হাসল শুভ, বলল, ‘কাঁদছ কেন, বোকা মেয়ে! রেগল্যান ট্যাবলেট খেয়ে নাও, বমি-বমি ভাব এক্ষুনি কেটে যাবে। কোনও কারণে বোধহয় খাওয়াদাওয়ার গণ্ডগোল হয়েছে।’
মেয়েটি বুঝতে পারল, ও-প্রান্তে টেলিফোনের সামনে শুভদীপ এখন একা এবং নিরাপদ। কিন্তু শুভর কথায় ভরসা না পেয়ে ও তখনও কাঁদছিল। জড়ানো গলায় বলল, ‘না, না, সেসব নয়। অন্য ব্যাপার—ট্যাবলেট খেলেও কমবে না। তুমি বুঝতে পারছ না। সেই যে পুজোর সময় আমরা ডায়মন্ডহারবার গিয়েছিলাম। তোমাকে তখন অত করে বারণ করলাম, তুমি শুনলে না। বললে, ভয়ের কিছু নেই…এখন কী সর্বনাশ হল বলো তো।’ কান্না আরও বেড়ে গেল।
‘আস্তে, আস্তে—’ চাপা গলায় বলে উঠল শুভ।
তা হলে কি ওর বাবা আবার ঢুকে পড়েছেন ঘরে? কিন্তু মেয়েটি তখন মরিয়া। একমাত্র শুভদীপই ওকে বাঁচাতে পারে এই পাগল-করা ঝড় থেকে। তাই ও জেদি গলায় বলল, ‘কাল আমি ছ-টার সময় তোমার জন্যে কফি হাউসে ওয়েট করব। তুমি আসবে কিন্তু। তারপর—।’
‘তুমি মিছিমিছি ভয় পাচ্ছ।’ ওকে বাধা দিয়ে বলে উঠল শুভদীপ, ‘মাত্র একবারে এত কিছু হতে পারে না। নিশ্চয়ই তুমি হিসেবে কোনও গন্ডগোল করছ। আর তাতেই এত প্যানিকি হয়ে উঠেছ। যাকগে, কোত্থেকে ফোন করছ তুমি?’ শুভ জানে ওদের বাড়িতে ফোন নেই।
মেয়েটি বলল।
‘ও ব্বাবা! এই সামান্য ব্যাপারের জন্যে এই ঠান্ডার মধ্যে এতদূর চলে এসেছ। এরকম হিসেবের গোলমাল তোমার আগেও হয়েছে। ওসব বাজে চিন্তা ঝেড়ে ফেলে বাড়ি যাও। ভালো করে খেয়ে-দেয়ে কষে ঘুম দাও—।’
‘কাল তুমি ছ’টার সময় আসছ তা হলে?’ মেয়েটি ভয় পাওয়া গলায় জিগ্যেস করল।
‘কাল ছ’টার সময় বোধহয় হবে না। কাল আমাদের বিজনেসের ব্যাপার নিয়ে বাবার সঙ্গে একটু বসতে হবে…।’
শুভদীপ যে পড়াশোনার ফাঁকে-ফাঁকে বাবার ব্যবসায় সময় দেয় সেটা মেয়েটি জানে। কিন্তু এখন এই জরুরি অবস্থায় ওর কি বিজনেস নিয়ে মাথা না ঘামালে চলছিল না!
‘শুভ, প্লিজ, এই অবস্থায় তোমার সঙ্গে কথা বলতে না পারলে আমি মরে যাব। যা হওয়ার তা হয়েছে। কিন্তু, তুমি পাশে না থাকলে আমি—।’
‘শোনো, এত আপসেট হওয়ার কিছু নেই। পরশু সন্ধেবেলা…অ্যাই, শোনো, কাল আমি বিডিজি-র ক্লাসটা করতে পারব না। ইন্ডিয়ান পলিটিক্স নিয়ে অনেকটা লাইব্রেরি ওয়ার্ক বাকি আছে। নোট করলে তোকে দেব, কপি করে নিস। এখন রাখছি। কাল এগোরোটায় ক্লাসে দেখা হবে।’ বলে টেলিফোন রেখে দিল শুভ।
মেয়েটি বুঝতে পারল, শেষ দিকটায় শুভ কাল্পনিক কোনও ক্লাসমেটের সঙ্গে কথা বলছিল। ওর এই অভিনয়ের একমাত্র কারণ হয়তো টেলিফোনের কাছাকাছি ওর বাবা এসে পড়েছেন। কিন্তু এই অবস্থায় অন্য সমস্যার কথা শুভ ভাবছে কেমন করে! মেয়েটি তো অন্য কোনও সমস্যার কথা আর ভাবতে পারছে না!
গা গুলিয়ে উঠল মেয়েটির। গলা দিয়ে উঠে আসতে চাইল সবকিছু। দাঁতে দাঁত চেপে চোয়াল শক্ত করে ঢোক গিলল ও। রিসিভার রেখে দিয়ে আবার ডায়াল ঘোরাল।
বুথের বাইরে একজন তরুণ টেলিফোন করার জন্য অপেক্ষা করছিল। মেয়েটিকে দ্বিতীয়বার ডায়াল ঘোরাতে দেখেই হ্যাঁচকা টানে দরজাটা খুলে দিল সে। রুক্ষ গলায় বলল, ‘কী হল, দিদি। এখানে পরপর দুটো টেলিফোন করা যায় না। বাইরে আসুন, আমার হয়ে যাক, তারপর আপনি আবার করবেন—।’
মেয়েটি ঘুরে তাকাল ছেলেটির দিকে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছেলেটি পাথর হয়ে গেল। ভাসানের সময় দুর্গা প্রতিমার মুখটা ঠিক এরকম দেখায়।
মেয়েটি কান্না-চাপা গলায় বলল, ‘প্লিজ, আমার ভীষণ জরুরি দরকার…।’
ঠিক আছে, ঠিক আছে, আপনি করে নিন। বলেছি বলে কিছু মাইন্ড করবেন না।’
আবার ফোন করল মেয়েটি।
ও-প্রান্তে সেই রাশভারী গলা।
মেয়েটি রিসিভার রেখে দিল।
আবার ডায়াল ঘোরাল। আবার সেই কণ্ঠস্বর।
তারপরও সেই একই ব্যাপার।
তারপরের চেষ্টায় ও-প্রান্তে কোনও রিং শোনা গেল না। বোধহয় শুভদীপের বাবা বিরক্ত হয়ে রিসিভার নামিয়ে রেখেছেন একপাশে।
একটা ঘোরের মধ্যে টেলিফোন বুথ থেকে বেরিয়ে এল মেয়েটি। এখন আর ফোন করার চেষ্টা করেও কোনও লাভ নেই। কিন্তু এখন কী করবে ও?
পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে মেয়েটি নানান কথা ভাবছিল।
সন্দেহটা ওর মনে মাথাচাড়া দিয়েছিল দিন সাতেক আগে থেকেই। মেয়েলি নিয়মটার গরমিল হতেই ওর ডায়মন্ডহারবারের ব্যাপারটা মনে পড়ে গিয়েছিল। তারপর যত দিন গেছে, ভয়টা ততই জমাট বেঁধেছে। অবশেষে কাল রাত থেকে ওয়াক উঠতে শুরু করেছে। রাতে ও দু-একবার বাথরুমে গিয়েছিল তার মধ্যে একবার বমির দমক চাপতে পারেনি। কিন্তু শুধু খানিকটা জল বেরিয়ে আসা ছাড়া আর কিছুই বেরোয়নি মুখ দিয়ে।
তারপর আজকের জঘন্য সকালটার শুরু। গা গুলোনো, মাথা ঝিমঝিম, সেইসঙ্গে ছোটখাটো আরও কত নানান উপসর্গ।
মা কয়েকবার স্নেহ মাখানো অবাক চোখে তাকিয়েছে, ডাক্তার দেখানোর কথা বলেছে, ওষুধ খাওয়ার কথা বলেছে। কিন্তু মেয়েটি বিশেষ আমল দেয়নি। বরং আজ অনেক বেশি সময় ধরে ও প্রার্থনা করেছে ঠাকুরের আসনের সামনে। সেখানে অধিষ্ঠিত মা কালী, দেবী লক্ষ্মী, আর দেবাদিদেব মহাদেব। তাঁরা নিশ্চয়ই ওর প্রার্থনায় বিশেষ কান দেননি, কারণ শরীরের অস্বস্তি সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে আরও বেড়েছে।
