জিভ দিয়ে চুকচুক শব্দ করে ডক্টর হালদার বললেন, ‘বাচ্চাটার কী কপাল দেখুন! বাপি কথা শুনছে না দেখে সে মার খাচ্ছে—।’
‘আপনি মানুষ না জানোয়ার!’ রাগে আমার মাথা দপদপ করছিল। বুকের ভিতরেও কেমন এক ধড়ফড়ানি শুরু হয়ে গেছে।
তারক হালদার মোলায়েম হেসে বললেন, ‘তবে ভয়ের কিছু নেই, মিস্টার দত্ত। আমার কাছে যত ক্লায়েন্ট আসে তাদের ফর্টি পার্সেন্টের ক্ষেত্রে কোনও স্টেপ আমাকে নিতে হয় না। আর তিন-তিনবার অবাধ্য হয় এরকম ক্লায়েন্টের সংখ্যা মাত্র টেন পার্সেন্ট। এতে আপনার ভরসা পাওয়া উচিত।’
ভরসা দূরের কথা, একটা ঠান্ডা ভয় আমাকে পাকে-পাকে জড়িয়ে ধরছিল।
‘যদি পাঁচবারের বার আপনি একই ভুল করেন, তা হলে…।’
‘কী বলতে চান আপনি?’
হালদার নিষ্পাপ হাসলেন: ‘আপনাকে আর মিসেস দত্তকে শক দেওয়া হবে। তাপসকে আবার পালিশ দেওয়া হবে, আর মিসেস দত্তকে একটু-আধটু রগড়ে দেওয়া হবে—।’
আমি ধৈর্য হারিয়ে ক্ষিপ্তের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লাম ডক্টর হালদারের ওপরে। ওঁর জামাটা খামচে ধরে অশ্রাব্য গালিগালাজ দিতে লাগলাম। কিন্তু ডক্টর হালদার চোখের পলকে একটু সরে গিয়ে হাঁটু চালিয়ে দিলেন আমার তলপেটে। বাঁহাতে আমার চুলের মুঠি ধরে টান মেরে মাথাটা হেলিয়ে দিলেন একপাশে। তারপর ডানহাতের শক্ত আঙুলে আমার টুটি টিপে ধরে সজোরে এক ধাক্কা মারলেন। আমি ছিটকে পড়ে গেলাম মেঝেতে। আহত জন্তুর মতো হাঁফাতে লাগলাম।
‘শান্ত হয়ে বসুন, মিস্টার দত্ত। আপনাকে তো বলেছিলাম, আমরা চণ্ডীপাঠ দিয়ে শুরু করি…আর জুতো সেলাই দিয়ে শেষ করি।’
হাত ধরে আমাকে তুলে চেয়ারে বসিয়ে দিলেন তারক হালদার। তাঁর ভাবখানা এমন, যেন কিছুই হয়নি।
‘আসুন, এবার ভদ্রলোকের মতো কথাবার্তাগুলো শেষ করে নেওয়া যাক।’
আমি বড়-বড় শ্বাস নিতে-নিতে ভাবছিলাম, এই ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন কখন শেষ হবে।
‘মুক্তি’-র চিকিৎসা পদ্ধতিতে শাস্তির ধাপ রয়েছে দশটি। ছ’নম্বর, সাত নম্বর আর আট নম্বর ধাপ হল ইলেকট্রিক শক আর পালিশ। তবে শকের ভোল্টেজের মাত্রা যেমন বাড়বে তেমনই বাড়বে পালিশের তেজ। সেইসঙ্গে মিসেস দত্তকে শ্লীলতাহানি থেকে শুরু করে ধর্ষণের ভয় পর্যন্ত দেখানো হবে। ন’নম্বর ধাপ হল তাপসের যে-কোনও একটা হাত ভেঙে দেওয়া।
‘আর দশ নম্বর?’ আমার গলার ভিতরে ধুনি জ্বলছে। টের পাচ্ছি, ঘাম গড়িয়ে পড়ছে কপাল বেয়ে। শীততাপনিয়ন্ত্রণ গোল্লায় গেছে।
তারক হালদার হতাশভাবে মাথা নেড়ে বসে পড়লেন নিজের চেয়ারে।
‘তখন আমরা হাল ছেড়ে দিই, মিস্টার দত্ত। মাত্র টু পার্সেন্ট পেশেন্টের ক্ষেত্রে আমার ট্রিটমেন্ট ফেইল করে। আপনি তখন সেই টু পার্সেন্টের দলে পড়বেন—।’
‘সত্যি আপনি হাল ছেড়ে দেন?’
‘বলতে গেলে একরকম তাই।’ কথা বলতে-বলতে ডক্টর হালদার টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা সাইলেন্সার লাগানো কোল্ট অটোমেটিক পিস্তল বের করে টেবিলে রাখলেন: ‘তবে সেই অবাধ্য দু-পার্সেন্ট ক্লায়েন্ট জীবনে আর কখনও সিগারেট খায় না। আমার আগমার্কা গ্যারান্টি—’
রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে টিভিতে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’ দেখছিলাম। মৌসুমী থালায় ভাত-তরকারি সাজিয়ে দিচ্ছিল আর মাঝে-মাঝে টিভির দিকে তাকাচ্ছিল। তাপস আগেই খেয়েদেয়ে পাশের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমি অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছিলাম, আর অন্যমনস্ক হয়ে বারবার দাঁত দিয়ে নখ কাটছিলাম।
খাওয়া শুরু করেই মৌসুমী জিগ্যেস করল, ‘তোমার কী হয়েছে বলো তো! সেই তখন থেকে কেমন করছ!’
আমি খেতে-খেতেই গম্ভীরভাবে বললাম, ‘না, কিছু না। মানে…আমি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।’
এরকম ঘোষণা মৌসুমী আগে অনেক শুনেছে। তাই খাওয়া থামিয়ে ও হাসল। হাসলে ওর ডান গালে টোল পড়ে। দারুণ দেখায়। ওকে প্রায়ই বলি, ‘তোমার ওই টোলে পড়ে আমার আইবুড়ো জীবনটা একেবারে শেষ হয়ে গেল।’ এখন বলতে ইচ্ছে করল না।
ওর চোখে তাকিয়ে সিরিয়াসভাবে বললাম, ‘সত্যি ছেড়ে দিয়েছি।’
ও হেসে বলল, ‘কখন ছেড়েছ? পাঁচমিনিট আগে?’ আবার খেতে শুরু করল।
‘না, বিকেল তিনটে থেকে।’
‘তখন থেকে একটাও সিগারেট খাওনি!’ মৌসুমীর খাওয়া একেবারে থেমে গেছে।
‘না।’ আমি কখন আবার যেন দাঁত দিয়ে নখ কাটতে শুরু করেছি।
‘এরকম একটা দারুণ খবর—কিছুতেই বিশ্বাস হতে চাইছে না। কিন্তু হঠাৎ ছাড়তে গেলে কেন?’
‘তোমার জন্যে…আর, তাপসের জন্যে…।’
মৌসুমী এবার চোখ বড় করে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর একটু দূরে একটা খাটো টেবিলে রাখা অ্যাশট্রের দিকে একবার দেখে নিয়ে বলল, ‘হঠাৎ এই সুবুদ্ধি তোমাকে কে দিয়েছে জানি না, তবে এই প্রতিজ্ঞা টিকলে হয়।’
এই প্রতিজ্ঞা টিকবে, মৌসুমী। না টিকলে তোমাকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে-দিয়ে ওরা নীল করে দেবে। তোমার গালের ওই টোল সমান করে দেবে ক্ষুর দিয়ে। তাপসকে ওরা চুরমার করে দেবে। আমাদের জীবন একেবারে বদলে দেবে।
মুখে বললাম, ‘এবার আমাকে পারতেই হবে।’
মৌসুমী খেতে শুরু করল আবার: ‘পারলে তো ভালোই। পয়সা বাঁচবে। তা ছাড়া তোমার সিগারেটের ওই উৎকট ধোঁয়া আমার একটুও ভালো লাগে না।’
ডক্টর হালদারের ভাবলেশহীন মুখটা ভেসে উঠল আমার চোখের সামনে। তলপেটটা এখনও ব্যথা করছে। আতঙ্ক জমাট বেঁধেছে শরীরের ভেতরে কোথাও। দরকার পড়লে ওই মানুষটা যে নির্মম হতে পারে তার প্রমাণ পেয়েছি আমি। আমার সঙ্গে বন্দি খরগোশটার কোনও তফাত নেই।
