ওর বাবা অতসব লক্ষ করেননি। সদাগরি অফিসের ম্যানেজারসাহেবের অতসব লক্ষ করার সময় কোথায়! সবসময় ধোপদুরস্ত পোশাকে ফিটফাট হয়ে রয়েছে। ঠোঁটে ঝুলছে সিগারেট। বাড়িতে তিনি সাধারণ সিগারেট খান। কিন্তু রাস্তায় বেরোলেই আঙুলের ফাঁকে থাকে দামি সিগারেট—অফিসেও তাই। অফিসের গাড়ি সকাল ন’টার সময় তাঁকে মোহনলাল স্ট্রিটের মুখ থেকে তুলে নিয়ে যায়। সেই গাড়িতে অফিসের আরও দুজন হোমরাচোমরা যাতায়াত করেন।
বাড়িতে বাবা যখনই কোনও কথা বলেন তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে অফিস আর উন্নতি। মানুষটা শুধু প্রতিপত্তি আর সামাজিক প্রতিষ্ঠার চিন্তা করেই গেল। মায়ের কাছে শুনেছে, একেবারে গরিব অবস্থা থেকে বাবা এই মাঝারি অবস্থায় পৌঁছেছেন। মাঝারি থেকে এখন পৌঁছতে চান অনেক উঁচুতে।
ছেলেমেয়েদের সুখদুঃখের খবর তিনি খুব কম নেন। আর যখনই নেন, সেটা একেবারে অফিসারের ঢঙে। কাজে-কর্মে ভুল হলে মাকে অধঃস্তন কর্মচারী ভেবে দিব্যি ধমক লাগান আর আঙুলের ফাঁকে সিগারেট রেখে একমনে রেডিয়োর খবর শোনেন।
দেশের খবর নিয়ে কমবেশি মাথাব্যথা থাকলেও বাড়ির খবরে খুব একটা বোধহয় আগ্রহ ভদ্রলোকের ছিল না। তা না হলে সদ্য-যুবতী মেয়ের তাল-কেটে-যাওয়া রোজকার জীবন কেন তাঁর নজরে পড়বে না!
আজ সারাদিন মায়ের সঙ্গে বেশ কয়েকবার কথা কাটাকাটি হয়েছে মেয়েটির। অথচ মা-কে ও প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। ছোটবেলা থেকে ওর মনে শুধুই মায়ের স্মৃতি। কারণ ওর বাবা তখন গরিব থেকে মধ্যবিত্ত হওয়ার চেষ্টায় দিনরাত ব্যস্ত ছিলেন।
ছোট-ছোট ভাই দুটোকেও মেয়েটি খুব ভালোবাসে। বুবুর বয়েস আট, আর টুটুর বয়েস পাঁচ। ‘দিদি’ বলতে ওরা দুজনেই একেবারে আত্মহারা। অথচ আজ ভাই দুটোর সঙ্গেও হাসিখুশি ব্যবহার করতে পারেনি মেয়েটি।
একটিমাত্র দুশ্চিন্তা ওকে চোখের পলকে অন্য গ্রহের বাসিন্দা করে দিয়েছে। ওর সুখ-দুঃখ ব্যথা-বেদনা যেন ছোট্ট একটা ঘরে লুকিয়ে পড়েছে। আর সেই ঘরের জানলাগুলোও যেন বন্ধ করে দিয়েছে কেউ।
একটু আগে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মা ভুরু কুঁচকে জিগ্যেস করেছে, ‘কোথায় বেরোচ্ছিস, এখন, এই ঠান্ডার মধ্যে?’
‘একটা…একটা ফোন করব…।’
‘কাল সকালে করিস।’
‘না। খুব জরুরি ফোন—এখনই করা দরকার।’ দরজার কাছে ঘাড় গোঁজ করে দাঁড়িয়ে ছিল ও।
‘যা তা হলে। যা ভালো বুঝিস কর। এখন তুই বড় হয়ে গেছিস, নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে শিখেছিস—’ মা অন্যদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কথা বলছিল।
মা-কে জড়িয়ে ধরে ওর কাঁদতে ইচ্ছে করছিল তখন।
‘আজ সকাল থেকে তোর কী হয়েছে!’ মা আলনার জামাকাপড় গুছোতে-গুছোতে আবার কথা বলছিল, ‘তোকে নিয়ে আমার চিন্তা হয়—’
শুভদীপের কথা কাউকে বলেনি ও। বাবা তো জানেই না, মা-ও না। ইস, যদি মা-কে সব খুলে বলতে পারত।
মেয়েটি নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিয়েছে, ‘কেন, শুধু-শুধু চিন্তার কী আছে!’
মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল: ‘দশ মাস দশ দিন তো পেটে ধরেছি, তাই…।’
দশ মাস দশ দিন!
কথাটা ধাক্কা মারল মেয়েটির বুকে। ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই দশ দিন কেটে গেছে। তা হলে আর দশ মাস বাকি। মা যদি ব্যাপারটা এখন শোনে তা হলে কি হার্টফেল করবে? মায়ের তো আবার হাই ব্লাড প্রেসারের ধাত রয়েছে।
আর কথা বাড়ায়নি ও। থমথমে মুখে সদর দরজা খুলে নেমে এসেছে রাস্তায়।
এখন, বাড়ি ফেরার পথে, বারবার ওর মনে হচ্ছিল, প্রতিটি মুহূর্তে ওর শরীরের ভেতরে আর একটা শরীর বেড়ে উঠছে।
মেয়েটির চিন্তা এলোমেলো দিশেহারাভাবে ছুটোছুটি করে শেষ পর্যন্ত পাথরের দেওয়ালে মাথা খুঁড়ে মরছিল।
‘মা জননী, অন্ধকে কিছু সাহায্য করবেন—।’
চমকে উঠে মেয়েটি দেখল, ফুটপাথে একজন অন্ধ ভিখারি একটা তোবড়ানো অ্যালুমিনিয়ামের বাটি নিয়ে ভিক্ষে করছে।
মেয়েটি পার্স থেকে একটা টাকা বের করে লোকটিকে দিল।
‘ভগবান আপনার ভালো করবেন…।’
মেয়েটি প্রায় চোখ বুজে সেই আশিস গ্রহণ করল। এখন ওর সবরকমের শুভেচ্ছা প্রয়োজন।
বাড়িতে ফেরার পর মেয়েটি ঠিক করল, কাল ও ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে শুভদীপের সঙ্গে দেখা করবে। এই সমস্যাটা এমন কিছু বড় সমস্যা নয়। শুভদীপ নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যবস্থা করবে। আর শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সমাধান তো একটা আছেই: বিয়ে।
এই চিন্তাটাকে পাখির ছানার মতো বুকে আঁকড়ে ধরে বাকি রাতটা কাটিয়ে দিল মেয়েটি। বারবার ওর গা গুলিয়ে উঠছিল, মাথা দপদপ করছিল। কিন্তু শুভদীপের সঙ্গে কাটানো ভালোবাসার মুহূর্তগুলোর কথা সিনেমার ছবির মতো পরপর ভেবে ও নিজেকে সামলে রাখছিল। কখনও-কখনও দু-এক কলি গান গেয়ে মনটা হালকা করতে চাইছিল।
কাল শুভদীপের সঙ্গে দেখা হলেই আর কোনও চিন্তা নেই। তারপর মা-কে সব কথা খুলে বলবে ও। মা-কে কষ্ট দিয়েছে ভেবে ও মনে-মনে কষ্ট পেল। কাল ও মা-কে গলা জড়িয়ে ধরে সব বলবে। বলবে, ‘মা, মাগো, আমিও তোমার মতো দশ মাস দশ দিন কষ্ট করতে শিখেছি।’
মনটা বোধহয় ওর শান্ত হয়ে আসছিল। কারণ, একসময় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল মেয়েটি। তবে ঘুমিয়ে পড়ার আগে ও আকুল হয়ে তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীকে ডেকেছিল।
দেবতারা যে ওর আকুল প্রার্থনায় কান দেননি সেটা মেয়েটি বুঝতে পেরেছিল এক সপ্তাহের মধ্যেই।
