আমি আচ্ছন্নের মতো এগিয়ে গেলাম জানলাটার কাছে। পেছন থেকে প্রতাপ একবার আমাকে রূঢ়ভাবে ধাক্কা দিল।
শয়তান ডাক্তারটা মউকে এখন ইলেকট্রিক শক দেবে, আর আমাকে সেটা দেখতে হবে।
‘বাস্টার্ড!’ বলতে চাইনি, কিন্তু কীভাবে যেন মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল শব্দটা।
তারক হালদার আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসলেন: ‘মিস্টার দত্ত, এ-পর্যন্ত যত গালাগাল আমি খেয়েছি, গালাগালপিছু প্রত্যেকে যদি একটা করে টাকা আমার হাতে দিত তা হলে এতদিনে আমি টাটা বিড়লা হয়ে যেতাম। তা ছাড়া, যারা সমাজের জন্যে, দেশের জন্যে, ভালো কাজ করতে চায় তাদের কপালে চিরকাল গালাগালই জোটে। আসুন, দেরি হয়ে যাচ্ছে—।’
জানলা দিয়ে মৌসুমীকে দেখতে পেলাম।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ও হতবাক হয়ে এদিক-ওদিক দেখছে। ওর ডানহাতের কবজিতে একটা সরু তার জড়ানো।
‘মউ! মউ!’ আমি বিপন্ন গলায় চেঁচিয়ে ডাকলাম ওকে।
ডক্টর হালদার আমার পিঠে হাত রাখলেন: ‘ডেকে লাভ নেই। ও-ঘর থেকে কিছু শোনা যায় না, কিছু দেখা যায় না।’ কাচের জানলাটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন, ‘এটা সাধারণ কাচ নয়, ওয়ান ওয়ে মিরার। ও-ঘর থেকে এটাকে আয়না বলে ভুল হয়। যাকগে, তাড়াতাড়ি কাজ সেরে নিই। আপনার প্রথমবারের ছোটখাটো ভুল—পনেরো সেকেন্ডের বেশি দেওয়াটা ঠিক হবে না। প্রতাপ—।’
প্রতাপ হাতের রিভলভারটা আমার শিরদাঁড়ায় চেপে ধরল। আর ডক্টর হালদার লাল বোতামটা টিপে ধরলেন।
আমার জীবনের দীর্ঘতম পনেরো সেকেন্ড শেষ হল একসময়। মাথা ঝিমঝিম করছে, পা দুটো যেন রবারের, চোখের নজর ঝাপসা।
ডক্টর হালদার আমার পিঠে মোলায়েমভাবে হাত রেখে বললেন, ‘গা গুলোচ্ছে? বমি পাচ্ছে?’
আমি কোনওরকমে মাথা নেড়ে ‘না’ বললাম।
তারক হালদার জানলার পরদা টেনে দিলেন। আমার হাত ধরে বললেন, ‘আসুন—।’
‘কোথায়?’ কথা বলতেও যেন কষ্ট হচ্ছে আমার।
‘আপনার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন আসুন।’
কী করে মৌসুমীকে মুখ দেখাব আমি? ওকে আমি ভালোবাসি! এই আমার ভালোবাসার নমুনা!
প্রতাপ আগেই কখন যেন ঘর ছেড়ে চলে গেছে। আমি আচ্ছন্নের মতো ডক্টর হালদারকে অনুসরণ করলাম।
করিডর দিয়ে কিছুটা পথ চলার পর ডক্টর হালদার একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, ‘যান, ভেতরে যান। কোনও চিন্তা নেই, উনি আপনাকে ভুল বুঝবেন না।’
আমাকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে উনি চলে গেলেন। ধবধবে সাদা দেওয়ালে ঘেরা ঘরটায় শুধু একটা লম্বা সোফা রয়েছে। মৌসুমী সোফায় বসে মুখ নিচু করে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
‘মউ!’
ও চমকে তাকাল আমার দিকে। সোফা থেকে প্রায় ছুটে এসে জাপটে ধরল আমাকে। বুকে মুখ গুঁজে ডুকরে উঠল, ‘রাজীব! রাজীব!’
আমি ওর মাথায় হাত ঝুলিয়ে দিলাম। চোখের জল মুছিয়ে দিলাম। কপালে, মাথায় চুমু খেলাম বারবার।
মৌসুমী ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে যা বলল তার সারমর্ম হল এই: দুপুর দুটো নাগাদ অচেনা তিনটে লোক হঠাৎই ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ে; ও ভেবেছিল ওরা বোধহয় ডাকাত, বা অন্য কোনও বদ মতলবে ঢুকেছে; কিন্তু লোকগুলো মৌসুমীর নাকে ভেজা তুলো চেপে ধরে; সেই অবস্থাতেই ওকে চাদরে মুড়ে তুলে নেয়; তারপর ওর আর কিছু মনে নেই; পরে জ্ঞান ফিরল দ্যাখে একটা ছোট ঘরে ও বন্দি; তারপর…তারপর…।
‘রাজীব, এই লোকগুলো কেন আমাকে এরকম টরচার করল বলো তো—?’
‘আর বলতে হবে না, মউ, থাক।’ আমি দু-হাতে আঁজলা করে মৌসুমীর মুখটা তুলে ধরলাম। ধরা গলায় বললাম, ‘তোমাকে কয়েকটা কথা বলার আছে, মউ। এই মুহূর্তে সব খুলে না-বলতে পারলে আমি কিছুতেই শান্তি পাব না। এসো, বসো এখানে—’
ওকে সব কথা বলার পর আমি মাথা হেঁট করে বসে রইলাম। বিড়বিড় করে বললাম, ‘ছি ছি! তোমার চোখে কত ছোট হয়ে গেলাম আমি…।’
মৌসুমী আমার থুতনিতে হাত দিয়ে মুখটা তুলে ধরল ওর দিকে। গাঢ় স্বরে বলল, ‘রাজু, তোমাকে আমি এখনও আগের মতোই ভালোবাসি।’
‘সত্যি!’ আমার চোখে জল এসে গেল।
‘হ্যাঁ, সত্যি। ডক্টর হালদার তোমার ভালোর জন্যই সব করছেন। সিগারেট খাওয়া তুমি একেবারে ছেড়ে দাও।’
এখন তো আর না-ছেড়ে উপায় নেই। আমি অবাক চোখে মৌসুমীকে দেখছিলাম। গালে টোল পড়া মেয়েটা হঠাৎ আমার কাছে এগিয়ে এসে টপ করে গালে একটা চুমু খেল। বলল, চলো, ‘বাড়ি চলো। তাপস অনেকক্ষণ ধরে একা আছে…।’
দু-সপ্তাহ পর একদিন রাতে টেলিফোন বেজে উঠল।
ফোন ধরতেই ডক্টর হালদারের গলা চিনতে পারলাম। একটা দলাপাকানো ভয় উঠে এল গলার কাছে। তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, ‘ডক্টর হালদার, আপনি ভুল করছেন। আমি একটিবারের জন্যেও সিগারেট ঠোঁটে ছোঁয়াইনি—বিশ্বাস করুন—।’
‘না, সে আমি জানি। একটা কাজের ব্যাপারে ফোন করছি। কাল বিকেল পাঁচটায় আমার চেম্বারে একবার আসতে পারবেন? একটু কথা আছে।’
‘সেটা কি…?’
‘না, না, সিরিয়াস কিছু নয়। আসুন, একটু আলোচনা করব। ও হ্যাঁ, তাপসের পরীক্ষার রেজাল্ট তো খুব ভালো হয়েছে! তাপসকে কনগ্র্যাচুলেশান জানাবেন। কাল ওর জন্যে একটা চকোলেটের বাক্স পাঠিয়ে দেব।’
‘আপনি জানলেন কী করে?’
‘জানতে হয়, মিস্টার দত্ত। জানাটা আমার ট্রিটমেন্টের একটা ভাইটাল পার্ট।’
তারক হালদার ফোন কেটে দিলেন।
সেই মুহূর্ত থেকেই আমি পরদিন বিকেল পাঁচটার অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
