কাজ শুরু করলাম। বেশ টের পাচ্ছিলাম, ভেতরে-ভেতরে একটা উত্তেজনা ধীরে-ধীরে জানান দিচ্ছে।
ঠিক আটটার সময় কলিংবেল বেজে উঠল।
সদর দরজা খুলতেই শুভদীপকে দেখতে পেলাম। আজও যথারীতি পাজামা, পাঞ্জাবি আর শাল, নাকে এল পারফিউম আর হুইস্কির গন্ধ।
