লম্বা গার্ড কোথা থেকে যেন ছিটকে চলে এল জিশানের সামনে। চাপা গলায় বলল, ‘শাবাশ, জিশান, শাবাশ। তোমার জবাব নেই। তুমি বেঁচে থাকলে সবার ভালো হবে। কিন্তু…।’
জিশান বিষণ্ণ হাসল। সামনে কিল গেম। সুতরাং ওই ‘কিন্তু’টাই আসল কথা।
লম্বা গার্ড চটপট জিশানের কাছ থেকে সরে গিয়ে ওর বেঁটে সঙ্গীর হাত চেপে ধরল: ‘অ্যাই, কী করছিস কী! কেউ দেখে রিপোর্ট করলে কী হবে? চল, চল—শিগগির চল।’
এক ঝটকায় লম্বা বন্ধুর হাত ছাড়িয়ে নিল বেঁটে : ‘কোন সালা রিপোর্ট করবে? কোন সালা?’ টলোমলোভাবে মাথার ওপরে হাত ঘুরিয়ে বলল, ‘এখানে তো শুধু আমরাই আছি, নাকি? কী ভাই, তোমরা কি কেউ ওই শ্রীধরের বাচ্চাকে রিপোর্ট করবে? হ্যাঁ?’
আশ্চর্য! বাকি গার্ডরা এলোমেলো গুঞ্জন তুলে বলল, ‘না, না—কীসের রিপোর্ট! জিশান আমাদের হিরো নাম্বার ওয়ান। শুরু থেকে তো আমরা ওর গেম দেখছি। ও একেবারে লা-জবাব।’
বেঁটে গার্ড উত্তেজিতভাবে লম্বা সঙ্গীর ইউনিফর্ম খামচে ধরল : ‘দেখলি, সবাই কী বলছে! দেখলি!’
সবমিলিয়ে হইহট্টগোল বেড়ে উঠছে দেখে শেষ পর্যন্ত জিশানই সবাইকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ করতে লাগল। তারপর কথা না বাড়িয়ে ও এগিয়ে গিয়েছিল এলিভেটরের দিকে।
জিশানের অদ্ভুত লাগছিল। এই সাধারণ মানুষগুলো, যারা এখানে স্রেফ দু-পয়সা আয়ের জন্য সিকিওরিটি গার্ডের চাকরি নিয়েছে, জিশানের জেতায় এতটা খুশি হয়েছে! এর একটা কারণ বোধহয় সিন্ডিকেট এবং শ্রীধর পাট্টার প্রতি ওদের ঘৃণা। থমথমে আতঙ্কের নিয়মিত শাসন আর মৃত্যু দেখতে-দেখতে ওদের ভেতর থেকে বমির ভাব উথলে উঠেছে। মুখের ভেতরে যে-থুতু আর জল টের পাচ্ছে তার স্বাদ টক।
নাহাইতলা গ্রামে থাকা গার্ডের কথা মনে পড়ল জিশানের। শান্ত, নরম, ছবির মতো ওর সেই গ্রাম। আর বছরপাঁচেক চাকরি করেই ও গ্রামে ফিরে যাবে। এখানে একটা মুহূর্তও ছেলেটার ভালো লাগছে না।
জিশান ক্রমশই যেন বুঝতে পারছিল, আসলে অনেকেই এখানে ভালো নেই।
জিপিসি-তে ফিরে আসার পর আরও দশদিন জিশানকে ডাক্তারদের নির্দেশ মতো চলতে হয়েছে। ওকে এখন সফট এক্সারসাইজ দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে চলছে ফিজিয়োথেরাপি মেশিনের ট্রিটমেন্ট। আর সপ্তাহখানেক পর থেকেই ওর কিল গেম ওয়ার্ম-আপ ট্রেনিং শুরু হবে। তারপর…।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল জিশান। অবাক হয়ে খেয়াল করল, ওর মধ্যে এখন উৎকণ্ঠা, উত্তেজনা, আশঙ্কার তেমন কোনও ছায়াপাত নেই। নিউ সিটিতে আসার শুরুর দিকটায় এই আবেগগুলোই জিশানকে শাসন করত। তারপর কয়েকমাস ধরে নানান খেলায় অংশ নিয়ে জীবন-মরণের ওঠা-পড়া দেখতে-দেখতে এইসব আবেগ কবে জমাট বেঁধে বরফ হয়ে গেছে! জিশান এখন অনেক ধীর, স্থির, শান্ত।
এলিভেটরের ভেতরে ঢুকল জিশান। নি:শব্দে দরজা বন্ধ হল।
‘কোথায় যাবে?’ গার্ড জিগ্যেস করল।
‘ছাদে যাব। ঘরের মধ্যে কেমন যেন দম আটকে আসছে।’
‘হবেই তো! এতদিন ধরে ফ্যামিলি ছেড়ে এখানে একা-একা থাকা…।’
‘তুমিও তো এখানে একা-একা আছ—।’
এলিভেটর উঠতে শুরু করেছিল। ডিসপ্লে প্যানেলের দিকে একপলক তাকিয়ে জিশানের দিকে মুখ ফেরাল গার্ড। হেসে বলল, ‘ফারাকটা বুঝতে পারলে না, ভাই! আমি এখানে একা আছি নিজের ইচ্ছেয়—চাকরি করছি, তাই। আর তুমি এখানে আছ শ্রীধর পাট্টার ইচ্ছেয়। মানে, বন্দি।’
মানুষটার এই সহজ ব্যাখ্যায় জিশান বেশ অবাক হয়ে গেল। ও গার্ডের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
অন্যান্য গার্ডের তুলনায় এর বয়েস কিছুটা বেশি। সাঁইতিরিশ-আটতিরিশ হবে। ফরসা সুন্দর চেহারা। তবে মুখে যেন একটা আবছা লড়াইয়ের ছাপ রয়েছে।
গার্ড জিগ্যেস করল, ‘তোমার সামনে তো কিল গেম?’
জিশান কোনও কথা বলল না—শুধু ওপর-নীচে মাথা নাড়াল।
‘তোমাকে সবসময় টিভিতে দেখায়। তোমার গেমগুলো দেখায়—ট্রেনিং দেখায়। নিউ সিটির প্রায় সবাই তোমাকে চিনে গেছে।’
জিশান চুপ করে রইল। গার্ডকে দেখতে লাগল।
‘মনোহর সিং তোমার দোস্ত ছিল?’
সঙ্গে-সঙ্গে জিশানের মনখারাপ হয়ে গেল। বুক ঠেলে একটা শ্বাস বেরিয়ে এল।
গার্ড বলে চলল, ‘হ্যাঁ…তোমাকে আমি টিভিতে কাঁদতে দেখেছি। পিট ফাইটে মনোহর সিং-এর সঙ্গে লড়াইয়ের অ্যানাউন্সমেন্টের সময়। তারপরে মনোহরকে যখন কুকুরগুলো ছিঁড়ে খেল, তখনও।’
জিশানের বুকের ভেতরে কষ্ট হচ্ছিল। মনোহর নামের হাসিখুশি অশিক্ষিত উদার মানুষটার স্মৃতি ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর চোখের সামনে।
এলিভেটরের দরজা খুলে গেল। সামনে বিশাল ছাদ। ভোরের কোমল আলোয় স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। এই স্নিগ্ধ শূন্যতা জিশানকে আরও বিষণ্ণ করে তুলল।
গার্ড বলল, ‘এখানে দশবছর চাকরি হয়ে গেল। অন্য কারও জন্যে কোনও ক্যান্ডিডেটকে চোখের জল ফেলতে দেখিনি। তোমার ভেতরে এখনও মানুষ আছে, ভাই। কিল গেম-এ তুমি জিতলে আমার খুব ভালো লাগবে।’
জিশান এবার বলল, ‘কিন্তু শুনেছি কিল গেম-এ আগে কেউ জেতেনি—।’
‘ঠিকই শুনেছ।’ আঙুল তুলে আকাশের দিকে দেখাল গার্ড : ‘ওপরের ওই অদৃশ্য লোকটার কাছে অনেকেই তো অসম্ভব উদ্ভট অনেক কিছু চায়। কোনওদিন পাবে না জানে, তবু চায় তো!’ হাসল। অনাবিল হাসি : ‘তো আমিও তাই চাইছি।’ একটু থেমে তারপর : ‘আমি একা নয়—অনেকেই চাইছে তুমি কিল গেম-এ জেতো।’
জিশান হাসল। সায় দিয়ে মাথা নাড়ল। বলল, ‘লড়ব—জান কবুল করে লড়ব।’
