পান্ডা জিশানের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচাল। ছোট্ট করে বলল, ‘জিশান ম্যাজিক।’
জিশান ঠোঁটে হাসল।
এরপর জিশানকে ‘তৈরি’ করার পালা।
পান্ডা আর মূর্তি জিশানকে খোলসা করে কিছু বলেনি। কিন্তু ওকে পাশের একটা ছোট ঘরে নিয়ে গিয়ে ওরা যা শুরু করল সেটা থিয়েটারের গ্রিনরুমকেও হার মানায়। অফিসারটির তত্বাবধানে আনমোল নামে একজন সিকিওরিটি গার্ড জিশানের ভোল পালটানোর কাজে হাত দিল।
পান্ডা আর মূর্তি নিজেদের মধ্যে গল্প করছিল। আর পান্ডা মাঝে-মাঝেই শ্রীধর পাট্টার মুণ্ডপাত করে উত্তেজিত সব মন্তব্য ছুড়ে দিচ্ছিল।
প্রথমে জিশানকে বলা হল, জামাকাপড় ছেড়ে সিকিওরিটি গার্ডের ইউনিফর্ম পরে নিতে।
অফিসার পান্ডাকে লক্ষ করে বলল, ‘জানো, এই স্পেয়ার ইউনিফর্মটা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে স্টোর থেকে ম্যানেজ করতে হয়েছে। প্রত্যেকটা ইউনিফর্মে ম্যাগনেটিক সেন্সর লাগানো আছে। আমি রূপমকে বলেছিলাম। ও স্টোরের সারভেইল্যান্স চিফ। ও হেলপ না করলে হত না।’
জিশান ইউনিফর্মটা পরতে-পরতে অচেনা রূপমকে ধন্যবাদ দিল। ওর মনে হল, এই অন্যরকম প্রতিবাদী মানুষগুলো জিশানকে সাহায্য করেই সিন্ডিকেটের অবিচারের বিরুদ্ধে ওদের প্রতিবাদ জানাচ্ছে। জিশান কিল গেমে কোয়ালিফাই করে গার্ডদের সহানুভূতি জিতে নিয়েছে। ফাঁসির আসামির শেষ ইচ্ছে পূরণের মতোই ওরা জিশানের ‘শেষ’ ইচ্ছেগুলো পূরণ করে চলেছে।
গার্ডের সাহায্যে কয়েকমিনিটের মধ্যেই জিশানের পোশাক বদল শেষ হল। অফিসার ওকে শকার, স্মার্ট কার্ড সব দিল। হেসে বলল, ‘ওই আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াও। নিজেকে একবার দেখে নাও—।’
একটা মেটাল ক্যাবিনেটের খোলা পাল্লার ভেতরদিকে একটা ঝকঝকে আয়না লাগানো ছিল। জিশান আয়নাটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
কী আশ্চর্য! একটা কালো ইউনিফর্ম জিশানকে কী সাংঘাতিক পালটে দিয়েছে। এখন ও বলতে গেলে নিউ সিটির নিরাপত্তার যান্ত্রিক ব্যবস্থার একটা অংশ হয়ে গেছে।
গার্ড জিশানের কাছে এসে দাঁড়াল। ওর হাতে ছাই রঙের একটা মেকাপ বক্স। বলল, ‘এবার একটু হালকা মেকাপ…ব্যস…।’
পান্ডা হেসে বলল, ‘আনমোল একসময় যাত্রাদলের মেকাপম্যান ছিল। তারপর পেটের দায়ে এই বেশি মাইনের হতচ্ছাড়া চাকরিতে এসেছে। ওর মেকাপ কমপ্লিট হওয়ার পর তোমার ওয়াইফই তোমাকে আর চিনতে পারবে না—শ্রীধরের বাচ্চা তো কোন ছাড়!’
আনমোলের দিকে তাকাল জিশান। বয়েস তিরিশ ছুঁয়েছে কি না সন্দেহ। ফরসা মুখে ব্রণের দাগ। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। মুখ থেকে পেপারমিন্টের গন্ধ বেরোচ্ছে। চোখ ছোট-ছোট, তবে নজর তীক্ষ্ণ।
দক্ষ হাতে জিশানের মুখে কাজ শুরু করল আনমোল।
ঘরের দেওয়াল-ঘড়ির হিসেবে সময় লাগল উনিশ মিনিটের কয়েকসেকেন্ড বেশি। কিন্তু ওই অল্প সময়েই আনমোল জিশানকে পালটে দিল।
পান্ডা আর মূর্তি ওদের ‘নাইট সাফারি’-র প্ল্যান নিয়ে অফিসারের সঙ্গে আলোচনা করছিল। অফিসার বলল, ‘বেশি রিসক নেওয়ার দরকার নেই। শুধু সেফ জায়গাগুলোই জিশানকে ঘুরিয়ে দেখাও। নানান জোনের গার্ডদের সঙ্গে ওকে মিশিয়ে দেবে। তা হলেই ওকে আর কেউ নজর করতে পারবে না। নইলে…বুঝতেই তো পারছ…যদি আমাদের মার্শাল কোনওরকমে ব্যাপারটা টের পায় তা হলে আমরা কেউই আর বাদ যাব না। একজন ধরা পড়লেই ও টরচার করে তার পেটের সব কথা বের করে নেবে। একটা লোককে কী করে না মেরেও মেরে ফেলা যায় সেটা শ্রীধর পাট্টা ভালো করেই জানে। সুতরাং, কেয়ারফুল…।’
অফিসারের সঙ্গে কথা শেষ করে পান্ডা আর মূর্তি জিশানকে নিয়ে সিকিওরিটি কন্ট্রোল রুম থেকে বেরিয়ে এল। করিডর ধরে হাঁটতে শুরু করল।
চকচকে বাদামি গ্রানাইট পাথর বসানো মেঝেতে আয়নার মতো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছিল। জিশানের দুপাশে পান্ডা আর মূর্তি। প্যারেডের মতো সমান তালে পা মিলিয়ে ব্যস্তভাবে হেঁটে চলেছে। দেখে মনে হবে, ওরা কোনও মিশনে চলেছে। কন্ট্রোল রুমের অফিসার পান্ডা আর মূর্তিকে ঠিক এইভাবে হেঁটে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। জিশানের নিরাপত্তার জন্য এটা ওদের একরকম ছদ্মবেশ।
করিডরের দৈর্ঘ্য শেষ হতেই কয়েকধাপ সিঁড়ি। তারপর স্মার্ট ডোর। নির্দিষ্ট স্লটে নিজের স্মার্ট কার্ড সোয়াইপ করল মূর্তি। দরজা খুলে গেল। সামনেই খোলা চত্বর। চত্বরের বাইরে একফালি মিহি ঘাসজমির পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা কিউ-মোবাইল। তার গায়ে সিন্ডিকেটের লোগো আঁকা।
জিশান চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল।
জায়গাটা একদম ফাঁকা এবং অন্ধকার। পান্ডা চাপা গলায় বলল যে, এটা গেস্টহাউসের পিছনদিক। এদিকটায় শুধু গার্ডরাই চলাফেরা করে। ওদের ব্যবহারের জন্য যেসব কিউ-মোবাইল গেস্টহাউসে আসা-যাওয়া করে সেগুলো এখানেই পার্ক করা হয়। এখানে এসে গাড়িগুলো থামে, গার্ডরা ওঠা-নামা করে।
জিশানদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিউ-মোবাইলটার কাছ থেকে প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে আরও ছ’টা কিউ-মোবাইল পার্ক করা রয়েছে। পার্কিং জোনে লাল আলো জ্বলছে। বুঝিয়ে দিচ্ছে এটা ‘রেড অ্যালার্ট’ জোন।
দূরে চারজন গার্ডকে দেখতে পেল জিশান। ওদের দিকে ইশারা করে পান্ডা হাত নাড়ল। ওরাও হাত নেড়ে জবাব দিল।
গাড়িটার কাছাকাছি গিয়ে পান্ডা পকেট থেকে একটা রিমোট বের করে বোতাম টিপল।
