ফুটপাথের কোণে দাঁড়িয়ে এসব নানান কথা ভাবছিলাম। অফিস ফেরত লোকজন অনবরত যাতায়াত করছে পাশ দিয়ে। হঠাৎই বিশ বছরের পুরোনো একটা ভূত দেখে আমি চমকে উঠলাম।
সঙ্গে-সঙ্গে কোথা থেকে লাফিয়ে পড়ল স্মৃতিকণা নামের মেয়েটা। আমাকে ঘিরে ফুটপাথের ওপরেই ড্যাং-ড্যাং করে নাচতে শুরু করল। ওর বুক ঊরু অশ্লীলভাবে নড়ছে। আর বিলোল কটাক্ষে আমাকে প্রতি মুহূর্তে শেষ করে দিচ্ছে।
ভূতটা আমার দিকে এগিয়ে আসছিল। খানিকটা অবাক হয়ে দেখছিল আমাকে।
আমি প্রথমটায় ভেবেছি সন্ধের আলোছায়ায় ভুল দেখছি। কিন্তু না, ভূতটা এখনও মিলিয়ে যায়নি!
আমি অবাক হয়ে গেলাম। সবকিছু সেই একইরকম—চলার ছিরি, মুখের ছাঁদ, চুলের কায়দা, আর সর্বনাশা সেই দুটো চোখ।
স্মৃতিকণা পাগলের মতো মাথা ঝাঁকিয়ে বাতাসে হাত-পা ছুড়ে নাচছিল। আমার মাথার ভেতরে মা অবাক চিৎকারে বলছিল, ‘লীলা, এ তুই কী করলি!’ আর বাবা কপাল চাপড়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদছিল
ভূতটা আরও কাছে এগিয়ে এসে আমার মুখোমুখি দাঁড়াল।
এবার আরও ভালো করে দেখলাম।
বয়েস হয়েছে, কপালের দুপাশের চুল ফিকে হয়ে এসেছে, কোমর একটু ভারী, প্যান্ট-শার্ট-সোয়েটারে স্মার্ট সাজার চেষ্টা করেছে বটে, তবে উঁচিয়ে ওঠা ভুঁড়ির জন্যে একটু বোকাসোকা লাগছে।
কিন্তু চোখ দুটো পালটায়নি। সেই গভীর টলটলে চোখ। রোমান্টিক। এখনও—বিশ বছর পরেও। কেন যে এই চোখের গভীরে সেদিন বোকা মেয়ের মতো ঝাঁপ দিয়েছিলাম! কেন যে ওকে অতটা বিশ্বাস করেছিলাম! কিন্তু তখন যে আমাদের বয়েসটাই ছিল না ভেবে কাজ করার বয়েস।
না, ভূতটাকে চিনতে আমার একটুও ভুল হয়নি।
‘আপনাকে যেন চেনা-চেনা লাগছে—’ ভূতটার গলার স্বরে এখনও সেই পুরোনো ম্যাজিক।
আমি বললাম, ‘শুভদীপ? শুভ?’
‘লীলা…শ্যামবাজার…লিলু…মানে…’ ও হাসল।
আমি উত্তরে একচিলতে হাসি ফুটিয়ে তুললাম ঠোঁটে।
‘ওঃ, সেই টিপিক্যাল হাফ স্মাইল! বাব্বাঃ, কতদিন পর দেখা! পনেরো-ষোলো বছর হবে, কী বলো?’
আমি বললাম, ‘পনেরো নয়, কুড়ি…বিশ বছর…।’
বিশ বছর? নাকি বিষ বছর?
শুভদীপের স্মৃতিশক্তির প্রশংসা করতে হয়। আমার ‘টিপিক্যাল হাফ স্মাইল’-এর ব্যাপারটাও ও মনে রেখেছে! কিন্তু বিশ বছরটা ভুলে গেছে অনায়াসে।
ফুটপাথে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলার পর শুভ বলল, ‘লিলু, চলো, কোথাও গিয়ে একটু বসি—যদি অবশ্য তোমার আপত্তি না থাকে। কত গল্প জমে আছে, জানো?’
আমি অবাক হয়ে শুনলাম আমি বলেছি, ‘চলো, কোনও আপত্তি নেই।’
রাস্তা দিয়ে কত গাড়ি ছুটে যাচ্ছিল। শুভকে আমি কেন এক ধাক্কায় কোনও গাড়ির তলায় ফেলে দিচ্ছি না! কেন খতম করে দিচ্ছি না ওর পৌরুষের আস্ফালন?
আমার একা-হয়ে যাওয়া মন বোধহয় এই মুহূর্তে কারও সঙ্গ চাইছিল। তাই ওর পাশাপাশি হেঁটে চললাম অনায়াসে। বাবার কান্না আর আমি শুনতে পাচ্ছিলাম না।
ফুটপাথ ধরে হাঁটতে-হাঁটতে শুভ বলল, ‘লিলু, সত্যি, ভাবা যায় না! বিশ বছর পর হঠাৎ করে এরকম রাস্তায় দেখা…!’
আমি অল্প হেসে বললাম, ‘আমি আর সহজে অবাক হই না, শুভ। ভাবা যায় না এরকম অনেক কিছু আমি এই বিশ বছরে ভাবতে শিখেছি।’
শুভ একটু অবাক চোখে দেখল আমার দিকে। মজা করে বলল, ‘আমার লিলু অনেক পালটে গেছে।’
‘পালটাবেই তো। আঠেরো বছর আর আটতিরিশ বছরে অনেক তফাত।’
আমরা ‘টমি ক্যাট’ রেস্তরাঁয় গিয়ে বসলাম।
রেস্তরাঁর ভেতরটা আবছা অন্ধকার। মাঝে-মাঝে লাল-নীল স্পট জ্বলছে। চাপা ঝংকার তুলে হালকা মিউজিক বাজছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছোট-ছোট বুকওয়ালা একটা রোগা মেয়ে মিহি গলায় হিন্দি গান গাইছে।
রেস্তরাঁর সাজগোজ মন্দ নয়। পালিশ করা কাঠের দেওয়াল। তার ওপরে পেতলের কারুকাজ। আর দেওয়ালের নানা জায়গায় রহস্যময় ছমছমে অয়েল পেইন্টিং ঝোলানো। দরজার কাছে রঙিন কাচের চুড়ির শিকল ঝুলিয়ে তৈরি চিক। তার জায়গায়-জায়গায় লাল-নীল-হলদে টুনি বাতি।
শুভদীপ মেনু কার্ড আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘পছন্দসই অর্ডার দাও।’
আমি বললাম, ‘শুধু একটু স্ন্যাক্স নেব। যেমন, চিকেন স্যান্ডউইচ চলতে পারে। তার সঙ্গে কফি।’
শুভ পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাতে-ধরাতে বলল, ‘ব্যস, এই! ড্রিঙ্কস নেবে না?’
‘না। অভ্যেস নেই—’ একটু থেমে তারপর: ‘তবে তুমি নিতে পার। আই ওন্ট মাইন্ড।’
শুভ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘আমি একটু হুইস্কি নেব। ফর ওল্ড টাইমস সেক—।’
বেয়ারা অর্ডার নিয়ে চলে গেল।
বিশ বছর আগের মতো সুন্দর করে হেসে শুধু জিগ্যেস করল, ‘বলো, কেমন আছ। কী-কী করলে এই কুড়ি বছরে—।’
ওর কথার সহজ সুরে মনে হল, বিশ বছর নয়, ওর সঙ্গে বিশ ঘণ্টা পরে যেন আমার দেখা হল।
টেবিলের একপাশে কাচের গ্লাসে সাজানো পেপার ন্যাপকিনের নকশা দেখতে-দেখতে বললাম, ‘তেমন কিছুই করিনি। শুধু বুড়ি হয়েছি। কোনওরকমে দিন চলে যাচ্ছে…।’
‘কে বলেছে তুমি বুড়ি হয়েছ!’ কথাটা বলে শুভদীপ আমার সাজপোশাক দেখছিল। বারবার তাকাচ্ছিল আমার বুকের দিকে। বয়েস সেখানে ছাপ ফেলতে পারেনি। তা ছাড়া আমি তো জানি, ওর বরাবরই বুকের নেশা—তা সে ছোটই হোক, আর বড়ই হোক।
‘বিয়ে তো করোনি দেখছি—।’
ওর সিগারেটের গন্ধ আমার নাকে এসে লাগছিল, আর বাবার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল আমার। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, মানুষটা সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছে আর কপাল চাপড়ে কাঁদছে।
