কিন্তু তিনদিন পর বুঝেছিলাম, বাবা আমার সর্বনাশ নিয়ে ভেঙে পড়েনি। বাবা ভেঙে পড়েছে নিজের সর্বনাশের চিন্তায়। কারণ, আমার ব্যাপারটা পাঁচ কান হলে দামি সিগারেট খাওয়া ম্যানেজারসাহেবের সামাজিক প্রতিষ্ঠার কী হাল হবে সেটা ভেবেই বাবা ভেঙে পড়েছিল। এই মানসিক চাপ মানুষটা নিতে পারেনি। তাই এক ছুটির দুপুরে সিলিং ফ্যানে মায়ের শাড়ি বেঁধে ঝুলে পড়েছিল।
বাবার গল্প সেখানেই শেষ হয়েছিল, কিন্তু আমার গল্প নয়।
স্বপ্নে দেখা স্লো-মোশান সিনেমার মতো আমি সবকিছু দেখতে পাচ্ছিলাম। তবে ছবির ফ্রেমের কোনা দিয়ে একটা সরু কালচে রক্তের ধারা ধীরে-ধীরে গড়িয়ে নামছিল।
পুরোনো স্মৃতি সত্যিই বড় নির্লজ্জ। যখন তখন ল্যাংটা হয়ে চোখের সামনে এসে নাচানাচি করে। যেমন এখন, এই অসময়ে, বিশ বছরের পুরোনো কথা মনে পড়ে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। স্মৃতিকণা নামের বিশ বছরের এই উদোম তরুণী শরীরে মোচড় দিয়ে ড্যাং-ড্যাং করে নাচতে থাকে। নাচতে-নাচতে ও কমলালেবুর খোসার রস ছুড়ে দেয় আমার চোখে। আমার চোখ জ্বালা করে, বুক জ্বালা করে।
হঠাৎ মায়ের গলা পেলাম, ‘কী রে, লিলু, ঘুমিয়ে পড়লি নাকি!’
আমি চোখ মেলে তাকালাম। এই শীর্ণ জীর্ণ বৃদ্ধা মহিলাকে দেখলে আমার চোখ জুড়িয়ে যায়। এঁর সহ্যের কোনও সীমা নেই।
একের পর এক মর্মান্তিক ঝড় বয়ে গেছে আমার মায়ের ওপর দিয়ে।
প্রথমে আমার ঘটনা।
তারপর বাবার স্বার্থপরের মতো আত্মহত্যা।
আর, অবশেষে, বুবু আর টুটুর আলাদা হয়ে যাওয়া।
বিয়ের পরই ওরা আলাদা হয়ে গেছে। দিদির সঙ্গে ওদের দূরত্ব আগেই অনেক বেড়ে গিয়েছিল। বিয়ের পর সেই দূরত্বের মাঝে কেউ যেন কংক্রিটের পাঁচিল তুলে দিয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত আমি আর মা পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে রইলাম। একটা সময়ে প্রচুর টিউশানি করে টাকা রোজগার করতাম। তারপর কী করে কী হয়ে গেল, ঝাড়ফুঁক তুকতাকের দু-একটা বই হাতে এসে গেল। আর একইসঙ্গে তন্ত্রমন্ত্রের দিকে ঝোঁক গেল বেড়ে। গোয়াবাগানের এক ‘বাবা’র আশ্রমে আমি প্রায়ই যেতাম। ভদ্রলোকের নাম নৃপেন সাধুখাঁ। সংসারী তান্ত্রিক বলে নিজের পরিচয় দিতেন। সেখানে প্রায় বছর পাঁচেক তাঁর সাধন সঙ্গিনী হয়ে ছিলাম। শরীর বা মন নিয়ে শুচিবায়ুর ব্যাপারটা আর ছিল না। তাই বোধহয় ‘গুরু’কে আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম।
‘তাড়াতাড়ি খেতে দিয়ে দেব?’ মা ব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘তোর কি খুব ক্লান্ত লাগছে?’
আমি একটা হাই তুললাম। তাকে রাখা টেবিলঘড়ির দিকে তাকালাম: প্রায় সাড়ে আটটা বাজে। মাকে বললাম, ‘ন-টা বাজলে খেতে দিয়ো। তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ব—।’
এমন সময় ফোন বেজে উঠল। মা ফোন ধরে কথা বলে আমার দিকে রিসিভার এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘তোর ফোন।’
আমি রিসিভার কানে চেপে ধরে ‘হ্যালো’ বললাম।
ও-প্রান্তে মিসেস খান্ডেলওয়াল কথা বললেন। আমার অনেকদিনের ক্লায়েন্ট। ওঁর বিশ্বাস, আমার মন্ত্রতন্ত্রের জন্যেই উনি মা হতে পেরেছেন।
প্রায় বছর ছয়েক হল আমার পসার বেড়েছে। ক্লায়েন্টরাই আমাকে সবকিছু দিয়েছে। এই টেলিফোনও ওদেরই দেওয়া। এসব আমি কখনও ভুলি না।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর যখন শুতে গেলাম, তখন হঠাৎই মনে হল, আর দিন কয়েক পর ১৮ ডিসেম্বর। বিশ বছর আগে ওই দিনটাতেই আমি শুভদীপকে টেলিফোন করতে বেরিয়ে শ্যামবাজার কালীবাড়ির দেওয়ালে মাথা খুঁড়েছিলাম—কিন্তু কোনও কাজ হয়নি।
এশিয়াটিক সোসাইটিতে কয়েকটা বইয়ের খোঁজে গিয়েছিলাম।
মাঝে-মাঝে নিজের পড়াশোনার কাজে ওখানে যেতে হয় আমাকে। আজ দুটো বই কিনলাম ওদের সেলস কাউন্টার থেকে: ‘এ ক্রিটিক্যাল এডিশান অফ শ্রীকালচক্রতন্ত্ররাজ’ আর ‘তন্ত্রলোক’। তারপর ওদের পুঁথিঘরে পড়াশোনা সেরে বেরিয়ে এসেছি বিকেলের পার্কস্ট্রিটে।
সূর্য ডুবে গিয়ে এর মধ্যেই ছায়া নেমেছে। শীতের হাওয়া বেরিয়ে পড়েছে সান্ধ্য ভ্রমণে। সামনের খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার ভীষণ একা-একা লাগছিল। মাঝে-মাঝে এই নিঃসঙ্গতার অসুখ আঁকড়ে ধরে আমাকে। আমার জানা এমন কোনও জড়িবুটি নেই যা এই অসুখ সারাতে পারে।
আমি জানি, আমি স্বাভাবিক নই। আমার বয়েসি যৌবন যাই-যাই কোনও মহিলা সারাদিন নানারকম স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যস্ত থাকে। আর আমি! আমার যত ব্যস্ততা আমার পেশাকে ঘিরে। আমার কোনও বন্ধু নেই—ছেলে-বন্ধুও না, মেয়ে-বন্ধুও না। শুভদীপের ঘটনার পর আমার বিশ্বাসের জায়গাটায় বোধহয় কোনও গোলমাল হয়ে গিয়ে থাকবে। তাই অনেকের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হলেও কাউকে আমি বিশ্বাসের আওতার মধ্যে নিয়ে এসে বন্ধু করতে পারিনি। শুধু আমি আর মা লতানে গাছের মতো পরস্পরকে জড়িয়ে কেমন অদ্ভুতভাবে বেঁচে আছি।
শরীরের তাড়না আমি কখনও-কখনও টের পাই। তখন কামোত্তেজনা দমন যন্ত্র সামনে রেখে নিয়মমতো অভিমন্ত্রিত করে সে-তাড়নার উপশম করি। তবে সবসময় যন্ত্র বা মন্ত্রে কাজ হয় না।
যে-তন্ত্রমন্ত্রের ব্যবসা করে আমি বেঁচে আছি, তাতে কি আমি বিশ্বাস করি?
বহুদিন ধরে ভেবে উত্তর পেয়েছি ‘হ্যাঁ’। আমার বিশ্বাসে ইন্ধন জুগিয়েছে আমার অসংখ্য মক্কেল। আর, যে কখনও তোমার ক্ষতি করবে না, তাকে বিশ্বাস করতে ভয় কিসের! তন্ত্রচর্চা কখনও আমাকে নিরাশ করেনি।
