ওর হাত ক্রমশ গরম হয়ে উঠছিল। ও আতুর চোখে আমাকে দেখছিল।
দেখার যথেষ্ট কারণ আছে। আজ আমি আমার আলমারির সবচেয়ে ফিনফিনে এবং দামি শাড়িটা পরেছি। আর আকাশি শাড়ির নীচে লো-কাট গাঢ় নীল রঙের ব্লাউজ। বাইরে শীত থাকলেও ঘরের ভেতরে সেরকম ঠান্ডা নেই। সুতরাং আমার শরীরের যতটুকু যেভাবে দেখা যায় সেভাবেই দেখছিল শুভদীপ।
আমি আচমকা জিগ্যেস করলাম, ‘তোমার ছেলেমেয়ে ক’টা?’
শুভ আমার হাতটা চট করে ছেড়ে দিল। আমাকে একপলক অদ্ভুত চোখে দেখে মাথা নাড়ল: ‘নেই।’
‘তোমার বিয়ে তা হলে সুখের হয়নি?’
‘এর পরেও ঠাট্টা করছ, লিলু!’
‘সুস্মিতাকে ডির্ভোসের কথা ভেবেছ?’
‘ভেবেছি, কিন্তু কোনও উপায় নেই। বাঁধা পড়ে গেছি। ওর বাবা আমাদের বিজনেসে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঢেলেছে—।’
তাই বলি! আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা না পড়লে শুভকে কে আটকাতে পারে!
‘লিলু, তুমি সাহস দিলে আমি একবার চেষ্টা করতে পারি। তা হলে পুরোনো ভুলটা শোধরানো যায়। বিশ্বাস করো টাকা-পয়সার দিকে আমার আর কোনও টান নেই।’
কিন্তু মেয়েছেলের দিকে আছে। বুঝতে পারছিলাম, শুভর কথাগুলো আগাগোড়া মিথ্যে, পুরোটাই অভিনয়—কিন্তু তা সত্ত্বেও শুনতে খারাপ লাগছিল না।
তুমি সাহস দিলে আমি একবার চেষ্টা করতে পারি। চমৎকার!
আমার গুরু নৃপেন সাধুখাঁ যখন আমাকে কামনা করেছেন তখন স্পষ্ট বলেছেন, ‘লীলা, আমাদের মিলন প্রয়োজন।’
আমরা দুজনে মাঝরাতে মিলিত হওয়ার পর উত্তরে মুখ করে বসে কর্ণপিশাচিনী গুহ্যমন্ত্র সাধনা করেছি। ফলে মিলনটাকেও আমার খুব স্বাভাবিক স্বতঃফূর্ত বলে মনে হয়েছে। সেই গুরুর সঙ্গে একাত্ম হয়ে আমি বট-যক্ষিণী চেটক, রতিরাজ চেটক, ষটকোণ বিশাংক যন্ত্র প্রয়োগ, বার্তালী মন্ত্র ইত্যাদি চর্চা করেছি। একসময় মানুষটাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তিনিই আমার দেখা একমাত্র পুরুষ, যার মধ্যে পুরুষকার রয়েছে।
কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর সম্পর্কের পর তিনি একবস্ত্রে হিমালয়ের দিকে রওনা হয়ে যান। মনে পড়ে, সেদিন আমি হারানো ভালোবাসার জন্যে কেঁদেছিলাম।
খেয়াল করিনি শুভ কখন যেন আমার ঊরুতে হাত রেখেছে। শুনতে পেলাম ও বলছে, ‘লিলু, আমি বিয়ে করেছি শুনে তোমার খারাপ লাগছে?’
আমি বাবার ফটোর দিকে চোখ রেখে বললাম, ‘না, তা নয়।’
তারপর উঠে গিয়ে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার দরজাটা বন্ধ করে ছিটকিনি এঁটে দিলাম। মা জানে, তন্ত্র চর্চার জন্যে নির্জনতা দরকার। এখন ঘরে আমি আর শুভদীপ—ঘরের দুটো দরজাই নিশ্চিন্তে বন্ধ।
শুভ চট করে উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের শালটা খুলে রেখে দিল চেয়ারে। তারপর দু-পা ফেলে আমার কাছে এগিয়ে এসে আমাকে একেবারে জাপটে ধরল।
আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘এখন না—পরে। কয়েকটা দরকারি কথা তোমার শোনা দরকার।’
শুভ আমার চোখে কী দেখল কে জানে। আমাকে ছেড়ে দিয়ে ও শালটা গায়ে জড়িয়ে নিল আবার। ভুরু কুঁচকে জিগ্যেস করল, ‘শুধু-শুধু তা হলে দরজা দিতে গেলে কেন?’
আমি চেয়ারে বসে পড়লাম। বললাম, ‘শরীরের লজ্জা আড়াল করতে দরজা দিইনি। দিয়েছি মনের লজ্জা আড়াল করতে। বোসো—।’
ও বসে পড়ল।
দাঁতে-দাঁতে চেপে আমি ঠিক করলাম, এইবার ওকে বলা দরকার। সত্যি কথার প্রয়োজন কখনও ফুরিয়ে যায় না।
‘শুভ, কুড়ি বছর মানে কত দিন জানো! সাত হাজার তিনশো দিন।’
‘তাতে কী হয়েছে?’
‘আজ আমার সর্বনাশের প্রায় বিংশতিতম বার্ষিকী..।’
‘লিলু, প্লিজ, আমাকে আর অপমান কোরো না। জানি, আমার অন্যায়ের কোনও ক্ষমা নেই…আমি…।’
‘কথা না বলে চুপ করে শোনো।’
শুভদীপের মুখে একটা ভয়ের ছায়া পড়ল। ওর পারফিউমের গন্ধ মিশে যাচ্ছিল মলিন ঘরের প্রাচীন গন্ধের সঙ্গে। কেমন এক অদ্ভুত বাতাবরণ কখন যেন তৈরি হয়ে গেছে এই শীতের সন্ধ্যায়।
শুভ ঠিক বুঝতে পারছিল না কী করবে, কোনদিকে তাকাবে, হাত দুটো কোথায় রাখবে।
আমি স্বগতোক্তির মতো বলতে শুরু করলাম, ‘সর্বনাশ বলতে তোমার হাতে আমার মেয়েলি ব্যাপার খোওয়া যাওয়া নয়। এমন কি তুমি আমাকে বিয়ে না করে সরে পড়েছ, তাও নয়। ব্যাপারটা অন্য। বিশ বছর আগে আমার বয়েস ছিল সতেরো কি আঠেরো—কিশোরী আর যুবতীর মাঝামাঝি বয়েস একটা। বাড়িতে ঝগড়া করে আজকের মতোই শীতের এক সন্ধ্যায় শ্যামবাজারের টেলিগ্রাফ অফিস থেকে তোমার বাড়িতে আমি ফোন করেছিলাম। তুমি নানান পাশ কাটানো কথা বলেছিলে আমায়। বলেছিলে, আপসেট হওয়ার কিছু নেই। তারপর তোমার কোনও ক্লাসমেটের সঙ্গে কথা বলার ভান করেছিলে। তুমি যদি…।’
শুভদীপের চোয়াল কিছুটা ঝুলে পড়েছিল। ও বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিল। আমি হাত তুলে ওকে বাধা দিলাম: ‘আমার কথা এখনও শেষ হয়নি। নানান দুশ্চিন্তা মাথায় করে সেদিন আমি বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। তুমি জানো না, কীভাবে আমার এক-একটা দিন, এক-একটা রাত কেটেছিল। বেশ কয়েকদিন সন্ধেবেলা আমি কফি-হাউসে গিয়ে তোমার জন্যে অপেক্ষা করেছি। তুমি আসোনি। শুভ, আমি কিন্তু তোমার বাড়িতে যেতে পারতাম। পারতাম ইউনিভার্সিটিতে তোমার সঙ্গে দেখা করতে। হয়তো হইচই হত, অনেক ঝামেলা হত—শেষ পর্যন্ত সমাধানও হয়তো একটা হত। কিন্তু আমার আত্মসম্মানে বেধেছিল। ফাঁপা আত্মমর্যাদা নিয়ে আমি শুধু অপেক্ষাই করে গেলাম মূর্খের মতো।’
