পিট ফাইটের আগে হলে এই গার্ডই হয়তো জিশানকে পাঁচটা প্রশ্ন করত। কিন্তু এখন কোনও কথা জিগ্যেস করল না। শুধু বলল, ‘কোনও চিন্তা কোরো না। কাল সন্ধেবেলা সাতটা নাগাদ ঘুরতে-ঘুরতে এখানে চলে এসো। পান্ডা আর মূর্তি থাকবে। আমি খবর দিয়ে দেব।’
সেটাই হয়েছিল। পরদিন সন্ধেবেলা সেই দুজন গার্ডের সঙ্গে দেখা হল জিশানের। ওদের একপাশে ডেকে নিয়ে গোপন আকাঙক্ষার কথা বলল জিশান।
শুনে মূর্তি একেবারে আঁতকে উঠল। বলল, ‘কীসব আজেবাজে বকছ! এ কী করে হয়! ধরা পড়লে বা জানাজানি হলে কেলেঙ্কারি হবে। অবশ্য সেই কেলেঙ্কারি দেখার জন্যে আমি বা পান্ডা কেউই আর বেঁচে থাকব না। শ্রীধর পাট্টা আমাদের বটিচচ্চড়ি করে খেয়ে নেবে।’
মূর্তির আতঙ্ক দেখে পান্ডা হাসল। তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাত নেড়ে নেশা করা জড়ানো গলায় সঙ্গীকে বলল, ‘ওসব ফালতু কথা ছাড় তো! শ্রীধর পাট্টার চেয়ে আমার কি আই. কিউ. কিছু কম আছে? আমি এমন টেকনিকে কাজ হাসিল করব যে, পাট্টার বাপ-ঠাকুরদাও টের পাবে না।’ জিশানের দিকে ফিরে বলল, ‘কোনও ভয় নেই, জিশানভাইয়া—সব হয়ে যাবে…।’
জিশান চাপা গলায় বলল, ‘আমি দশহাজার টাকা দেব।’
পান্ডা লাল চোখ বড়-বড় করে জিশানের দিকে তাকাল। যেন মঙ্গলগ্রহের প্রাণী দেখছে।
‘টাকা? তোমার কাছ থেকে টাকা নেব?’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আপনমনেই কীসব বিড়বিড় করল পান্ডা। তারপর : ‘যদি নিতেই হয় তা হলে নেব কিল গেম-এর পর। তুমি তখন একশো কোটি টাকার প্রাইজ মানি জিতবে। তার থেকে কিছু আমাদের দিয়ো…এই গরিব ভাই দুটোকে দিয়ো।’
জিশান বুঝল, পান্ডা আসলে কী বলতে চাইছে। ও কিল গেম-এ জিতলে তবে না পান্ডা আর মূর্তিকে টাকা দেবে! আসলে ওরা জিশানকে উইশ করছে।
জিশান কোনও কথা বলল না। মলিনভাবে হাসল। ফোয়ারার জলটাকে হঠাৎই ওর চোখের জল বলে মনে হল। ও চারপাশে তাকাল। রাতের আকাশ দেখল। বাতাসের ঘ্রাণ নিল। গেস্ট হাউসের উঁচুতলার দিকে তাকাল। তারপর পান্ডা আর মূর্তিকে দেখল।
আরও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার মুখ খুলল : ‘ছোটবেলায় আমি এই শহরে থাকতাম। তারপর…তারপর…এই শহর ছেড়ে ওল্ড সিটিতে চলে গেছি। বহুবছর এই শহরটাকে দেখিনি। তাই কিল গেম-এর আগে একবার দেখতে ইচ্ছে করছে…ভীষণ ইচ্ছে করছে। সেইজন্যেই তোমাদের হেলপ চেয়েছি।’
পান্ডা অবাক হয়ে বলল, ‘ও, তাই! তুমি এই শহরে ছিলে! যাকগে, কোনও প্রবলেম নেই। কাল সাড়ে সাতটায় তুমি এখানটায় চলে এসো—আমরা থাকব। তারপর তোমায় গোটা শহরটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেব…।’
জিশান ফোয়ারার জলের ধারার দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর মনে পড়ছিল মিনির কথা, শানুর কথা। মা-বাবার কথাও। এই শহরটা ছেড়ে যাওয়ার দিনে বাবার চোখের জলের কথা মনে পড়ে গেল জিশানের।
ও পান্ডার হাত চেপে ধরল। ছেলেমানুষের মতো অনুনয় করে বলল, ‘আমার হাতে আর সময় নেই। কিল গেম-এ শেষ হয়ে যাওয়ার আগে শহরটাকে একবার দেখতে চাই।’
পান্ডা চোখ বড়-বড় করে নেশাতুর দৃষ্টিতে তাকাল জিশানের দিকে : ‘কিল গেম-এ শেষ? তুমি?’ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল পান্ডা। তারপর হাসি থামলে বলল, ‘জিশানের শেষ নেই।’
•
জিপিসি-র সিকিওরিটি কন্ট্রোল রুমে জিশানকে নিয়ে এল পান্ডা আর মূর্তি।
এরকম আধুনিক ঝকঝকে কন্ট্রোল রুম ফিউচারিস্টিক সিনেমাতেও দেখা যায় না। চারদিকে শুধু কাচ আর স্টেইনলেস স্টিল। এ ছাড়া ওয়াল মাউন্টেড কম্পিউটার আর অসংখ্য টাচ-স্ক্রিন ডিসপ্লে। বাঁ-দিকের বিশাল দেওয়ালের পুরোটাই একটা গ্রাফিক ডিসপ্লে স্ক্রিন। সেখানে জিপিসি-র নানান মনিটরড জোন দেখা যাচ্ছে। ছবির সঙ্গে-সঙ্গে জোনগুলোর নম্বর আর নাম চোখে পড়ছে। পাঁচ কি ছ’সেকেন্ড পরপর ছবিগুলো পালটে যাচ্ছে—ঠিক যেমন কম্পিউটার কার্ড গেমে তাস পালটে যায়।
