পান্ডা কিউ-মোবাইলের দরজা বন্ধ করল। তারপর রিমোটের অন্য একটা বোতাম টিপে গাড়িটা ‘ফার্মলক’ করে দিল।
জিশান অবাক হয়ে সুবিশাল ইলেকট্রনিক হাঙ্গামার দিকে তাকিয়ে ছিল। যেদিকে দু-চোখ যায় সেদিকেই এনটারটেইনমেন্ট। নন-স্টপ বিনোদন।
চঞ্চল আলোর রঙিন আভা জিশান, পান্ডা আর মূর্তির মুখে খেলা করছিল।
ওরা তিনজনে এগোল ‘ই-ল্যান্ড’-এর দিকে। দেখে মনে হচ্ছিল, পিস ফোর্সের তিনজন গার্ড ব্যস্তভাবে ডিউটিতে চলেছে।
স্বপ্নের জগতে ঢুকে পড়ল জিশান। ওর মনে হল, ও অলৌকিক কোনও শহরে এসে পড়েছে। যেখানে অটোমেশান, ইলেকট্রনিক্স আর অপটিকস তাদের ‘ছলাকলা’র মরণপণ প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
পান্ডা আর মূর্তির সঙ্গে হাঁটছিল জিশান। সব জায়গায় স্মার্ট কার্ড সোয়াইপ করার ব্যাপারটা ওরা দুজন সামলাচ্ছিল। আর জিশান ওপরদিকে তাকিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আশ্চর্য জগতের অভিঘাতটা শুষে নেওয়ার চেষ্টা করছিল।
পান্ডা ওকে বলছিল, ‘…এখানে দোকানপাট আছে, ব্যাঙ্ক আছে, ক্লাব আছে, গেমস পারলার আছে, নকল সমুদ্র আছে, সি-বিচ আছে…কী নেই!’
কথা বলতে-বলতে একটা মল-বিল্ডিং-এর গ্রাউন্ড ফ্লোরে ঢুকে পড়ল ওরা।
চারিদিকে শুধু কাচ আর কাচ, আলো আর আলো। আলো যেমন নানান রঙের, কাচের দেওয়ালগুলোও তাই। এ ছাড়া রয়েছে স্বচ্ছ ফাইবারের সিঁড়ি আর মেঝে। সিঁড়ি চলছে, কোথাও-কোথাও মেঝেও।
তাজ্জব জিশানকে নিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরিয়ে দেখাতে লাগল পান্ডা আর মূর্তি। তারপর একটা গেমস পারলারের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। পারলারের কাচের দেওয়ালের দিকে আঙুল দেখিয়ে মূর্তি বলল ‘ওই দ্যাখো—।’
জিশান তাকাল। এবং নিজেকে দেখতে পেল।
কাচের দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছে, পারলারের ভেতরে জায়ান্ট টিভি চলছে এবং সেখানে জিশানকে দেখা যাচ্ছে।
পান্ডা জিশানের হাত ধরে টানল। ওরা তিনজন পারলারে ঢুকে পড়ল।
জিশান অবাক হয়ে দেখল, টিভিতে কিলগেমের প্রাোমো চলছে। তাতে জিশানের নানারকম ক্লিপিংস দেখানো হচ্ছে। জিশান ঘরে পায়চারি করছে, খেলার মাঠে বল খেলছে, অ্যানালগ জিমে ব্যায়াম করছে, কানে হেডফোন লাগিয়ে শুটিং প্র্যাকটিস করছে, কমব্যাট পার্কে কোমোডো ড্রাগনের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে, টিভি ক্যামেরাম্যানকে দু-হাতে মাথার ওপরে তুলে নিয়েছে, স্নেক লেকে প্রাণপণে দৌড়চ্ছে, জাব্বার সঙ্গে মরিয়া লড়াই চালাচ্ছে…।
এবং তারপর কিল গেমের বিজ্ঞাপন। খুব শিগগিরই কিল গেমের দিনক্ষণ জানানো হবে। সেই খেলার সিধা প্রসারণের সময় যাঁরা বিজ্ঞাপন দিতে চান তাঁরা অন-লাইনে বুকিং করুন। তারপরই পরদায় ফুটে উঠছে কয়েকটি ওয়েবসাইট আর সাইবার লিংকের অ্যাড্রেস।
পারলারে ভিড় ছিল। নানান বিচিত্র গেম খেলায় ব্যস্ত নানাবয়েসি ছেলে-মেয়ে। তা ছাড়া আরও অনেকে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছিল। জিশান লক্ষ করল, ওকে নিয়ে কিল গেমের প্রাোমো চলছে দেখে টিভির সামনে ভিড় বাড়ছিল। এবং টিভিতে ওর মুখ দেখানোমাত্রই হইচইয়ের জোয়ার উঠছিল।
আশপাশের মানুষজনের কথা শুনতে পাচ্ছিল জিশান।
কেউ ওর বডির প্রশংসা করছিল। কেউ বলছিল, ‘লোকটাকে কী হ্যান্ডসাম দেখতে!’ কেউ বলছিল, জাব্বার মতো একজোড়া পালোয়ানের সঙ্গে ও অনায়াসে মহড়া নিতে পারে। আবার আর-একজনের মন্তব্য : ‘আমার মনে হচ্ছে ছেলেটা কিল গেমে জিতে যাবে…।’
পান্ডা জিশানকে খোঁচা দিল। জিশান ওর দিকে ফিরে তাকাতেই পান্ডা চোখ ঠারল। যার অর্থ হল : ‘দেখছ, সবাই তোমার কথা বলছে!’
যতক্ষণ কিল গেমের প্রাোমো চলল ততক্ষণ টিভির সামনে ভিড় লেগে রইল। দর্শকদের উচ্ছ্বাস জিশানকে অবাক করে দিল। গার্ডরা ওকে যে পছন্দ করে তার পিছনে হয়তো শ্রীধর পাট্টাকে অপছন্দের কারণ রয়েছে। কিন্তু পারলারে বিনোদনের সন্ধানে আসা জনগণ? ওরা কি চাইছে জিশানের ভালো হোক, জিশান জিতুক? নাকি আসলে চাইছে কিল গেম জমে উঠুক?
পান্ডা আর মূর্তির হাত ধরে টান মারল জিশান। তারপর ওরা তিনজনে গেমস পারলার থেকে বেরিয়ে এল।
মূর্তি বলল, ‘জিশান, তোমাকে নিয়ে লোক কিন্তু হেভি এক্সাইটেড। তোমার বিজ্ঞাপনগুলোও পাবলিককে হেভি টানছে…।’
‘বিজ্ঞাপন? তার মানে?’ জিশান অবাক হয়ে মূর্তিকে দেখল।
তখন পান্ডা বলল, ‘প্রায় একমাস ধরে সিন্ডিকেট এই কাজটা শুরু করেছে। তোমার ডিফারেন্ট টাইপের ক্লিপিংস দেখিয়ে তার ফাঁকে-ফাঁকে নানান প্রাোডাক্টের অ্যাড চলছে। এরপর…কিল গেমের আগে…তোমাকে নিয়ে ক’দিন শুটিং চলবে। নতুন-নতুন জিনিসের বিজ্ঞাপন। গেঞ্জি-জাঙ্গিয়া থেকে শুরু করে প্রাোটিন ফুড আর ক্রাঞ্চি মিল পর্যন্ত…।’
জিশান চুপ করে রইল। একটা ক্লাবের পাশ দিয়ে ওরা হেঁটে যাচ্ছিল। তার কাচের দেওয়ালে রঙিন এল. সি. ডি. ডিসপ্লে-তে ইংরেজিতে লেখা ‘ফানডম’। তার নীচে লেখা : ‘ডু নট এন্টার ইফ য়ু আর অ্যাবাভ সিক্সটিন।’
জিশান সেদিকে তাকিয়ে আছে দেখে পান্ডা হেসে বলল, ‘ ”ই-ল্যান্ড”-এ যে ক’টা ক্লাব আছে তার একটার নামও নাইট ক্লাব নয়। কেন জানো?’
জিশান পান্ডার দিকে তাকিয়ে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ল। জানে না।
পান্ডা আর মূর্তি এ-ওর গায়ে চাপড় মারল, হাসাহাসি করল। তারপর মূর্তি বলল, ‘ক্লাবগুলো দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে বলে এগুলোর নাম নাইট ক্লাব নয়।’
