খাওয়া-দাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে পড়লাম বটে কিন্তু চোখে ঘুম এল না।
মৌসুমী তাপসের সঙ্গে পাশের ঘরে শুতে চলে গেছে। যাওয়ার আগে আমার বিছানা পেতে মশারি টাঙিয়ে কপালে হাত বুলিয়ে আদর করে গেছে। আর নিচু গলায় বলেছে, ‘ইচ্ছে করলে সিগারেট খেয়ো। আমি রাগ করব না।’ রাগ না-করলে মৌসুমীর কোনও তুলনা নেই।
আমি উত্তর না দিয়ে ওর হাতটা চেপে ধরেছি। অকুল সাগরে মৌসুমী আর তাপসই আমার খড়কুটো।
ওর হাতে আলতো করে চুমু খাওয়ার পর ও চলে গেল। দরজা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। রাতে শোওয়ার আগে একটা সিগারেট আমার বড় প্রিয় ছিল। বিছানার পাশেই তাকে রয়েছে সিগারেট আর লাইটার। অন্ধকারে ওগুলো ব্যবহার করছি সাতবছর ধরে। চোখে না দেখতে পেলেও ওদের স্থানাঙ্ক আমার ভুল হয় না। যদি হাত বাড়াই তা হলে এখনও ভুল হবে না। প্যাকেটে এখনও চারটে সিগারেট আছে আমি জানি। কিন্তু…। শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে নিলাম একবার। তাকালাম মাথার কাছের জানলার দিকে। রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। কেউ কি এখনও লক্ষ রাখছে আমার ওপরে?
তারক হালদারের কথাগুলো মনে পড়ছিল। প্রথম মাসে চব্বিশ ঘণ্টা আমার ওপরে নজর রাখা হবে। পরের দু-মাসে আমি নজরবন্দি থাকব দিনে আঠেরো ঘণ্টা করে। কিন্তু কোন আঠেরো ঘণ্টা সেটা বুঝতে পারব না। চতুর্থ মাসটাই পেশেন্টেদের পক্ষে বেশি বিপজ্জনক। তখন তাদের মনটা আঁকুপাঁকু করে একটা সিগারেটের জন্যে। সেই কারণেই তারক হালদার তখন আবার চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারির ব্যবস্থা করেন—পেশেন্টেদের স্বার্থে। তারপর আটমাস ধরে দিনে বারো ঘণ্টা করে। একটানা বারো ঘণ্টা নয়, এলোমেলো বারো ঘণ্টা। তারপর?
তারপর সারা জীবন ধরে চলবে এই নজরদারি। তারক হালদারের খেয়ালখুশি মতো।
সারাটা জীবন আমাকে ‘মুক্তি’-র বন্দি হয়ে থাকতে হবে।
ডক্টর হালদারের ভয়ঙ্কর হাসিটা মনে পড়ল।
‘সবসময়েই আপনাকে আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হবে, মিস্টার দত্ত। কেউ কি এই মুহূর্তে লুকিয়ে লক্ষ করছে আমাকে? দু-বছর পর হয়তো একদিন-বাদে-একদিন নজর রাখব আপনার ওপরে। কিংবা টানা একসপ্তাহ, বা মাসে দশদিন। আপনি কিচ্ছু টের পাবেন না। যদি কখনও লুকিয়ে সিগারেট টান দেন, তা হলে সে-রিস্ক আপনার। যদি সাধ করে সাপ নিয়ে খেলতে চান খেলবেন। কিন্তু আপনার মনে ভয় থাকবে: কেউ কি জানতে পেরেছে? তাপসকে কেউ কিডন্যাপ করেনি তো? আমার বউকে কেউ তুলে নিয়ে যায়নি তো? কী চমৎকার কায়দা বলুন তো, মিস্টার দত্ত! এই অবস্থায় যদি আপনি সিগারেটে লুকিয়ে একটি টানও দেন, তা হলে দেখবেন কী বিচ্ছিরি তার টেস্ট। মনে হবে, আপনি যেন বউ আর ছেলের রক্ত চুষে খাচ্ছেন।’
কিন্তু এখন, এই নিঝুম রাতে, কেউ কি সত্যিই নজর রেখেছে? মনে হয় না। তাছাড়া জানলা দিয়ে তো কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তারক হালদার বলেছিলেন, ‘নজরদারির কাজ যারা করবে তাদের দু-একজনকে হয়তো আপনি চিনে ফেলবেন, কিন্তু সবাইকে চিনতে পারবেন না…।’
নিকুচি করেছে তারক হালদারের! উচ্ছন্নে যাক ‘মুক্তি’ আর ওই সিড়িঙ্গে বুড়ো মহেন্দ্রনাথ হালদার!
আমার অবাধ্য হাত অন্ধকারে পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট লক্ষ্যে। অন্ধকারে আগুন জ্বলে উঠল। উপোসী ঠোঁট যেন একযুগ পর সিগারেটের স্বাদ পেল। আঃ—!
কীসের একটা শব্দ হল না? কোনদিক থেকে এল শব্দটা? বুকের ভেতরে আচমকা একটা ঢিপঢিপ শব্দ শুরু হয়ে গেল। সিগারেট ধরা হাতটা কাঁপতে লাগল অবাধ্য হয়ে। সিগারেটের ধোঁয়া ফুসফুসের ভিতরে জট পাকিয়ে কাশি পেল। দম আটকে যেতে চাইল কাশির দমকে। তাড়াতাড়ি সিগারেটটা নিভিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলাম জানলা দিয়ে। আবছা অন্ধকারে হাত নেড়ে ধোঁয়ার রেখা সাফ করে দিতে চাইলাম। হে ভগবান, কেউ যেন দেখতে না-পায় আমার এই অবাধ্য আচরণ! মৌসুমী…তাপস…সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।
শত চেষ্টাতেও ঘুম আসতে চাইল না চোখে। হাত দিয়ে চোখ ঢেকে শুয়ে রইলাম অন্ধকারে। শুনতে লাগলাম আমার ভয়ার্ত হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনি।
সকালে চায়ের কাপ, খবরের কাগজ, শীতের বারান্দা—অথচ সিগারেট নেই! প্রাত্যাহিক কাজে টয়লেটে বন্দি, অথচ সিগারেট নেই! অফিসের ইয়ার এন্ডিং-এর বাড়তি কাজ বাড়িতে বয়ে নিয়ে এসে রাত জেগে ফাইল ওলটানো, অথচ সিগারেট নেই! রাতের খাওয়া সেরে খোলা বারান্দায় ‘ওয়াক এ মাইল’ অথচ সিগারেট নেই!
শেষ পর্যন্ত আমি বাঁচব তো!
কী করে যে এসবের মধ্যে জড়িয়ে পড়লাম! স্রেফ অনুপমের জন্যে! ও তো স-ব জানত! তবু কেন আমাকে এই ভয়ঙ্কর ফাঁদে ফাঁসাল? ওকে একবার হাতের কাছে পাই!
আবার কানে এল শব্দটা। দরজার কাছ থেকে কি শব্দটা ভেসে এল?
উঠে দরজার কাছে গিয়ে শুনব ভালো করে?
বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। অন্ধকারে পা টিপে-টিপে গেলাম দরজার কাছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দরজা খোলার সাহস পেলাম না।
পায়ে-পায়ে আবার বিছানায় ফিরে এলাম। এই অসহায় মুহূর্তে আমার মন ভীষণভাবে মৌসুমীকে পাশে চাইছিল। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে সময় কাটতে লাগল আমার।
ভোরবেলার দিকে বোধহয় সামান্য তন্দ্রা এসে থাকবে, কারণ মৌসুমীর ডাকে ঘুম ভাঙল। চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে ও বলল, ‘এত বেলা পর্যন্ত ঘুমোচ্ছ, অফিসে যে দেরি হয়ে যাবে।’
