শুভদীপ ওর সঙ্গে সবরকম যোগাযোগ ছিন্ন করে দিয়েছিল।
একটি শীতের সন্ধ্যা, ১৯৯৪ সাল
ভদ্রমহিলা আমার মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসেছিলেন। বেশ মোটামোটা কালোকোলো চেহারা। সিঁথির সিঁদুর বেশ চওড়া। যতটা চওড়া, স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক বোধহয় ঠিক ততটাই সরু। তাই আমার কাছে এসেছেন। সম্পর্ক জোড়া লাগানোর ঝাড়ফুঁক তুকতাক করতে।
বড়-বড় চোখ মেলে আমার দিকে তাকিয়ে একটু খোনা গলায় তিনি অনুনয় করে বললেন, ‘কিছু একটা আপনাকে করতেই হবে। অনেক আশা নিয়ে আমি এসেছি—।’
আমি মহিলাকে ভালো করে দেখলাম। তিনটি সন্তানের জননী। জননী হওয়ার জন্যে আলাদা কোনও যোগ্যতার দরকার হয় না। এ-ব্যাপারে পশু বা মানুষের কোনও তফাত নেই। শুধু জন্মসূত্রে শারীরিক কোনও গোলমাল না থাকলেই হল।
ভদ্রমহিলার স্বামী অন্য মেয়েছেলের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করে বেড়ায়। কবে নাকি স্বামীর ব্যাগের মধ্যে একটা পারফিউম মাখানো রুমাল পেয়েছিলেন তিনি। তারপর দু-মাসের ব্যবধানে দুটো চিঠি। না, নির্দোষ চিঠি নয়, প্রেমপত্র।
এ নিয়ে স্বামীর সঙ্গে তুমুল হয়ে গেছে, অথচ লাভ কিছুই হয়নি। ভদ্রমহিলার যা চেহারা দেখছি তাতে ওঁর পক্ষে স্বামীকে বশ করা বেশ মুশকিল। তার ওপর উনি ফ্রিজিড কি না কে জানে!
কিন্তু চেষ্টা আমাকে করতেই হবে। এই চেষ্টা করার জন্যেই সবাই আমাকে টাকা দেয়। আর সেই টাকাতেই আমার আর মায়ের দিন চলে যায়।
‘আপনার স্বামীর নাম কি?’ ওঁকে জিগ্যেস করলাম।
‘অতীশ। অতীশ নন্দী—’ উৎসাহ নিয়ে মহিলা বললেন।
আমি পাশের টেবিল থেকে বেশ মোটাসোটা একটা বই টেনে নিলাম। অতি ব্যবহারে বইয়ের পৃষ্ঠাগুলোর সেলাই ঢিলে হয়ে গেছে। পাতা ওলটাতে-ওলটাতে নির্দিষ্ট একটা জায়গা খুঁজে পেলাম: পতি বশীকরণ মন্ত্র। পাতার মার্জিনে আমারই লেখা নানান নোট।
সামনে রাখা একটা সাদা খাতা টেনে নিলাম। একটা ফরসা পৃষ্ঠা বের করে লিখতে শুরু করলাম:
মন্ত্র: ‘ওঁ নমো মহাযক্ষিণী পতিং মে বশ্যং কুরু-কুরু স্বাহা।’
মঙ্গলবার একটি গোটা সুপারি উক্ত মন্ত্রে ২১ বার অভিমন্ত্রিত করে মুখে রাখবে। স্বামী ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর, সুপারিটি মুখ থেকে বার করে দুধ, গঙ্গাজল দ্বারা ধুয়ে আবার সেই সুপারিটি উক্ত মন্ত্রে ২১ বার অভিমন্ত্রিত করে সেটা কুচিয়ে পান সেজে স্বামীকে খাওয়ালে পতি বশ হবে। তীব্র বশীকরণ প্রভাব পেতে হলে সুপারির সঙ্গে বাদুড়ের কানের সামান্য টুকরো এবং গোরোচনা মিশিয়ে পতিকে খাওয়াতে হবে। এ ছাড়া অভিমন্ত্রিত করার সময় নীচের যন্ত্রটি অষ্টগন্ধের সাহায্যে ভুর্জপত্রে অঙ্কন করে চোখ বুজে বাঁ-হাতের কনিষ্ঠা দ্বারা স্পর্শ করে রাখতে হবে। এই আচার পালন করলে সিদ্ধিলাভ অনিবার্য।
লেখা এবং যন্ত্রের ছবি আঁকা শেষ হলে কাগজটা ভদ্রমহিলার হাতে নিয়ে বললাম, ‘আপনার চেনাজানার মধ্যে অতীশ নামে আর কেউ নেই তো?’
ভদ্রমহিলা দ্রুত মাথা নেড়ে জানালেন, না, কেউ নেই।
আমি বললাম, ‘থাকলে মুশকিল হত। দুজন অতীশই আপনার টানে পাগল হত।’
ভদ্রমহিলা বিনয়ের হাসি হেসে বোধহয় ব্লাশ করলেন। গায়ের রঙ কালো বলে রক্তের টুকটুকে লাল উচ্ছ্বাস বোঝা গেল না।
কাগজের লেখা ইত্যাদি পড়া শেষ হলে তিনি আমার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘গোরোচনা জিনিসটা কী?’
‘গোরুর পিত্ত থেকে একরকম চকচকে হলদে জিনিস বেরোয়—সেটাই।’
‘কিন্তু এই গোরোচনা আর বাদুড়ের কানের টুকরো পাব কোত্থেকে? ওগুলো বাদ দিয়ে যদি…।’
ওঁকে বাধা দিয়ে বললাম, ‘সব কিছুরই একটা নিয়ম আছে। ওগুলো বাদ দিলে কাজ হবে না। আপনাকে নিউ মার্কেটের একটা ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি। ওখানে গিয়ে আমার নাম বললে সব পেয়ে যাবেন। তবে দোকানের নামটা আর কাউকে জানাবেন না—।’
ভদ্রমহিলা কৃতজ্ঞভাবে বারবার ঘাড় নাড়লেন। তারপর তাঁর হাতব্যাগ থেকে কয়েকটা একশো টাকার নোট বের করে জিগ্যেস করলেন, ‘কত দেব?’
আমি বই আর খাতা গুছিয়ে রাখতে-রাখতে বললাম, ‘দুশো—।’
এমন সময় মা দু-কাপ চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। চেহারা এতই রোগা যে, গায়ের চাদরের একপাশ খসে পড়েছে। মুখে অসংখ্য ভাঁজ, চোখে চশমা, গাল ভাঙা, মাথার সব চুল সাদা ধবধবে।
আমাদের দুজনের সামনে দুটো কাপ সাজিয়ে দিতেই ভদ্রমহিলা হাঁ-হাঁ করে উঠলেন, ‘এতসবের কী দরকার ছিল…।’
আমি বললাম, ‘আমার মা—।’
মহিলা দুশো টাকা আমার হাতে দিয়ে ব্যাগটা সরিয়ে রেখে আচমকা উঠে পড়লেন চেয়ার ছেড়ে। মায়ের কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে ঝপ করে একটা প্রণাম সেরে ফেললেন। মা লজ্জা পেয়ে পিছিয়ে গেল।
আমি মজা পেলাম। ভদ্রমহিলা বোধহয় মা-কে বড়-ডাইনি ভেবেছেন, তাই এত ভক্তি।
মা কোনও কথা না বলে চলে গেল। বহু বছর ধরেই মা খুব কম কথা বলে।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে-দিতে ভদ্রমহিলা বিড়বিড় করে আমার দেওয়া কাগজটা পড়ছিলেন। বোধহয় এখন থেকেই মন্ত্র প্র্যাকটিস শুরু করে দিয়েছেন।
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। শুধু মাঝে-মাঝে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার শব্দ।
ভদ্রমহিলা এখন বোধহয় এই মধ্যবিত্ত মলিন ঘরে বসে থাকতে অস্বস্তি পাচ্ছেন। কাজ মিটে গেলে কে-ইবা ডাইনির আস্তানায় বসে থাকতে চায়!
চা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘একটা কথা জিগ্যেস করছি…কিছু মনে করবেন না…।’
