আমি বললাম, ‘বলুন। আমার কাছে মন খুলে কথা না বললে কাজে নানান প্রবলেম হয়…।’
হাতের কাগজটা আমাকে দেখিয়ে তিনি অসহায় বালিকার গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘এসবে ঠিকঠাক কাজ হবে তো!’
‘আপনার কী মনে হয়?
তিনি বেশ লজ্জা পেয়ে বলে উঠলেন, ‘না, মানে, আমি ঠিক তা বলতে চাইনি। আপনি তো আমার মনের অবস্থা বুঝতেই পারছেন…ওইসব জিনিস ঘাঁটতে হবে। আমার গা গুলিয়ে উঠছে…বমি পাচ্ছে…।’
‘আপনার কোনও চিন্তা নেই। একবার একটু কষ্ট করেই দেখুন না। আর একটা কথা: যেদিন পানটা সেজে স্বামীকে খাওয়াবেন, সেদিন উপোস করে থাকবেন। খেয়াল রাখবেন, আপনার হাজব্যান্ড যেন কিছু টের না পায়—।’
ভদ্রমহিলা ঘন-ঘন ঘাড় নেড়ে কৃতজ্ঞতায় আমার হাত দুটো চেপে ধরলেন। আমি ওঁকে দরজার কাছে এগিয়ে দেওয়ার সময় বললাম, ‘হাজব্যান্ডের সামনে একটু সেজেগুজে থাকবেন। একটু পারফিউম-টারফিউম মাখবেন।’
আচমকা এই হিতোপদেশে ভদ্রমহিলা একটু যেন অবাক হলেন। কিন্তু কিছু বললেন না।
‘নিয়মগুলো ঠিক-ঠিক মানবেন। কাজটার এফেক্ট কী হল ও-সপ্তাহে আমাকে ফোন করে জানাবেন।’
এই বশীকরণ মন্ত্রে যদি কাজ না হয় তা হলে ওঁর অতীশকে আর ধরে রাখা যাবে না। তখন বাদুড়ের কান কেন, ইয়েতির ‘ইয়ে’ পানে সেজে খাওয়ালেও কোনও কাজ হবে না।
ভদ্রমহিলা চলে যাওয়ার পর আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে রইলাম। এখন আর কোনও ক্লায়েন্টের আসার কথা নেই। পাশের রান্নাঘর থেকে পাঁচফোড়নের গন্ধ নাকে আসছে। মা রান্না শুরু করে দিয়েছে।
চুপচাপ বসে আমি নিজের ফেলে আসা জীবনের কথা ভাবছিলাম। আর চার দেওয়ালে ঘেরা ছোট্ট ঘরটাকে দেখছিলাম। কুড়ি বছরে এই ঘরটা এতটুকু বদলায়নি। অথচ জীবন কত বদলে গেছে।
ঘরের দেওয়ালগুলো বিশ বছরে আরও জীর্ণ মলিন হয়েছে। একদিকের দেওয়াল নানানরকম তন্ত্র-মন্ত্র অলৌকিক আচারের বই আর কাগজপত্রে ঠাসা। আর একদিকের দেওয়ালে অনেকগুলো তাক। তাকে নানা জড়িবুটি, পশুপাখির লোম-পালক, হাড় আর নখ, রুদ্রাক্ষ, হরীতকী, শুকনো নিমপাতা, সাপের খোলস ইত্যাদি রয়েছে। ক্লায়েন্টদের দরকারে এগুলো ব্যবহার করতে হয় আমাকে।
তাকগুলোর ওপরে দেওয়ালে রক্ষাকালীর এক বিশাল মাপের ফটো টাঙানো। লোল জিহ্বা, করাল বদন, ছিন্দ মুণ্ডে সজ্জিতা দেবী। এই ফটোর প্রভাব আমার ওপরে যত না, তার চেয়ে ঢের বেশি আমার ক্লায়েন্টদের ওপরে। কারণ, দেবদেবীর ওপর ভক্তি আমার অনেকদিন আগেই ক্ষয়ে গেছে।
এখন আমার মা নিত্য দেবতার পুজো করে। আর আমি করি অপদেবতার পুজো।
মা কালীর উলটোদিকের দেওয়ালে আর-এক দেবতার ফটো: আমার পিতৃদেব। বছরে একদিন ধূপধুনো ফুলমালায় পুজো পেয়ে থাকেন। যদিও সবসময় উনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন, কিন্তু ফটোর মানুষ বলেই আমাকে দেখতে পান না। পেলে তাঁর ম্যানেজার-সুলভ গলায় নির্ঘাত ধমকের সুরে বলে উঠলেন, ‘এসব কী হচ্ছে, লিলু! তোমাকে না কতদিন শিখিয়েছি, ভূত-প্রেত অবদেবতা বলে কিছু নেই!’
‘দেবতা বলেও তো কিছু নেই, বাবা!’ আমি হেসে আপনমনেই বলে উঠলাম।
এই বাড়িতে দেবতা একদিন ছিল। কিন্তু বিশ বছর আগে তাঁরা একটা আঠেরো বছরের অসহায় মেয়েকে একা ফেলে রেখে আকাশে চম্পট দিয়েছে।
বাবার ফটোর দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। আমার গা গুলিয়ে উঠছিল, বমি পাচ্ছিল অকারণে। পুরোনো সেই রাতটাকে আমি ফিরে পাচ্ছিলাম মনে-মনে।
অবস্থা যখন চরমে পৌঁছেছিল তখন ব্যাপারটা আর চেপে রাখতে পারিনি আমি। গা গুলিয়ে, মাথা ঘুরে, বমি হয়ে সে এক সাংঘাতিক অবস্থা!
মা আমাকে ধরে-ধরে বাথরুমে নিয়ে যাওয়ার সময় বারবার জিগ্যেস করছিল: ‘লিলু, কী হয়েছে বল! কী হয়েছে বল!’
আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। শুভদীপের নির্লিপ্ত নির্বিকার গলা কানে বাজছিল: ‘ভয়ের কিছু নেই।’ আর ততই আমার ভয় বাড়ছিল।
মা-কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলাম আমি। মা আমার দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে কী বুঝেছিল কে জানে! মায়ের চোখে জল এসে গিয়েছিল। চাপা ভর্ৎসনার গলায় বলেছিল, ‘লীলা, এ তুই কী করলি!’
আমার গা পাক দিয়ে উঠেছিল। ছুটে বাথরুমে গিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বমি করতে শুরু করলাম। মা তাড়াতাড়ি এসে বাথরুমের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়েছিল, যাতে নাক-গলানে পড়শিরা আমার বমির শব্দ শুনতে না পায়।
সেদিন রাতে ঠাকুরের আসনের কাছে গলায় আঁচল দিয়ে বসে মা পাথরের মূর্তি হয়ে স্থির ভেজা চোখে তাকিয়ে ছিল দেবতার দিকে। এই বিশটা বছরে দেবতারা মা-কে কী দিতে পেরেছেন জানি না, তবে মা এখনও ঠাকুরের আসন ছাড়েনি, দেবতাদের ছাড়েনি, আর…আর আমাকেও ছাড়েনি।
চোখ বুজে চেয়ারে হেলান দিয়ে আমি বাবার গলা পেলাম। বাবা কাঁদছে।
রাত তখন অনেক। পাশের ঘর থেকে মা আর বাবার চাপা কথাবার্তা কানে আসছিল। হঠাৎই বাবা কেঁদে উঠল। ইনিয়েবিনিয়ে কপাল চাপড়ে কাঁদতে লাগল।
আমি অস্বস্তি আর যন্ত্রণার মধ্যেও হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ফিটফাট পোশাক পরা চব্বিশ ঘণ্টার ম্যানেজারসাহেব কাঁদছে! বাবাকে সেই প্রথম কাঁদতে শুনেছিলাম। মানুষটা ভেঙেচুরে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। অফিসে বাড়িতে যে সবসময় শৃঙ্খলা বজায় রাখে সে নিজেই বেসামাল বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল।
সে-রাতে আমার ভালো লেগেছিল। বাবা তা হলে আমাদের কথা ভাবে, আমার সুখ-দুঃখের কথা ভাবে!
