শুভ তখনও মুখ সামান্য হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে। আর আমি একটা স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে কথা বলে যাচ্ছিলাম।
‘তুমি তো জানো, অ্যাবরশান তখন বেআইনি ছিল। ফলে অনভিজ্ঞ অপদার্থ একটা মেয়ে অসহায়ভাবে শূন্যে হাতড়াতে লাগল। লুকিয়ে-চুরিয়ে যে কিছু করব, তাও পেরে উঠলাম না। ভাবতে পারো, তখন আমি কী পাগলামিটাই না করেছি! যা দিয়ে পেরেছি চেষ্টা করেছি, নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করেছি। পেন, পেনসিল, স্কেল, অ্যালুমিনিয়ামের হ্যাঙার —ওঃ!’
স্মৃতিকণা নামের নির্লজ্জ মেয়েটা কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছে টেবিলের ওপরে। ওর বিশ বছরের যৌবন উথালপাথাল হয়ে মাতালের মতো ধেইধেই করে নাচছে।
‘লিলু, প্লিজ, আমি আর শুনতে পারছি না—’ শুভদীপ ভাঙা গলায় অনুনয় করে বলল, গলা দিয়ে উঠে আসা কাশির দমক কোনওরকমে সামলে নিল।
আমি কিন্তু থামলাম না। একে-একে সব ওকে বললাম। মায়ের কথা, বাবার কথা। বাবা যে পাশের ঘরের সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়ে আত্মহত্যা করেছিলেন সে-কথাও বললাম।
‘…বাবা মারা যাওয়ার পর আমি যেন কেমন হয়ে গেলাম। ঠিক করলাম, বাচ্চাটাকে নষ্ট করব না। মায়ের সঙ্গে তুলকালাম ঝগড়াঝাঁটি করে চলে গেলাম বর্ধমানের এক দূর সম্পর্কের পিসির বাড়িতে। দোকান থেকে সিঁদুর কিনে মাথায় লাগিয়ে মিথ্যে একটা বিয়ের গল্প ফেঁদে সেখানে থেকে গেলাম। সত্যি কথা বলতে কি, পিসির বাড়িতে আমি রাতদিনের ঝিয়ের কাজ করতাম। পিসির বড় ছেলে আমাকে নষ্ট চোখে দেখত। কী অপমানে, কী হেনস্থার মধ্যে যে ক’টা মাস সেখানে কাটিয়েছি তা শুধু আমিই জানি। বিশ বছরে সেই দিনগুলোর কথা আমি একটুও ভুলিনি। একটুও না। অথচ শেষ পর্যন্ত কী হল জানো?’
শুভ কেউটে সাপের মুখে বশ হওয়া কোলা ব্যাঙের মতো নিষ্পলকে আমার দিকে তাকিয়ে। ওর ঠোঁট সামান্য কাঁপছে। আমার গল্প শুনতে-শুনতে আমার ভেতরের গল্পটাও পড়ে ফেলতে চাইছে যেন।
আমার চোখ জ্বালা করছিল। গলায় কী একটা যেন আটকে গেছে। অনেক চেষ্টা করে আবার কথা বললাম আমি, ‘বাচ্চাটা মরে জন্মাল। জন্মের পর মৃত্যু নয়—মৃত্যুর পর জন্ম। আমার ভীষণ কষ্ট হয়েছিল। মরতে-মরতে বেঁচে গিয়েছিলাম আমি। আর সেই সঙ্গে মা হওয়ার সাধে চিরদিনের মতো ইতি পড়ল, নটে গাছটি মুড়োল।’
শুভদীপ দু-হাতে মুখ ঢাকল। একটা যন্ত্রণার শব্দ বেরিয়ে এল ওর ঠোঁট চিরে। তারপর কোনওরকমে বলল, ‘আমাকে ক্ষমা করো, লিলু। এতসব আমি জানতাম না…আমি…।’
‘সত্যিই তো, জানবে কী করে! তুমি তো ‘আপসেট হওয়ার কিছু নেই। বলেই পালিয়েছিলে—।’
শুভ এবার কাঁদতে লাগল। ওর পাঞ্জাবি পরা পিঠটা ফুলে-ফুলে উঠতে লাগল। তারই মধ্যে ও জড়িয়ে-জড়িয়ে বলল, ‘আমাকে শাস্তি দাও। আমার বাবা কী ভয়ংকর মানুষ ছিলেন তুমি জানো না। তা ছাড়া আমি তখনও পড়াশোনা নিয়ে…।’
ওর কান্নায় আমার মন নরম হতে দিলাম না। বিশ বছরে আমি অনেক কেঁদেছি। কেউ সে-কান্না শুনতে পায়নি।
‘শুভ, সেই টেলিফোন করা রাতের ব্যাপারটা নিয়ে পরে আমি অনেক ভেবেছি। সেদিন তোমার কাছ থেকে আমি বোধহয় শুধু ভরসা চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম তুমি আমার পাশে এসে দাঁড়াও। পরে কী হত সেটা পরে ভাবা যেত।’
আমার তলপেটে কেউ যেন বরফের ছুরি চালাল। গোপন যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকে গেল আমার।
‘লিলু, আমি সেদিন ভুল করেছিলাম। সেদিন আমার খুব অন্যায় হয়েছিল। তুমি আমাকে শোধরানোর সুযোগ দাও…একটিবার…।’
আমি হাসলাম। আমার অভিযোগের উত্তরে শুভদীপ প্রতিবাদ করার কোনও যুক্তি খুঁজে পাচ্ছে না। আর শোধরানো! তার মানে বিয়ে? শুভদীপকে? কক্ষনো না। সুস্মিতার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। না, একটি বিশেষ অঙ্গ যে-জাতের একমাত্র মূলধন, সে-জাতের কোনও প্রাণীকে বিয়ে করার সাধ আমার নেই। তবে শরীরের চাহিদার ব্যাপারটা আলাদা।
অনেকক্ষণ আমরা চুপচাপ বসে রইলাম। শুভদীপ রুমাল বের করে চোখ, গাল, কপাল মুছছিল বারবার। আর আমার চোখ জ্বালা করছিল, তলপেটে জ্বালা করছিল। স্মৃতিকণাকে আর টেবিলের ওপরে দেখতে পেলাম না।
আমি মনে-মনে ভাবছিলাম, সেই ঘটনার পর আমার মতো বিপন্ন অবস্থায় শুভ যদি কোনওদিন আমাকে ফোন করত! আমি হয়তো ওর মতোই এড়িয়ে যাওয়া কথাবার্তা বলতাম, তারপর ওকে ‘বর্ধমানের পিসির’ ভরসায় ছেড়ে দিতাম।
হঠাৎই খেয়াল করে দেখি শুভ কখন যেন আমার কাছে সরে এসে গায়ে-টায়ে হাত দিচ্ছে। বুঝতে পারছিলাম, অপরাধবোধের খোলস ছেড়ে ধূর্ত নারীখাদকটা আবার বেরিয়ে এসেছে বাইরে। শীতের রাত, ঘরের দুটো দরজাই বন্ধ—এ-সুযোগ ছাড়ার কোনও মানে হয় না।
আমি মনে-মনে হাসলাম। ‘বর্ধমানের পিসির’ চেয়েও বড় শাস্তি ওকে আমি দিতে চাই। কিন্তু ওর তো সংসার আছে! একটা বউ আছে। নিশ্চয়ই সে আমার চেয়ে কমবয়েসি কোনও ফুটফুটে মেয়ে।
শুভ তখন আমার গা ঘেঁষে বসে পড়েছে। ওর অভিসারী হাতের গন্তব্যের কোনও বাছবিচার আর নেই। আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ও বিড়বিড় করে বলছিল, ‘সুস্মিতাকে আমি ছেড়ে দেব। নকল বিয়েতে আমার আর কোনও সাধ নেই। আমার লিলুকে আমি খুঁজে পেয়ে গেছি। তুমি আমার প্রথম ভালোবাসা, তুমিই আমার শেষ ভালোবাসা। লিলু, লিলু…।’
লিলু, এ তুই কী করলি! লিলু, এ তুই কী করলি!
শুভদীপকে আমি আরও স্পষ্ট করে চিনতে পারছিলাম। বিশ বছরে ও বিশেষ শোধরায়নি।
