আমার চিৎকারে এতটুকুও বিচলিত না-হয়ে তারক হালদার বললেন, ‘না, মরবে না। খুব অল্প ভোল্টেজের ইলেকট্রিক শক দিয়েছি—।’
লক্ষ করলাম, একটা সরু তার কোথা থেকে যেন এসে খরগোশটার গলার ফিতের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
‘দেখুন খরগোশটা এবার কী করে।’ বোতাম থেকে হাত সরিয়ে তিনি বললেন।
খরগোশটা প্লেট থেকে প্রায় ছ-সাত ফুট দূরে সরে গেছে। গুটিসুটি মেরে বসে থরথর করে কাঁপছে। চোখে দিশেহারা ভয়।
‘খাওয়ার সময় যদি খরগোশটাকে বারবার এরকম শক দেওয়া হয় তা হলে ও ধরে নেবে, খেতে গেলেই ব্যথা পেতে হবে। সুতরাং, ও খাওয়া ছেড়ে দেবে। শক দিতে-দিতে এরকম একটা অবস্থা আসবে, মিস্টার দত্ত, যখন সামনে খাবার থাকা সত্ত্বেও খরগোশটা ভয়ে খাবার ছুঁয়ে দেখবে না। স্রেফ উপোস করে মরে যাবে। এটাকে বলে ”অ্যাভারশন ট্রেনিং”। আমি এর বাংলা নাম দিয়েছি ”বিতৃষ্ণা-থেরাপি”।’
কথা শেষ করে হো-হো করে হেসে উঠলেন ডক্টর হালদার। ওঁর চোখ অদ্ভুতভাবে চকচক করতে লাগল। আর আমি সঙ্গে-সঙ্গে বুঝতে পারলাম, আমার সিগারেটের নেশা ছাড়াতে ওঁর ট্রিটমেন্ট ঠিক কোন পথ ধরে এগোবে। সুতরাং আর একটি কথাও না-বলে আমি সোজা এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে।
‘মিস্টার দত্ত, প্লিজ, আমার কথাটা আগে শুনুন—।’
আমি দরজার হাতল ধরে টান মারলাম।
দরজা বন্ধ!
‘ডক্টর হালদার, যদি এক্ষুনি দরজা না খুলে দেন তা হলে দশমিনিটের মধ্যে পুলিশ এখানে চলে আসবে।’
বরফের মতো ঠান্ডা গলায় তারক হালদার বললেন, ‘বসুন, মিস্টার দত্ত।’
তারক হালদারের সবকিছুই যেন এখন পালটে গেছে। ওঁর চোখে এখন মহেন্দ্রনাথ হালদারের শোণিত দৃষ্টি। চোয়ালের রেখা শক্ত। জিভ বুলিয়ে নিলেন ঠোঁটে। টেবিলে ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়ায় কাঁধের পেশি ফুলে উঠেছে। ঠোঁটের একটা কোণ সামান্য বেঁকিয়ে এক অদ্ভুত বেপরোয়া হাসি ফুটিয়ে তুললেন। কপালের একটা শিরা কাঁপছে। সব মিলিয়ে শিকারি যেন শিকারের দৌড় দেখছে।
মানুষটাকে এই প্রথম সাইকোপ্যাথ বলে মনে হল। এই মুহূর্তে একটা সিগারেটের বিনিময়ে আমি একটা সাম্রাজ্য দিয়ে দিতে পারি।
‘আমার সহজ ট্রিটমেন্টের কায়দাটা আপনাকে একটু বুঝিয়ে বলি।’
‘ঢের হয়েছে, ডক্টর হালদার। আপনার ট্রিটমেন্টে আমার আর কোনও আগ্রহ নেই। এই সোজা ব্যাপারটা আপনার মাথায় কেন যে ঢুকছে না বুঝতে পারছি না!’
‘না, ব্যাপারটা বরং উলটো। আপনি কেন বুঝতে পারছেন না, মিস্টার দত্ত, আপনার আর ফেরার পথ নেই। আমি যখন বলেছি আপনার ট্রিটমেন্ট শুরু হয়ে গেছে তখন সত্যি-সত্যিই শুরু হয়ে গেছে। বসুন, আপনাকে একটু বুঝিয়ে বলি…।’
‘সে আপনি যতই বোঝান, এখান থেকে বেরিয়েই আমি পাঁচ প্যাকেট সিগারেট কিনব। তারপর সেগুলো টানতে-টানতে থানায় পৌঁছে যাব।’ টের পাচ্ছিলাম, নেহাত অকারণেই আমার বুকের ভিতরে হাতুড়ির শব্দ হচ্ছে।
‘আপনার যা মরজি। তবে আমার ধারণা, পুরো ব্যাপারটা শোনার পর আপনি বোধহয় মত পাল্টাবেন।’ তারক হালদার একইভাবে টেবিলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নির্লিপ্তভাবে কথাগুলো বললেন।
আমি বিরক্তভাবে চেয়ারের কাছে এলাম। অযথা শব্দ করে চেয়ারটা হ্যাঁচকা মেরে টেনে নিয়ে বসে পড়লাম: ‘বলুন, শুনি—।’
‘ট্রিটমেন্টের প্রথম মাসটায় আমার লোকেরা আপনাকে চব্বিশ ঘণ্টা নজরে রাখবে। চব্বিশ ঘণ্টায় যদি আপনাকে ওরা সিগারেট খেতে দ্যাখে তাহলে সঙ্গে-সঙ্গে আমাকে ফোন করে জানাবে।’
‘আর আপনি আমাকে এখানে ধরে নিয়ে এসে ওই খরগোশের খেলা খেলাবেন?’ আমার কথায় খানিকটা ব্যঙ্গ আর তাচ্ছিল্যের ছোঁয়া ছিল, কিন্তু মনের গভীরে একটা আতঙ্ক জন্ম নিচ্ছিল ধীরে-ধীরে। আমি বোধহয় কোনও দুঃস্বপ্ন দেখছি।
‘না, না। আপনি ভুল বুঝেছেন, মিস্টার দত্ত।’ তারক হালদার সাপের মতো হাসলেন: ‘এই ইলেকট্রিক শক আপনাকে দেওয়া হবে না—দেওয়া হবে আপনার স্ত্রীকে। আর আপনি জানলা দিয়ে দেখবেন। আপনি তো জানেন, সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।’
আমি স্তম্ভিত হয়ে ডক্টর হালদারকে দেখছিলাম। আপনার স্ত্রীকে আপনি ভালোবাসেন? আপনার ছেলে তাপসকে আপনি ভালোবাসেন? এসব অদ্ভুত প্রশ্নের কারণ বোধহয় এখন বোঝা যাচ্ছে।
‘মিস্টার দত্ত, সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর—এই বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ আপনি বহুবার দেখেছেন, কিন্তু আমল দেননি। এর কারণ কী জানেন? কারণ, এই ওয়ার্নিং-এর আসল অর্থটা আপনি বোঝেননি।’
তারক হালদার আক্ষেপে মাথা নাড়লেন, হাতে হাত ঘষলেন।
‘আপনার আর কী দোষ! এই ওয়ার্নিং-এর আসল অর্থটা বেশিরভাগ লোকই বোঝে না। আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলি। আপনি সিগারেট খেলে শুধু আপনার নয়, আপনার ফ্যামিলিরও স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে। আপনার স্ত্রীর স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে, আপনার ছেলের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে, আর আপনার স্বাস্থ্যের ক্ষতি তো হবেই। হাইলি ইনজুরিয়াস।’
ডক্টর হালদার পায়ে-পায়ে আমার কাছে এগিয়ে এলেন। তাঁর সহজ ট্রিটমেন্টের কায়দাটা জলের মতো বুঝিয়ে দিলেন আমাকে।
আমার প্রথম ভুলের জন্যে মৌসুমীকে তুলে নিয়ে এসে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হবে। দ্বিতীয়বার অবাধ্য হলে আমার কপালে জুটবে ওই শাস্তি। তৃতীয়বার আমাদের দুজনকেই শক দেওয়া হবে। আর চতুর্থবার যদি সিগারেট ধরানোর ভুল করি তা হলে বাধ্য হয়ে ডক্টর হালদার তাপসের স্কুলে কাউকে পাঠিয়ে দেবেন। সুযোগ বুঝে ছেলেটাকে ধরে একটু ‘পালিশ’ দেওয়া হবে।
