‘তোমাকে দেখে মনেই হয় না তোমার বয়েস তিরিশ পেরিয়েছে।’ শুভদীপ বোধহয় প্রশংসার মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।
‘তোমাকে দেখেও ঠিক একইরকম মনে হয়। মনে হয় সেই বিশ বছর আগের শুভ।’ ছেনালি করে ওর ছেনালির শোধ দিলাম। কিন্তু শুভ বোধহয় ব্যাপারটা ঠিক বুঝল না। কারণ মাথা ঝুঁকিয়ে ও ব্লাশ করল।
‘লিলু, কবে আবার দেখা হবে?’
আমি ওকে আমার ঠিকানা আর ফোন নম্বর দিলাম। বললাম, ‘কাল সন্ধে সাতটায় আমার বাড়ি এসো। আমি তোমার জন্যে ওয়েট করব—।’
শুভদীপ আমার হাত চেপে ধরল। গাঢ় গলায় বলল, ‘তোমার কাছে আমি অপরাধী হয়ে আছি। তুমি কখনও আমাকে ক্ষমা করবে ভাবিনি।’
হঠাৎ দেখি নাচুনী মেয়েটা আমাদের টেবিলের ওপর থেকে কোথায় মিলিয়ে গেছে। আর তখনই খেয়াল করলাম, রোগা ছোট-ছোট বুক মেয়েটা তখনও গান গাইছে: ‘মার দিয়া যায়, কে ছোড় দিয়া যায়। বোল তেরে সাথ কেয়া সলুক কিয়া যায়…।’
সত্যি, নিয়তির জবাব নেই! নইলে শুভদীপের সঙ্গে এতদিন পর এই অলৌকিক সাক্ষাৎ! এখন বুঝতে পারছি, রক্তের ঋণ সহজে শোধ হয় না। রক্তের ফোঁটা সহজে ধুয়ে ফেলা যায় না।
কফি শেষ করে আমি উঠে দাঁড়ালাম: ‘কাল সাতটায় এসো কিন্তু।’
শুভও উঠে দাঁড়াল: ‘ছ-টা বেজে ষাট মিনিটে আমি পৌঁছে যাব।’
বাড়ি ফেরার পথে অবাক হয়ে ভাবছিলাম, শুভদীপ কী চমৎকারভাবেই না দুটো প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছে। এক: ওর বিয়ের প্রসঙ্গ। দুই: বিশ বছর আগে ওর-আমার সন্তানের শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল তা ও জানতে চায়নি।
অনেক ভেবে দেখলাম, শুভদীপকে নিঃশর্ত ক্ষমা করে দেওয়াটা আমার অপদেবতাদের অভিপ্রায় নয়।
তা হলে কি আঠেরো বছরের একটা মেয়ের সঙ্গে অন্যায়ের জন্যে আটতিরিশ বছরের এক মহিলা প্রতিশোধ নেবে?
কাঁটায়-কাঁটায় সাতটার সময় শুভদীপ এল আমার বাড়িতে। পাজামা-পাঞ্জাবি-শাল পরে ও একেবারে ফুলবাবুটি সেজে এসেছে।
ও যখন আমাকে পাশ কাটিয়ে বাড়িতে ঢুকল তখন ওর গা থেকে পারফিউমের গন্ধ পেলাম।
আমার হাসি পেয়ে গেল। লড়াইয়ের জন্যে ও দেখছি পুরোপুরি তৈরি হয়ে এসেছে!
মা-কে বলে রেখেছিলাম, সাতটার সময় আমার কাছে একজন দামি মক্কেল আসবে। আর কাজের বাচ্চা মেয়েটাকে দোকানে পাঠিয়ে মিষ্টি আনিয়ে রেখেছি। মা শুভদীপের সামনে সেগুলোই সাজিয়ে দিয়ে গেল। ও ‘এ কী, এতসবের কী দরকার ছিল’ বলে একটু সৌজন্য দেখাল।
খেতে-খেতেই শুভ ঘরটা খুঁটিয়ে দেখছিল। আর আমি তলপেটের সেই চিনচিনে ব্যথাটা টের পাচ্ছিলাম।
ও মা-কালীর ফটো দেখল, বাবার ফটো দেখল, কিন্তু কোনও কথা বলল না।
আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আমিই প্রসঙ্গ তুললাম।
‘তোমার জীবনটা ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে।’ টেবিলে নখের আঁচড় টানতে-টানতে বললাম। তারপর মুখ তুলে তাকালাম ওর দিকে: ‘বিয়ে করেছ?’
ও অস্বস্তি পেয়ে নড়েচড়ে বসল। ওর খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। কোনও কথা বলার আগে ঢকঢক করে এক গ্লাস জল খেয়ে নিল।
‘আমার জীবনটা কোনও জীবন নয়, লিলু। শুধু অফিস-ফ্যাক্টরি-বাড়ি, অফিস-ফ্যাক্টরি-বাড়ি, এই করে দিন কাটছে। একটু থেমে ও বলল, ‘তবে কাল থেকে জীবনটা অন্যরকম লাগছে। আবার বাঁচতে ইচ্ছে করছে।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল: সত্যি, মানুষ ভাবে এক, আর ভগবান করে এক।’
বুঝতে পারলাম, বিশ বছরে শুভদীপ আরও চালাক হয়েছে। আরও সুন্দর করে মন-রাখা কথা বলতে শিখেছে। ওর ডায়ালগ শুনে আমার হাততালি দিতে ইচ্ছে করছিল। কী সুন্দরভাবেই না ও আমার প্রশ্নটাকে পাশ কাটিয়ে গেল!
মা এসে চা দিয়ে গেল। খালি প্লেট-গ্লাসগুলো তুলে নিয়ে গেল যাওয়ার সময়।
আমি নির্লিপ্ত গলায় একই প্রশ্ন করলাম আবার, ‘বিয়ে করেছ?’
আজকের লিলু বিশ বছর আগেকার খুকি লীলারানি নয়।
তা সত্ত্বেও ও চুপ করে আছে দেখে ভর্ৎসনা করে বললাম, ‘ওঃ, কাম অন, শুভ! ছেলেমানুষি কোরো না। আমি না করলে কী হবে, সবাই বিয়ে করে।’
একটা সিগারেট ধরাল শুভদীপ। চায়ের কাপে কয়েকবার চুমুক দিল। তারপর উদাস চোখে মা-কালীর ফটোর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সুস্মিতার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে বারো বছর। এই জানুয়ারিতে টুয়েলফথ অ্যানিভার্সারি। আমার কাছে ব্যাপারটা মৃত্যুবার্ষিকীর মতো।’
আমার হাসি পেয়ে গেল। বেচারা শুভদীপ আজ কত আশা নিয়েই না আমার বাড়িতে এসেছিল! বিশ বছর আগে পড়া আমার শরীরের ভূগোল বই ওর আজও মুখস্থ আছে কি না সেটা যাচাই করতে এসেছিল। অথচ কথাবার্তা কী অদ্ভুতভাবে ওর অপছন্দের পথে এগোচ্ছে।
আমি শুভর অভিনয়ে সায় দিয়ে সহানুভূতির অভিনয় করে বললাম, ‘কেন, সুস্মিতা কি তোমার সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে চলে না?’
‘ও আমাকে একটুও বোঝার চেষ্টা করে না। জানি, তুমি হয়তো ভাবছ এসব বলে তোমার সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছি, কিন্তু…’ হঠাৎই সিগারেট ফেলে দিয়ে আমার হাত চেপে ধরল শুভদীপ: ‘বিশ্বাস করো, লিলু, আমি ভীষণ একা—।’
শুভ আমার হাত কচলাতে লাগল।
আমার বিরক্ত লাগছিল, কিন্তু হাত ছাড়িয়ে নিলাম না। ওকে আমি একটু-আধটু আশকারা দিতে চাই। আমার পরিকল্পনার পক্ষে সেটা খুব জরুরি।
আমার হাসি পাচ্ছিল, কিন্তু অনেক কষ্টে হাসি চাপলাম। শুভর অভিনয়ে বুদ্ধির ছাপ আছে। তবে ওকে আমার খারাপ লাগছিল না। বোকা ভগবানের চেয়ে বুদ্ধিমান শয়তান অনেক ভালো।
