জানলা দিয়ে চোখে রোদ এসে পড়ছিল। বিছানায় উঠে বসলাম। চোখ জ্বালা করছে। মাথা দপদপ করছে। জিভে তেতো স্বাদ।
তড়িঘড়ি চায়ের কাছে চুমুক দিতে গিয়ে জিভে ছ্যাঁকা লেগে গেল।
মৌসুমী চোখ মটকে বলল, ‘এখনও তুমি সিগারেট-অনশন চালিয়ে যাচ্ছ, না কি একটা-আধটা টেনেছ?’
আমি জড়ানো গলায় জবাব দিলাম, ‘না, খাইনি।’
কাল রাতের ওই একটা-দুটো টানকে কি আর খাওয়া বলে!
‘দেখবে, অফিসে গিয়েই তোমার প্রতিজ্ঞা পিঠটান দেবে—।’
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘কী হচ্ছে, মউ! আমি কোথায় সিগারেট ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। তাতে হেলপ না-করে তুমি উলটে…।’
‘আচ্ছা বাবা, ভুল হয়েছে, সরি—।’
আমি বাঁ-হাতটা মৌসুমীর কাঁধে রাখলাম। ওর ঘাড়ের কাছে আলতো করে আঙুল চালালাম। এ যে কী মারাত্মক প্রতিজ্ঞা সেটা তোমাকে কেমন করে বোঝাই বলো তো, মউ! এ যে আমার ভীষণ গোপন কথা।
বাথরুমের দরজায় আওয়াজ হল।
‘যাই, তাপস বোধহয় স্নান করে বেরিয়েছে—’মৌসুমী সরে গেল আমার কাছ থেকে। তাপসকে ও ভীষণ ভালোবাসে—হয়তো আমার চেয়েও বেশি। কিন্তু আমি যে ওদের দুজনকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি। ওরা যদি জানত, আমার সমস্ত প্রতিজ্ঞা শুধু ওদেরই জন্যে!
অফিস থেকে বাড়িতে ফিরেই একটা ধাক্কা খেলাম।
কলিংবেল বাজাতে দরজা খুলল শান্তির মা। কিন্তু মৌসুমী বাড়িতে থাকলে ও-ই দরজা খোলে। আমার বেল বাজানোর ঢং ওর খুব চেনা। এসময়ে ও কোথায় বেরোল?
তাপস চাটার্ড বাসে করে স্কুলে যায়-আসে। যাওয়ার সময় মৌসুমী ওকে নিয়ে যায় অরবিন্দ সেতুর মুখে, বাসে তুলে দেয়। আর ছুটির সময় তাপসকে বাস থেকে নামতে হয় ওই একই জায়গায়। সেখান থেকে ওকে নিয়ে আসে আমাদের কাজের লোক শান্তির মা। তাপসকে নিয়ে বাড়ি ফিরে ও বউদিদিমণিকে পায়নি। কলিংবেলের শব্দে কেউ সাড়া দেয়নি। তখন পাশের ফ্ল্যাট থেকে ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে শান্তির মা আমাদের ফ্ল্যাটের দরজা খোলে। এমার্জেন্সি অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্যে আমাদের ফ্ল্যাটের একটা বাড়তি চাবি পাশের ফ্ল্যাটে রাখা থাকে। শান্তির মা সেটা জানে।
শান্তির মায়ের কথা শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তাপস সরল নিষ্পাপ মুখে আমার দিকে তাকিয়ে। ওর স্কুল থেকে ফেরার সময়ে মৌসুমী কখনও ফ্ল্যাট ছেড়ে যায় না। হঠাৎ গেলেও খবর রেখে যায়। পাশের ফ্ল্যাটের রবীনবাবুকে সে ব্যাপারে জিগ্যেস করতে যাব ভাবছি, এমনসময় টেলিফোন বেজে উঠল।
কে ফোন করছে? কোনও হসপিটাল থেকে? না কি পুলিশ?
‘দাদাবাবু, একটু আগে কে একজন আপনাকে ফোন করেছিল…।’
শান্তির মায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই আমি ছুটে গিয়ে টেলিফোনের রিসিভার তুলে কানে চেপে ধরেছি।
‘হ্যালো—।’
‘রাজীব দত্ত?’ একজন পুরুষের গলা।
‘কথা বলছি।’ অকারণেই আমার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেল।
‘সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।’
এইবার গলাটা চিনতে পারলাম। ডক্টর তারক হালদার।
কিন্তু আমি কিছু বলে ওটার আগেই তিনি বললেন, ‘দত্তবাবু, আপনি সাতটা নাগাদ আমার চেম্বারে একবার আসতে পারবেন? একটু দরকার ছিল।’
‘মৌসুমী…আমার স্ত্রী কোথায়?’
‘কোথায় আবার, আমার কাছে।’ হালদার চিবিয়ে-চিবিয়ে হাসলেন।
আমার চোখের সামনে হাজার-হাজার সরষে ফুল নাচছিল আর একটা সাদা-কালো খরগোশ লাফাচ্ছিল পাগলের মতো। কাল রাতে আমি সিগারেটে দুটো টান দিয়েছি।
‘ডক্টর হালদার, প্লিজ, ওকে কিছু করবেন না…ছেড়ে দিন। কাল রাতে…আমি মাত্র দুটো টান দিয়েছি…শরীরটা কেমন খারাপ লাগছিল…প্লিজ, ওকে ছেড়ে দিন!’
আমার কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। আরও অনেক কিছু বলতে চাইছিলাম, কিন্তু—।
‘সাতটায় আমাদের দেখা হচ্ছে।’ তারক হালদার নির্লিপ্ত গলায় বললেন, তারপরেই টেলিফোনের লাইন কেটে গেল।
ঠিক সাতটার গিয়ে হাজির হলাম ‘মুক্তি’-র রিসেপশানে।
ফাঁকা ঘরে বসে রিসেপশানিস্ট মেয়েটি কম্পিউটারের বোতাম টিপছিল। আমাকে দেখে একচিলতে হেসে টেলিফোন তুলে নিল। আমার উদভ্রান্ত অবস্থাকে কোনও আমল দিল না।
‘ডক্টর হালদার, মিস্টার রাজীব দত্ত আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।’ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মেয়েটি বলল, ‘যান, ভিতরে যান।’
করিডর ধরে হেঁটে এগিয়ে চলেছি, প্রতাপ কোথা থেকে এসে হাজির হল আমার পাশে। একটু হাসল। ওর হাতে একটা রিভলভার।
ডক্টর হালদারের ঘরে ঢুকতেই উনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন আমাকে: ‘আসুন, মিস্টার দত্ত। এ কী চেহারা হয়েছে আপনার!’
আমি তারক হালদারের কাছে এগিয়ে গেলাম, বললাম, ‘ডক্টর হালদার, প্লিজ, এবারের মতো ছেড়ে দিন। আমি…আমি যা টাকা লাগে দেব…।’
‘অবুঝ হবেন না, মিস্টার দত্ত। ক্যান্সার আমার বাবাকে ছেড়ে দেয়নি। আসুন, এই জানলার কাছে আসুন। আমি কথা দিচ্ছি, মিসেস দত্তর তেমন একটা লাগবে না—অন্তত এই প্রথমবার।’
আমি রাগে কাঁপতে লাগলাম। এই সাংঘাতিক লোকটাকে তুলোধোনা করতে পারলে তবে আমার মন শান্ত হবে।
ডক্টর হালদার পেছনের দেওয়ালের ছোট জানলার কাছে গিয়ে পরদা সরিয়ে দিলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বোধহয় আমার মনের অবস্থা আঁচ করতে পারলেন। তাই ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘উত্তেজিত হয়ে লাভ নেই, দত্তবাবু। প্রতাপ আপনার উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করবে। না, গুলি করবে না। বাজে খরচ আমি অপছন্দ করি। ও রিভলভারের বাঁট দিয়ে আপনার মাথায় একটু ইয়ে করবে। আর মিসেস দত্তকে আমার ক্লিনিকের নিয়মমাফিক শক দেওয়া হবে। সুতরাং আপনার ওসব ছেলেমানুষি উত্তেজনা দেখিয়ে কোনও লাভ নেই। আসুন, এদিকে আসুন।’
