অথচ জাব্বার মতো বর্ন কিলারের হাতে ছেলেটা শেষ হয়নি। উলটে জাব্বাকে চুরচুর করেও ওকে খতম করেনি। ওকে জীবনভিক্ষা দিয়েছে।
সারা শহর এখন জিশান বলতে পাগল।
একের-পর-এক খেলায় জিতে ছেলেটা ধীরে-ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু পিট ফাইটে ও জাব্বাকে বাগে পেয়েও খতম না করে ছেড়ে দেওয়ায় শহরবাসীরা অনেকে খুশি হয়েছে। তারা জিশানকে নিয়ে দিন-রাত চর্চা করছে।
নিউ সিটিতে ছড়ানো গুপ্তচরের মারফত সব খবরই পাচ্ছেন শ্রীধর।
টিভির নানান চ্যানেলে জিশানের নানান গেম-এর পারফরম্যান্স নিয়মিত রিপিট টেলিকাস্ট হচ্ছে। ওকে নিয়ে বিজ্ঞাপনদাতারা তাদের প্রাোডাক্ট প্রাোমোট করছে। দিন-রাত টেলিভিশানে শুধু জিশান আর জিশান।
শ্রীধর বুঝতে পারছিলেন, এই ছেলেটাকে নিয়ে শহরে ‘হিরো ওয়রশিপ’ শুরু হয়ে গেছে। জনগণ চাইছে কিল গেম-এ জিশান জিতুক। অসম্ভবকে সম্ভব করুক। জিশান পালচৌধুরী ওদের চোখে সুপারহিরো।
কিন্তু কিল গেম-এ তো আজ পর্যন্ত কেউ বাঁচেনি!
এই গেম-এর আইডিয়াটা প্রথম শ্রীধরের মাথায় আসে। তারপর সুপারগেমস কর্পোরেশনের গেম ডিজাইনাররা গেমটাকে ফাইনাল শেপ দেয়। যদিও মিডিয়ার মাধ্যমে সবসময় প্রচার করা হয় কিল গেম-এর সারভাইভ্যাল ফ্যাক্টর 0.07, শ্রীধর জানেন আসলে ওটা 0.0। ননজিরো ইনডেক্সটা দেওয়া আছে শুধু ইনটারন্যাশনাল গেম কোডকে বুড়ো আঙুল দেখানোর জন্য।
জিশানের সুপারহিরো হয়ে ওঠার ব্যাপারটা শ্রীধরের মনে কাঁটার মতো খচখচ করতে লাগল।
না। না। কিল গেম-এ জিশানকে হারতে হবে।
হারতেই হবে।
•
ভোরের আকাশের দিকে তাকিয়ে জিশানের মনটা উদাস হয়ে গেল।
এখন ক’টা বাজে? খুব বেশি হলে সাড়ে পাঁচটা। টিভির মেয়েটি ভোর ছ’টায় মিষ্টি গলায় ওকে ডেকে ওঠার অনেক আগেই জিশান ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে চলে এসেছে এলিভেটরের কাছে। ওর ভীষণ ছাদে যেতে ইচ্ছে করছিল। ওখানে আকাশ অনেক বড়।
এলিভেটরের দরজা খুলে যেতেই পিস ফোর্সের একজন গার্ডকে দেখা গেল। কোমরে ঝুলছে শকার।
জিশানকে দেখে গার্ডের চোয়ালের রেখা নরম হল। মুখের রুক্ষ ভাব মিলিয়ে গেল।
গার্ড জিগ্যেস করল, ‘এখন কেমন আছ?’
‘আগের চেয়ে অনেক ভালো।’
জাব্বার সঙ্গে লড়াই শেষ হওয়ার পর জিশানকে লেভেল ওয়ান ফিজিক্যাল রিড্রেসাল ইউনিটের এক্সট্রিম কেয়ার সেল-এ রাখা হয়েছিল। সেখানে আধুনিক চিকিৎসার চূড়ান্ত ম্যাজিক দেখেছিল জিশান। মেডিকদের মুখে শুনেছিল, ওর পাঁজরের দুটো হাড় ভেঙেছে, বাঁ-পায়ের ঊরুর একটা পেশি মারাত্মক চোট পেয়েছে, ডান হাঁটুর মালাইচাকি সরে গেছে, ডানহাতের তর্জনি আর মধ্যমার হাড়ে চিড় ধরেছে। এসব সমস্যা ছাড়াও সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা আর যন্ত্রণা তো ছিলই!
জিশানকে জোড়াতালি দিয়ে ঠিক করতে ডাক্তারবাবুদের প্রায় কুড়ি দিন লেগে গেল। যখন ও ফিজিক্যাল রিড্রেসাল ইউনিট থেকে ছাড়া পেল তখনও ওর পাঁজরে আর ডানহাতের আঙুলে স্টিকিং পলিমার ড্রেসিং। এই ড্রেসিং ওয়াটারপ্রুফ—জল লাগলেও কোনও ক্ষতি হয় না।
রিড্রেসাল ইউনিটের বেডে শুয়েই অনেক অভিনন্দন পেয়েছিল জিশান। ডক্টররা, নার্সরা ওকে ‘কনগ্র্যাটস’ জানিয়েছিল—এবং সেটা শুধু জাব্বাকে হারিয়ে জেতার জন্য নয়, জাব্বাকে প্রাণভিক্ষা দেওয়ার জন্যও। রিমিয়াও ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। ছোট্ট করে ওকে বলেছিল, ‘জিশান, আমার স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। য়ু ক্যান ডু ইট।’
জিশানের অবাক লেগেছিল। ওর মনে পড়ছিল পিট ফাইটের স্টেডিয়ামের কথা। সেই ভয়ংকর রাতে গ্যালারির মানুষগুলো রক্তের জন্য বীভৎস পিপাসায় গর্জন করছিল, হাত-পা ছুড়ছিল। তখন জিশান বুঝতে পারেনি সেখানে অন্যরকম মানুষও রয়েছে। এখন ও নতুন করে বুঝতে পারছিল বৈচিত্র মানুষের প্রধান ধর্ম। পয়সার অন্য পিঠটা ও অল্প-অল্প দেখতে পাচ্ছিল।
রিড্রেসাল ইউনিট থেকে জিশান যখন গেম পার্টিসিপ্যান্টস ক্যাম্পাস-এ ফিরে এসেছিল তখন পিস ফোর্সের বেশ কয়েকজন গার্ড ওকে দেখামাত্রই ওকে ঘিরে ধরে হইচই বাধিয়ে দিয়েছিল।
‘ওয়েলকাম, জিশানভাইয়া। ফাইটার নাম্বার ওয়ান।’ একজন অচেনা গার্ড বলেছিল।
তারপরই চেনা দুজন গার্ডকে দেখতে পেয়েছিল জিশান। লম্বা এবং বেঁটে। জিশান আর ফকিরচাঁদকে নেকরোসিটি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া স্নেক লেক কমপিটিশানের আগে বেঁটে গার্ডটি সকলকে লুকিয়ে জিশানকে স্নেক রিপেলান্ট অয়েল দিয়েছিল। সোজা কথায় বলতে গেলে জিশানের প্রাণ বাঁচিয়েছিল।
বেঁটে গার্ড ওর কাছে এগিয়ে এল। সন্ধের শুরুতেই লোকটার মুখ থেকে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে। জিশানের বুকে দুটো চাপড় মেরে জড়ানো গলায় বলল, ‘তুমি সত্যিকারের হিরো, জিশান। তুমি ইচ্ছে করলে জাব্বার গর্দানটা মটাস করে ভেঙে দিতে পারতে—কিন্তু দাওনি। তোমার দিল আছে। বুদ্ধিও। তুমি ভালো করেই জানো, জাব্বাকে মেরে এই খতমের খেলা বন্ধ করা যাবে না। তুমি শুধু হিরো না, ভাই, তুমি একেবারে হিরো নাম্বার ওয়ান।’
কথা শেষ করে জিশানকে জড়িয়ে ধরল। ওর বুকের কাছে একটা চুমু খেল। তারপর হাত তুলে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে নাচতে শুরু করল। অন্য গার্ডরা সঙ্গীর এই কাণ্ড হাততালি দিয়ে উপভোগ করতে লাগল।
