গার্ড জিশানের দিকে হাত বাড়াল। জিশানও।
হ্যান্ডশেক করে গার্ড বলল, ‘গুড লাক, জিশান।’
‘থ্যাংক য়ু।’
এলিভেটরের দরজা বন্ধ হল। জিপিসি-র গেস্ট হাউসের ছাদে জিশান একা। ওকে ঘিরে সুবিশাল ভোরের আকাশ।
জিশানের মনে হল, আকাশের এই বিশাল ক্ষমতা আর মমতা ওকে আগলে রেখেছে। কিল গেম-এর আঁচ থেকে আকাশ ওকে বাঁচাবে।
ছাদে দুজন গার্ড পাহারায় ছিল। জিশানকে দেখে ওরা তাড়াতাড়ি কাছে এগিয়ে এল। ওদের একজন ভুরু উঁচিয়ে ইশারায় জিগ্যেস করল, ‘কী ব্যাপার?’
জিশান বলল, ‘কিছু না। ঘুম আসছে না। ঘরের ভেতরে ভাল্লাগছে না। তাই ছাদে পায়চারি করতে এলাম।’
‘কী করে ভালো লাগবে! তোমার ওপরে যা ধকল গেছে।’
আর-একজন বলল, ‘তোমার কথা পান্ডা আর মূর্তির কাছে শুনেছি। ওরা তোমার কথা খুব বলছিল।’
জিশানের ভুরু কুঁচকে গেল : ‘কে পান্ডা আর মূর্তি?’
‘ওই যে—বেঁটে আর লম্বু মানিকজোড়। আমাদের মতো সিকিওরিটি গার্ড। বেঁটেটা পান্ডা। আর লম্বুর নাম মূর্তি।’
জিশান চুপ করে রইল।
প্রথমজন বলল, ‘আমরা নিজেদের মধ্যে তোমার কথা বলাবলি করি। তুমি খুব হিম্মতওয়ালা।’
ওর সঙ্গী নীচু গলায় বলল, ‘তোমার সামনে কিল গেম। তোমাকে হেলপ করা উচিত। যদি মনখারাপ না করো একটা কথা বলব?’
জিশান মনে-মনে মনখারাপ না করার জন্য তৈরি হল। জিগ্যেস করল, ‘কী?’
‘কিল গেম-এর সারভাইভ্যাল ফ্যাক্টর 0.07 বলে সিন্ডিকেট যেটা ঢেঁড়া পিটিয়ে প্রচার করে সেটা ফলস। ওটা আসলে 0.0। কিল গেম-এ, কেউ বাঁচে না। ওই গেম সিটি থেকে কেউ বেঁচে ফিরে আসে না।’
জিশান মলিন হাসল : ‘জানি…।’
‘তোমাকে আমরা যতরকমভাবে পারি হেলপ করব। কারণ, আমরা চাই তুমি জেতো। তবে কী করে জিতবে জানি না।’
জিশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর কিছু সমর্থক আছে জেনে ওর ভালো লাগছে। তবে সেই সমর্থন ওকে কোথাও পৌঁছে দেবে না।
‘না—তোমাকে আর ডিসটার্ব করব না।’ বলে গার্ড দুজন সরে গেল। যার-যার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে পজিশন নিল।
জিশান ছাদের কিনারার দিকে হেঁটে গিয়ে পুব আকাশের দিকে তাকাল। ভোরের আলো ফুটে গেছে—এবার সূর্য ফোটার পালা।
রিড্রেসাল ইউনিট থেকে জিপিসি-র গেস্টহাউসে ফেরার দিন গার্ডদের খুশির হইচই জিশানকে অবাক করেছিল। আজও গার্ড তিনজনের প্রতিক্রিয়া ওকে অবাক করল। ওরাও জানে, কিল গেম-এর সারভ্যাইভ্যাল ফ্যাক্টর 0.0। খাঁচার ভেতরে ইঁদুর-বেড়াল খেলা। বেড়ালের হাতে ইঁদুর মরবেই। শুধু সময়ের অপেক্ষা।
ছাদের সাঁইতিরিশ তলার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে নিউ সিটির ‘ছবি’ দেখছিল জিশান। নানান বাড়ির আকাশছোঁয়া কাঠামোগুলোয় অতি-আধুনিক স্থাপত্যের চিহ্ন। জিশানের বারো বছর বয়েসে নিউ সিটি যা ছিল এখন তা নেই। সময় গড়িয়ে চলার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানকার নাগরিক জীবনে বহুরকম নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। তারই একটা হচ্ছে বিনোদন—পুরুষালি বিনোদন। কে জানে, আগামী আট-দশবছরে সুপারগেমস কর্পোরেশনের গেম ইনভেন্টরসরা হয়তো শুধু মেয়েদের নিয়ে নানান ধরনের রোমাঞ্চকর খেলা আবিষ্কার করবেন। তারপর আসবে পুরুষ এবং মহিলাদের মিশিয়ে আরও নতুন ধরনের গেম-এর পরিকল্পনা। তারপর… তারপর…।
তার পরের ব্যাপারটা ভাবতেই জিশানের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। যদি শ্রীধর পাট্টা আর তাঁর গেম ইনভেন্টর সাঙ্গপাঙ্গরা তাঁদের বিকৃত স্যাডিস্ট মনোভাব নিয়ে শিশু আর কিশোরদের জন্য আরও নোংরা চরিত্রের, আরও বেপরোয়া, সব মরণপণ ‘খেলা’ আবিষ্কার করেন? যদি ম্যানিম্যাল রেসে ক্ষুধার্ত ব্লাডহাউন্ডের সঙ্গে কিশোর প্রতিযোগীরা দৌড়য়? যদি অল্পবয়েসি ছেলেমেয়েদের পিছনে লেলিয়ে দেওয়া হয় ভয়ংকর কোমোডো ড্রাগন? যদি স্নেক লেক কমপিটিশানের কনটেস্ট্যান্ট হয় আট-ন’ বছরের বালক-বালিকার দল?
জিশান আর ভাবতে পারছিল না। ওর বমি পাচ্ছিল। এ কয়েকমাসের অভিজ্ঞতায় ওর মনে হচ্ছিল, এরকমটা হতেই পারে—যদি না কেউ সময়মতো বাধা দেয়।
কিন্তু কখন সেই সময়?
ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে জিশানের মনে হল, ওর বুকের ভেতর থেকে কে যেন চেঁচিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর দিল : ‘এখন! এখন! এখন!’
ততক্ষণে দিগন্তের ক্যানভাসে সূর্য উঠে পড়েছে।
•
বেশ কয়েকদিন ধরে একটা চিন্তা জিশানের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। চিন্তাটাকে অনেকবার তাড়ানোর চেষ্টা করেছিল ও, কিন্তু চিন্তাটা যায়নি। বারবার ও নিজেকে বোঝাচ্ছিল যে, এটা একটা অবাস্তব আকাঙক্ষা, কিন্তু ওর ছেলেমানুষ মন মানতে চায়নি।
শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে ও পান্ডা আর মূর্তির শরণাপন্ন হল।
ওদের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে নিয়েই জিশান গেস্টহাউসের একতলার ফোয়ারার কাছে কয়েকদিন ধরে ঘুরঘুর করছিল। কিন্তু ওদের দেখা পাচ্ছিল না। কে জানে, হয়তো ওদের জিপিসি থেকে ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়েছে!
পরপর তিনদিন জিশানের উসখুসুনি দেখে একদিন রাতে একজন গার্ড জিশানকে কাছে ডাকল। জিগ্যেস করল, ‘কী ব্যাপার বলো তো! ক’দিন ধরে তুমি এখানটায় ঘুরঘুর করছ কেন?’
জিশান ইতস্তত করতে লাগল।
তখন গার্ডটি বলল, ‘আরে ইয়ার, তুমি কিল গেম-এ কোয়ালিফাই করেছ। তোমার জন্যে রুল-টুল আর অত স্ট্রিক্ট নেই। বলো, কী বলবে?’
‘আমি…আমি পান্ডা আর মূর্তির সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। খুব জরুরি ব্যাপার…।’
