পরদিন পাঁচটা বেজে পাঁচ মিনিটে তারক হালদারের মুখোমুখি যখন হাজির হলাম তখন বুঝলাম, অকারণেই আমি ভয় পেয়েছি।
হালদার আমার মুখের চেহারা লক্ষ করে হেসে বললেন, ‘কী ব্যাপার? মুখটা এরকম করে রেখেছেন কেন? ভয় নেই, কেউ আপনাকে শক দেবে না। আসুন, এটার ওপরে উঠে দাঁড়ান।’
ওজন করার একটা যন্ত্র।
‘সিগারেট ছেড়ে দেওয়ার পর আমার ওজন বোধহয় একটু বেড়ে গেছে—।’
‘সেটাই স্বাভাবিক। আমার ক্লায়েন্টেদের প্রায় সিক্সটি সেভেন পার্সেন্টের এরকম সিমটম দেখা গেছে। আসুন, উঠুন এটার ওপরে—।’
যন্ত্রের প্ল্যাটফর্মে উঠে দাঁড়ালাম। আটষট্টি কেজি।
‘আচ্ছা, নেমে আসুন।’ বলে অ্যাপ্রনের পকেট থেকে একটি ল্যামিনেটেড প্লাস্টিকের কার্ড বের করে তারক হালদার কী যেন দেখতে লাগলেন।
‘আপনার হাইট কত, মিস্টার দত্ত?’
‘পাঁচ-পাঁচ।’
‘তা হলে আপনার ওজন হওয়া উচিত তেষট্টি কেজি। কয়েকটা ওষুধ লিখে দিচ্ছি, এগুলো ঠিকমতো খাবেন। আর বডি ওয়েটের দিকে খেয়াল রাখবেন। আজ এপ্রিল মাসের তিন তারিখ। আপনি প্রতিমাসের ঠিক তিন তারিখে আমার কাছে ওজন নিতে আসবেন। যদি কখনও না আসতে পারেন তা হলে আগে ফোন করে অবশ্যই খবর দেবেন। যেন কোনওরকম ভুল না হয়।’
‘যদি আমার ওয়েট তেষট্টি কেজির বেশি হয়ে যায়?’
তারক হালদার হাসলেন, বললেন, ‘ওজন বেড়ে যাওয়াটা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। যদি আপনার ওজন তেষট্টির বেশি হয়ে যায় তা হলে আমার লোক আপনার বাড়িতে যাবে। চপার দিয়ে আপনার বউয়ের একটা কড়ে আঙুল কেটে নেবে। ঠিক আছে, তা হলে সামনের মাসের তিন তারিখে আমাদের দেখা হচ্ছে, মিস্টার দত্ত—।’
এরপর তিনমাসের মধ্যে আমার মেদ আর বয়েস, দুটোই অনেকটা করে কমে গেল। জামা-প্যান্টগুলো সব ঢোলা-ঢোলা হয়ে গেল। তা নিয়ে মৌসুমী কম ঠাট্টা করল না। তাছাড়া একদিন রাস্তায় কেনাকাটায় বেরিয়ে ও বলল, ‘তোমার পাশে এখন আমাকে বুড়ি-বুড়ি লাগে।’
আমি বললাম, ‘তোমার কথার কোনও মাথামুন্ডু নেই!’ কিন্তু ভেতরে-ভেতরে ভালো লাগল।
আজকাল পাড়ায় আর অফিসে পরিচিত সকলেই বলে, আমার বয়েস নাকি বোঝা যায় না। ওরা এর রহস্য জানতে চায়। আমি বলি, ‘সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি, তাই।’
‘আমিও অনেকবার ছেড়ে দিয়েছি, ভাই। কিন্তু এমনই বদ অভ্যেস, আবার ঘুরে এসেছে।’
একদিন রাতে তারক হালদারের ফোন পেলাম।
‘মিস্টার দত্ত, কেমন আছেন?’
‘ভালো—’
‘কোনওরকম অসুবিধে হচ্ছে না তো?’
‘না, না।’
‘আমার ক্লিনিকের জন্যে একটা ছোট্ট উপকার করতে হবে আপনাকে। কালই আমি আমার পঞ্চাশটা ভিজিটিং কার্ড আপনাকে পাঠিয়ে দেব। আজ থেকে ঠিক এক বছরের মধ্যে অন্তত চারজন ক্লায়েন্ট আমি চাই। মনে হয় না, চারজন স্মোকারকে সিগারেট ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে কনভিন্স করাতে আপনার কোনও অসুবিধে হবে। আপনার বন্ধু, মিস্টার অনুপম মুখার্জি, আপনাকে নিয়ে মোট ছ’জনকে পাঠিয়েছে। সুস্থ সমাজ তৈরির জন্য আমি প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, মিস্টার দত্ত। একাজে আপনারা সবাই যদি হেল্প না করেন, তা হলে…।’
‘চারজনকে আ-আমি পাঠাব।’ এরই নাম হুইসপারিং ক্যামপেইন!
তারক হালদার হাসলেন: ‘জানতাম আপনি রাজি হবেন। ও হ্যাঁ, আমাদের এগ্রিমেন্টের ওই পয়েন্টটা মনে আছে তো? মানে, ট্রিটমেন্টের কায়দা একদম টপ সিক্রেট?’
‘হ্যাঁ, ভুলিনি।’
‘থ্যাঙ্ক য়ু। আমরা কিন্তু নজরদারির কাজ চালিয়ে যাচ্ছি—’ তারক হালদারের গলাটা হঠাৎই কেমন ঠান্ডা শোনাল। সঙ্গে-সঙ্গে খরগোশটার কথা মনে পড়ে গেল আমার। ডক্টর হালদার ফোন রেখে দিলেন।
এর মাসদেড়েক পর একদিন বিকেলে নিউ মার্কেটে অনুপমের সঙ্গে দেখা হল আমার। ও একা নয়—সঙ্গে রোহিণীও ছিল।
অনুপমের বউকে আমি এই প্রথম দেখলাম। ফরসা, লম্বা, সুশ্রী। চেহারায় ব্যক্তিত্ব আছে। অনুপম আমার সঙ্গে ওর বউয়ের আলাপ করিয়ে দিয়ে মজা করে বউকে বলল, ‘আমার দশবছরের হাওয়া-দোস্ত, বুঝলে! বলতে গেলে, শুধু এয়ারপোর্ট আর প্লেনেই ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়। কলেজ লাইফের পর এই প্রথম কলকাতার ডাঙায় দেখা হল, কী বলিস?’ কথা শেষ করে আমার কাঁধ চাপড়ে দিল অনুপম। একটু থেমে আবার বলল, ‘রাজীব, তোকে কিন্তু দারুণ দেখাচ্ছে। ডায়েটিং করে স্লিম হয়েছিস?’
‘না রে, আমি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি। ডক্টর তারক হালদার আমার জীবনটা একেবারে বদলে দিয়েছেন।’ আমার বুকের ভিতরে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছটফট করছিল।
অনুপম আমার দিকে গভীর চোখে তাকাল। আমিও ওকে দেখলাম। এখন আমরা সত্যিকারের বন্ধু। পরস্পরের গোপন ব্যথা আমরা জানি।
ঠিক তখনই রোহিণীর বাঁহাতের কাটা কড়ে আঙুলটা আমার নজরে পড়ল।
আঁধারপ্রিয়া
‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়।
ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়।’
একটি শীতের সন্ধ্যা, ১৯৭৪ সাল
সতেরো-আঠেরো বছরে মেয়েটি রাস্তা পার হচ্ছিল। পরনে গোলাপি-কালো নকশা ছাপা শাড়ি। গায়ে একটা বাদামি রঙের শাল অগোছালোভাবে জড়ানো। এখন কোনও কিছুই গুছিয়ে করার মতো মনের অবস্থা মেয়েটির নেই।
সেটা মেয়েটির হাঁটার ধরন লক্ষ করলেও বোঝা যায়।
শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে শীত যতই জাঁকিয়ে বসুক না কেন যানবাহনের বেহিসেবি সংখ্যার তাতে কোনও হেরফের হয় না। সুতরাং এদিক-ওদিক দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল নানান গাড়ি: প্রাইভেট কার, ট্যাক্সি, বাস, ট্রাম, স্কুটার, মোটরবাইক। আর অসংখ্য মানুষ যে-যার ব্যস্ততায় ফাঁকফোকর পেয়েই একছুটে রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে। ফুটপাথের বাঁ-দিকে পায়রার খোপের মতো ছোট-ছোট লটারির টিকিটের দোকান। ডানদিকে পাঁচমিশেলি ফলের দোকানে কেনাকাটার ভিড়। তার পাশেই জাগ্রত মা-কালীর মন্দিরে আরতি হচ্ছে, ঘণ্টাও বাজাচ্ছে কেউ-কেউ। ভক্তেরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রণাম সেরে নিচ্ছে। কেউ মাথা ঠুকছে মন্দিরের দেওয়ালে। কারও মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে, তাই ভক্তি মেশানো কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে দেবীকে। আর কেউ বা মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ার আশায় কাতর প্রার্থনায় আকুল।
