কিউ-মোবাইলের চারটে দরজা ডানার মতো খুলে গেল। জিশান দেখল, গাড়িতে কেউ নেই। তা হলে গাড়িটা চালাবে কে?
চোখে এই প্রশ্ন নিয়ে পান্ডার দিকে তাকাল জিশান।
পান্ডা হাসল। বলল, ‘আমি চালাব। কোনও ভয় নেই। আমার এই গাড়ি ড্রাইভিং-এর লাইসেন্স আছে। অনেক গার্ডকেই কিউ-মোবাইল ড্রাইভিং-এর ট্রেনিং দেওয়া হয়। কেউ সে-ট্রেনিং নেয়, কেউ নেয় না।’
পান্ডা পাইলটের সিটে বসে পড়ল। ওর বাঁ-পাশে জিশান। আর তার পর মূর্তি। শকারগুলো খুলে ওরা গাড়ির পিছনের সিটে রেখে দিল।
রিমোট টিপতেই গাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
পান্ডা গাড়ি স্টার্ট দিল। সঙ্গে-সঙ্গে অটোমেটিক এসি চালু হয়ে গেল।
দক্ষ হাতে গাড়িটাকে চওড়া রাস্তায় নিয়ে এল পান্ডা। তারপর মসৃণ পথ ধরে নি:শব্দে গাড়ি ছোটাল।
একটু পরে পান্ডা আপনমনে বলতে লাগল, ‘জানো ভাই, জিশান, ছোটবেলা থেকেই আমার গাড়ি চালানোর খুব শখ। আমার বাপের গাড়ি রং করার দোকান ছিল। তো ওইসব পুডিং ঘষা রং চটা গাড়ি—লুকিয়ে ওগুলোর চাবি নিয়ে চালাতাম। টের পেলেই বাপ খ্যাঁচখ্যাঁচ করত। বলত, খদ্দেরদের গাড়ি। আমি পাত্তা দিতাম না। গাড়ি আমাকে টানত।’
মূর্তি বলল, ‘শুরুর দিকে ও সিন্ডিকেটের গাড়ি চালাত। একটা অ্যাক্সিডেন্ট করার পর থেকে সিকিওরিটি গার্ড হয়েছে।’
‘যাকগে, ওসব বাদ দাও—’ জিশানকে কনুইয়ের খোঁচা দিল পান্ডা : ‘নিউ সিটির কী-কী দেখবে বলো…।’
জিশান পান্ডার দিকে তাকাল। অন্ধকারে আবছা পান্ডার মুখ। তার ওপরে রাস্তার মেটাল ল্যাম্প থেকে ছিটকে আসা আলোর হাইলাইট।
কী বলবে জিশান? বাড়ির ঠিকানা, আর বাবার চোখের জল—নিউ সিটির এটুকুই তো মনে আছে!
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ও বলল, ‘এন—টুয়েলভ কমা থার্টি সিক্স। এই ঠিকানায় আমি থাকতাম। আজ থেকে প্রায় দেড়যুগ আগে।’
‘তাই?’ অবাক চোখে জিশানের দিকে তাকাল মূর্তি। পান্ডাও।
নিউ সিটিকে অনেকগুলো ছোট-ছোট জোনে ভাগ করা আছে। জোনগুলোর নাম এ, বি, সি, ডি ইত্যাদি। এইরকম প্রতিটি জোনের এক-একটি অঞ্চলের নির্দিষ্ট স্থানাঙ্ক বা কো-অর্ডিনেট আছে। সেই সংখ্যা দিয়েই কোনও জোনের একটি বিশেষ এলাকা চিহ্নিত করা হয়। জিশানের শুধু এটুকুই মনে আছে : এন—টুয়েলভ কমা থার্টি সিক্স।
জিশান সংক্ষেপে ওর ছোটবেলার কথা বলতে লাগল।
গেম পার্টিসিপ্যান্টস ক্যাম্পাস পেরিয়ে কিউ-মোবাইল অনেকক্ষণ আগেই বড় রাস্তায় এসে পড়েছিল। রাস্তার দু-ধারের আলোয় ছবির মতো পথটা দেখতে পাচ্ছিল জিশান। কালচে রুপোলি রং। ধাতুর পাতের মতো চকচকে। তারই ওপরে ছোট-ছোট বুটি। ঠিক যেন ব্যাঙের চামড়া। গাড়ির চাকা এই রাস্তায় সহজে পিছলে যাবে না। বাড়তি ঘর্ষণ গুণাঙ্ক সেই নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে।
রাস্তায় বড়-বড় ইলেকট্রনিক বিলবোর্ড চোখে পড়ছিল। সেগুলোর বেশিরভাগই প্রসাধন আর নেশার হরেকরকম উপকরণের বিজ্ঞাপন। জিশান অবাক হয়ে দেখছিল, বিজ্ঞাপনের চলমান ছবিগুলো ঠিক যেন আসলের মতো—ত্রিমাত্রিক।
মূর্তিকে সে-কথা জিগ্যেস করতেই ও বলল, ‘এখানে নিয়মিত ফরেন টেকনোলজি কেনা হয়। কথায়-কথায় সবাই জাপান আর আমেরিকা দেখায়। ওই বিজ্ঞাপনের ছবিগুলো সব হলোগ্রাম ইমেজ…তাই ওরকম আসলের মতো দেখাচ্ছে।’
একটু পরেই রঙিন হলোগ্রাম ইমেজ দেখে-দেখে জিশানের চোখ সয়ে গেল।
কিন্তু শুধু বিলবোর্ড নয়, নানান অফিস বিল্ডিং-এর চেহারা আর আলোকসজ্জা দেখেও তাক লেগে যায়। মনে হয় যেন শহরটা সৌন্দর্যে স্বর্গের খুব কাছাকাছি। যদিও স্বর্গের সৌন্দর্য কেমন জিশান জানে না।
ওল্ড সিটির কথা মনে পড়ে গেল জিশানের। কষ্ট হল। মনে হল, একটা লেসার বিলবোর্ডের খরচ দিয়ে ওর শহরের দশটা গরিব পরিবারের একমাস খাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এরকম একটা সুন্দর বিল্ডিং-এর বদলে ওল্ড সিটিতে অনায়াসে গড়ে তোলা যায় দুটো ভদ্রস্থ হাসপাতাল, কিংবা হাফডজন স্কুল।
কিউ-মোবাইল ছুটছিল। আর জিশান মুগ্ধ হয়ে দেখছিল। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এতটাই আকর্ষণীয় হতে পারে! আধুনিক এই প্রযুক্তির পাশাপাশি কী সাংঘাতিক ওইসব আদিম হিংস্র খেলা! বাইরের এই রঙিন সুন্দরের আড়ালে কী অদ্ভুতভাবেই না ঘাপটি মেরে বসে আছে ভয়ংকর কুৎসিত!
জিশানের বমি পেয়ে গেল। আচমকা ‘ওয়াক’ তুলল দুবার।
মূর্তি জিগ্যেস করল, ‘কী হল?’
জিশান মুখে হাত চাপা দিয়ে কাশল, বলল, ‘কিছু না।’
পান্ডা ওর দিকে একবার তাকাল শুধু—কিছু বলল না।
দশ কি পনেরো সেকেন্ডের মধ্যে পান্ডা গাড়িটাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে এল যাকে স্বপ্নের জগৎ ছাড়া আর কিছু বলে ভাবা যায় না। একটা বিশাল এলাকা জুড়ে নানান উচ্চতার বিমূর্ত ছাঁদের বাড়ি। তার সর্বত্র উৎসবের আলোকমালা। হাজার রঙের লেসার-ছবি বাড়িগুলোর গায়ে অদ্ভুত ছন্দে চলে-ফিরে বেড়াচ্ছে।
পান্ডা পার্কিংজোনে গাড়িটা পার্ক করতে-করতে বলল, ‘এই কমপ্লেক্সটার নাম ”ই-ল্যান্ড”—এনটারটেইনমেন্ট ল্যান্ড। ফূর্তি-জোনও বলতে পারো। চার কিলোমিটার বাই চার কিলোমিটার এলাকা। টুয়েন্টি ফোর সেভেন খোলা…।’
রিমোট দিয়ে গাড়ির দরজা খুলল পান্ডা। নামতে-নামতে মূর্তিকে বলল, ‘এই, শকারগুলো নিয়ে নে। কোমরে ঝোলাতে হবে।’
জিশান আর মূর্তি অন্য দরজা দিয়ে নামল। পিছনের সিট থেকে শকারগুলো তুলে নিল মূর্তি। জিশানকে একটা দিল, আর বাকি দুটো হাতে করে পান্ডার কাছে গেল।
