মেয়েটি আস্তিক। ওর বাড়িতে ঠাকুরের আসন আছে। সেখানে ওর মা সকাল-সন্ধে পুজো করেন। মেয়েটিও একই অভ্যাস পেয়েছে মায়ের কাছ থেকে। দেবদেবীর ওপরে ওর ভক্তি আছে, আস্থাও। এই পথ ধরে ও বহুদিন বহুবার যাতায়াত করেছে, কিন্তু এই কালী মন্দিরে কখনও থমকে দাঁড়িয়ে প্রণাম জানায়নি। ওর কাছে ওর বাড়ির দেবদেবীই ছিল সব।
কিন্তু আজ সকাল থেকেই ওর সমস্ত হিসেব গুলিয়ে গেছে। মাথা ঠিকমতো কাজ করছে না। মনের অবস্থাও এলোমেলো। তাই ও-দিকের ফুটপাথে কালী মন্দিরটা চোখে পড়ামাত্রই ও কোনওরকমে গাড়ি-ঘোড়া বাঁচিয়ে রাস্তা পার হল। ওর টানা-টানা চোখে নাম-না জানা আশঙ্কা। রাস্তার ধার ঘেঁষে বসেছিল কয়েকজন শাকসবজি বিক্রেতা। তাদের পাশ কাটিয়ে মেয়েটি চলে গেল ফুটপাথের ওপরে। মন্দিরের কাছে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে গাঢ় চোখে অনুভব করল জাগ্রত মা কালীকে। মেয়েটির চোখ জলে ভিজে গেল। মনে পড়ে গেল মায়ের কথা, বাবার কথা, ছোট-ছোট দুটো ভাইয়ের কথা।
আর শুভদীপের কথা।
প্রতিমাকে প্রণাম জানিয়ে মেয়েটি অন্যান্য ভক্তের পাশ কাটিয়ে সরে এল মন্দিরের দেওয়ালের কাছে। তারপর বিষাদে আকুল হয়ে মাথা ঠুকতে লাগল, আর বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ‘মা, আমাকে রক্ষা করো। মা…মাগো…।’
মেয়েটির মনের একটি অংশ বলতে চাইছিল, ‘মাথা খুঁড়ে কোনও লাভ নেই। যা হওয়ার তা হবেই।’ কিন্তু ওর মনের অন্য আর-একটা অংশ চিৎকার করে বলছিল, ‘দেবতার লীলা দেবতাই জানে। তোর প্রার্থনায় যেন তিলমাত্রও অবিশ্বাস না থাকে।’
কিছুক্ষণ পর মেয়েটি যেন ঘোর থেকে জেগে উঠল। শাল সরিয়ে বাঁ-হাত বের করে ঘড়ি দেখল: সাতটা পঁচিশ। শুভদীপ নিশ্চয়ই এতক্ষণে বাড়ি ফিরে এসেছে। বাঁ-হাতের চেটো স্পষ্টভাবে চোখের সামনে মেলে ধরল মেয়েটি। শুভদীপের ফোন নম্বর লেখা রয়েছে সেখানে: ফোর সেভেন টু ফোর জিরো ওয়ান।
চোখের জল মুছে ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নেমে এল ও। হাঁটতে শুরু করল পাঁচমাথার মোড়ের দিকে। মোড়টা পেরিয়ে ও যাবে শ্যামবাজারের টেলিগ্রাফ অফিসে। সেখান থেকে ফোন করা যায়। যদি ওদের ফোন খারাপ থাকে তা হলে দুটো ওষুধের দোকান আছে কাছাকাছি—একটু বেশি পয়সা দিলে ওরা ফোন করতে দেয়।
মেয়েটির গায়ের রং মাজা। সরল, টানা-টানা, গভীর চোখ। গড়ন লম্বা ছিপছিপে। ভুরুর কাছটা যেন জোড়া, নাকে ছোট্ট সাদা চকচকে পাথর বসানো নাকছাবি। চিবুক তীব্র, সামান্য উদ্ধত। অথচ চোখের দৃষ্টি এখন অসহায়। খানিকটা যেন ভয় পেয়েছে।
শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় পার হওয়ার সময় নেতাজীর মূর্তির প্রায় পাশ ঘেঁষে চলে গেল মেয়েটি। রাস্তায় পথচারী যানবাহন ও যেন দেখেও দেখছিল না।
শীতের বাতাসে হালকা কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছিল। একটু দূরের জিনিস ঠিকমতো ঠাহর করে দেখা যাচ্ছিল না। মেয়েটির নজর ঝাপসা হয়ে আসছিল বোধহয়। ও শালের খুঁট দিয়ে কয়েকবার চোখ মুছল।
টেলিগ্রাফ অফিসের দোতলায় উঠে একটা টেলিফোন বুথ খালি পেয়ে গেল মেয়েটি। চটপট বুথের ভেতরে ঢুকে গিয়ে অকূলপাথারে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো রিসিভারটাকে আঁকড়ে ধরল। না, ডায়াল টোন নেই। লিভারটা টেনে বেশ কয়েকবার খটখট করল ও। রিসিভার কানে চেপে শুনল। না, একটা অস্বাভাবিক গুঞ্জন কানে আসছে শুধু।
বেরিয়ে এসে পাশের বুথের ভাঙা দরজার কাছে দাঁড়াল মেয়েটি। একজন অবাঙালি ভদ্রলোক বেশ চেঁচিয়ে কথা বলছেন টেলিফোনে। মেয়েটি উসখুস করতে লাগল। পিছনের কাউন্টারের ওপাশ থেকে টেলিগ্রাফের টরে-টক্কা শুনতে পাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, মর্স কোডের সংকেত ওর মাথার ভেতরে বাজছে। এই ভদ্রলোকের টেলিফোন করা কখন শেষ হবে!
একটু পরে বুথ খালি হতেই মেয়েটি ঢুকে পড়ল বুথে। নম্বর ডায়াল করার সময় টের পেল ওর হাত কাঁপছে।
ও-প্রান্তে রিং বাজছিল। চারবারের পর টেলিফোন তুলল কেউ।
‘হ্যালো।’ বয়স্ক পুরুষ কণ্ঠস্বর। বোধহয় শুভদীপের বাবা।
‘হ্যালো, শুভদীপ আছে?’
‘আপনি কে বলছেন?’ প্রশ্নের মধ্যে অপছন্দের সুর।
শুভদীপের বাবার সঙ্গে মেয়েটির এখনও আলাপ হয়নি। শুভর কাছে শুনেছে, ভদ্রলোক বেশ কড়া আর রাশভারি। ওঁর ব্যবসার পয়সাতেই শুভদীপদের যত বাবুয়ানি।
মেয়েটি ভয় পেয়ে গেল। এক মুহূর্ত কী ভেবে কাঁপা গলায় মিথ্যে বলল, ‘আমি ওর বন্ধু জয়ন্তর দিদি। জয়ন্ত ওকে একটা খবর দিতে বলেছে। ওর লাস্ট উইকের ক্লাস নোটটা যেন কাল ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে আসে। আর…’ আর কী বলা যায় এই মুহূর্তে!
ও-প্রান্তের রাশভারি গলা শোনা গেল, ‘দাঁড়াও, বুড়োকে দিচ্ছি, ওকে যা বলার বলো—’ ‘বুড়ো’ শুভদীপের ডাকনাথ।
কয়েক সেকেন্ড সব চুপচাপ। শুধু পিছন থেকে টরে-টক্কা ভেসে আসছে। কী রকম দম বন্ধ করে ভ্যাপসা গরম লাগছে যেন।
‘হ্যালো—’
শুভদীপের গলা।
আঃ! মা কালী সত্যিই জাগ্রত।
‘শুভ…শুভ…খুব বিপদে পড়েছি…।’
গলা চিনতে পারল শুভ। সঙ্গে সঙ্গে ওর কণ্ঠস্বর কেমন যেন নির্বিকার কাঠ-কাঠ হয়ে গেল। বাবার সামনে কী করে সহজভাবে কথা বলবে ও! ও তো বলেই দিয়েছিল, ‘ফোন নাম্বার নিচ্ছ নাও, কিন্তু, জেনুইন ইমারজেন্সি না হলে ফোন কোরো না—অথচ…।
‘কেন, কী হয়েছে?’ শান্তভাবে প্রশ্নটা করল শুভ।
‘শুভ…শুভ…আজ সকাল থেকে খুব…বমি হচ্ছে। বারবার ওয়াক উঠছে।’ শেষ দিকে কেঁদে ফেলল মেয়েটি।
