আমি হেসে বললাম, ‘শুধু বিয়ে কেন, অনেক কিছুই করা হয়ে ওঠেনি।’
আবার সিগারেট গভীর টান। তারপর: ‘বিয়ে না করার জন্যে নিশ্চয়ই আমার ঘাড়ে দোষ চাপাওনি!’
আমার বমি পাচ্ছিল, গা গুলিয়ে উঠছিল। বললাম, ‘ওটা ছাড়া আর কোনও টপিক নেই?’
শুভ হাসল—স্বস্তির হাসি। ও বোধহয় ভেবেছিল, আমি পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে ওর দায়দায়িত্ব নিয়ে চাপান-উতোর শুরু করব। সেই আশঙ্কা কেটে যেতেই ও অনেক সহজ হয়ে গেল।
‘এখন কোথায় থাকো? সেই শ্যামবাজারে?’
‘হ্যাঁ। একই বাড়িতে। থাকা বলতে আমি আর মা।’
‘মেসোমশাই?’
শুভদীপ আমাদের বাড়িতে কখনও যায়নি। শুধু আমার মুখে সকলের গল্প শুনেছিল। ওকে সংক্ষেপে সবার কথা বললাম। তবে বাবা যে আত্মহত্যা করেছে সেটা জানালাম না।
চিকেন স্যান্ডউইচ আর পটাটো চিপস চলে এল টেবিলে। সঙ্গে টমাটো সস।
শুভ সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে স্যান্ডউইচে সস মাখাতে শুরু করল। দু-এক টুকরো চিপস দাঁতে কেটে স্যান্ডউইচ কামড় বসাল।
আমারও খিদে পেয়েছিল। তাই লোক-দেখানো লজ্জা না করে খেতে শুরু করলাম।
‘তুমি আর মাসিমা বাড়িতে একা থাকো!’ শুভ বেশ অবাক হয়ে বলল। কিন্তু ওর চোখে একটা লোভের ছায়া দেখতে পেলাম আমি। মনে হল, কয়েক মিনিট পরেই ও হয়তো আমার বাড়িতে আসার বায়না ধরবে।
আমি ওর কথায় হাসলাম, বললাম, ‘দুজন থাকলে আর একা কোথায়?’
‘তোমাদের চলে কী করে?’
আমি স্যান্ডউইচ চিবোতে-চিবোতে বললাম, ‘স্যান্ডউইচটা বেশ ভালো করেছে।’
‘তোমাদের চলে কী করে?’ শুভদীপ নাছোড়বান্দার মতো দ্বিতীয়বার প্রশ্নটা করল।
আমি হেসে ওর দিকে তাকালাম, বললাম, ‘আমি স্যান্ডউইচ মাইনাস স্যান্ড। ওই করেই বেশ চলে যায়।’
শুভ চোখ কপালে তুলে জিগ্যেস করল, ‘তার মানে?’
‘আমি উইচ। সাদা কথায় যাকে ডাইনি বলে। তুকতাক ঝাড়ফুঁক নিয়ে আছি—।’
আমার কথায় ও এত জোরে হেসে উঠল যে, পাশের টেবিলের লোকজন প্রায় চমকে উঠল। কিন্তু ওর হাসি কিছুতেই আর থামতে চায় না।
হাসতে-হাসতে ওর চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল। কোনওরকমে বলল, ‘লিলু, দারুণ জোক করেছ। তোমাকে সেলাম।’
আমি কোনও কথা বললাম না। সত্যি কথা বলেছি, বিশ্বাস করা-না-করা ওর ব্যাপার। ওকে বিশ্বাস করিয়েই বা আমার কী লাভ!
‘এবার তোমার কথা বলো—।’ আমি ঠান্ডা গলায় বললাম।
শুভদীপের সাজপোশাক, হাতের হিরের আংটি ইত্যাদি জানিয়ে দিচ্ছিল ও বেশ আরামেই জীবন কাটাচ্ছে।
আমার তলপেটটা ব্যথা করছিল। চিনচিনে ব্যথা। এ-ব্যথা থেকে নিস্তার নেই। একটা সিনেমার রিল উলটোদিকে ঘোরাচ্ছিল কেউ। বিশ বছরের পথ পেরিয়ে গেল বিশ সেকেন্ডে। লীলা, এ তুই কী করলি! এ তুই কী করলি!
স্মৃতিকণা কোথা থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে টেবিলে। তারপর হাত-পা-বুক দুলিয়ে-দুলিয়ে ওর সে কী নৃত্য! ছাতা-পড়া পুরনো ঘা-টাকে ও যেন খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে দাগদগে করে তুলছিল।
আমি পলকের জন্যে চোখ বুজলাম। ওঃ! তোর এই হাহাকারী নাচ আর কত দেখব!
শুভদীপ ওর ব্যবসার কথা বলছিল। বাবার ব্যবসাকে কীভাবে কৃতিত্বের সঙ্গে ও ফুলিয়ে- ফাঁপিয়ে তুলেছে গর্ব করে সে-কথাই শোনাচ্ছিল। ওরা এখন প্রায় সাতাশ রকম কনুজিউমার প্রোডাক্ট তৈরি করে। বরানগরে ওদের বিশাল ফ্যাক্টরি। বাবা-মারা গেছেন চার বছর। এখন ও আর ওর ছোট ভাই সবকিছুর মালিক। মায়ের অংশটা ওরা দুজনেই দেখাশোনা করে। ওরা এখনও সেই যোধপুর পার্কের বাড়িতেই আছে। নতুন একটা বাড়ি তৈরি করেছে সল্টলেকে। সেটা লিজ দেওয়া আছে।
বোঝা গেল। আমার সামনে বসে স্যান্ডউইচ খাচ্ছে একজন সফল লম্পট।
আমি নির্লিপ্ত মুখে শুভর কথা শুনছিলাম। ও আমার কাছে ঝুঁকে এসে চাপা গলায় বলল, ‘লিলু, আমাদের প্রোডাক্টের লিস্টে অ্যাডাল্ট আইটেমও আছে।’
আমার কোনও প্রতিক্রিয়া হল না দেখে ও উদাস গলায় বলল, ‘আমাদের প্ল্যান্টে একটা অটোমেটিক পোরশান গন্ডগোল করছে। তাই কনসালট্যান্ট ফার্মকে খবর দিতে এদিকে এসেছিলাম। ভালোই হল তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।’
কথা শেষ করে শুভ একটা ভিজিটিং কার্ড বের করল পকেট থেকে। সেটা আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘রেখে দাও—।’
চোখ বুলিয়ে দেখলাম, তাতে অফিস আর বাড়ি—দুটো ঠিকানাই আছে।
একবার মনে হল কার্ডটা ওর মুখে ছুড়ে মারি। কিন্তু ল্যাংটো মেয়েটা টেবিলের ওপরে নাচতে-নাচতেই যেন চোখ টিপল আমাকে। ইশারা করল। কার্ডটা আমি হাতব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম।
হঠাৎই শুভদীপ জিগ্যেস করল, ‘এরপর তুমি কোথায় যাবে?’
বেয়ারা কফি দিয়ে গিয়েছিল। তাতে চুমুক দিয়ে বললাম, ‘কোথায় আবার, বাড়ি! মা একা আছে।’
শুভ ওর হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিল। চুমুক দেওয়ার ভঙ্গিতেই বোঝা গেল দু-এক পেগ ওর কাছে নেহাতই ট্রায়াল বল।
‘লিলু, একটা কথা বলব?’ শুভ সতর্ক চোখে আমাকে জরিপ করতে-করতে বলল, ‘আমাকে তোমার বাড়ি নিয়ে যাবে? আমি ভীষণ লোনলি…।’
আমি কফিতে আরামের চুমুক দিয়ে বললাম, ‘তাড়া কিসের! বিশ বছর পর আমাদের দেখা হল কি আবার বিশ বছরের ছাড়াছাড়ির জন্যে!’
‘লিলু, ইউ আর গ্রেট!’ শুভদীপ আবেগে যেন পা পিছলে পড়ল। ও বোধহয় আমার শরীরের তাপ-উত্তাপ টের পাচ্ছিল। হয়তো সেই তরঙ্গের কম্পাঙ্ক থেকে বিশ বছর আগে ডায়মন্ডহারবারের ব্যাপারটা জীবন্ত করে তুলতে চাইছিল মনে-মনে।
