আজ বলধর নেই। সে মারা গেছে প্রায় আটবছর। প্যানক্রিয়াসে ক্যান্সার হয়ে খুব কষ্ট পেয়ে মারা গেছে। কিন্তু তার আগে বলধর তার কাজ সম্পূর্ণ করে গেছে। পুরোপুরি নিজের ছাঁচে শ্রীধর পাট্টাকে তৈরি করে গেছে। নিউ সিটিকে এক পূর্ণাঙ্গ মার্শাল উপহার দিয়ে গেছে। বলধরের ছেড়ে যাওয়া জুতোয় পা গলিয়ে দিয়েছেন শ্রীধর। বলধরের প্রাসাদে তিনি এখন একা থাকেন। তাঁর সঙ্গে থাকে তদারকির বারোজন পুরুষ।
বলধরের চিকিৎসায় চূড়ান্ত আন্তরিক ছিলেন শ্রীধর। কোনও মানুষের পক্ষে যা-যা করা সম্ভব তার সবটাই করেছিলেন। কিন্তু ঈশ্বরের খাতায় বলধরের সময় ফুরিয়ে গিয়েছিল। তাই ‘বলধর যুগ’ শেষ হল। শুরু হল ‘শ্রীধর যুগ’। নিউ সিটির মানুষের চোখে শ্রীধর পাট্টা হলেন শহরের শৃঙ্খলা আর শাসনের দেবতা।
শ্রীধর নামে হয়তো পিস ফোর্সের মার্শাল। কিন্তু কীভাবে-কীভাবে যেন সুপারগেমস কর্পোরেশন আর সিন্ডিকেটের ওপরেও তাঁর ক্ষমতা কায়েম হয়ে গেছে। শহরের ক্ষমতা-সাম্রাজ্যের যে-অঞ্চলেই কোনও পুতুলনাচ দেখা যাক না কেন, তার সুতো আসলে বাঁধা রয়েছে শ্রীধরের আঙুলে।
গায়ের ঘাম মুছে তোয়ালেটা আবার হ্যাঙারে রেখে দিলেন। পায়ে-পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলেন একটা স্টেইনলেস স্টিলের কাবার্ডের কাছে। কম্বিনেশান লকের বোতাম টিপে-টিপে কাবার্ডের পাল্লা খুললেন। ভেতরে কয়েকটা তাকে নানান টুকিটাকি জিনিস।
তারই মধ্যে থেকে একটা ছোট্ট শিশি তুলে নিলেন শ্রীধর। শিশিটা চোখের সামনে তুলে ধরে চকচকে নজরে তাকালেন ওটার দিকে। শিশির ভেতরে গাঢ় স্বচ্ছ তরল। ঢাকনা খুলে শিশিটা শূন্যে উঁচু করে ধরলেন। মুখ হাঁ করে তাকালেন ওপরদিকে। কয়েক ফোঁটা তরল ঢেলে দিলেন হাঁ-এর ভেতরে। মুখ বন্ধ করে মাথা ঝাঁকালেন এপাশ-ওপাশ। জিভ দিয়ে টাকরায় তৃপ্তির শব্দ করলেন কয়েকবার। শ্রীধরের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল—সিংহের চোখের মতো। ঢাকনা এঁটে শিশিটা আবার তাকে ফিরিয়ে দিলেন।
এই ওষুধটা এক অদ্ভুত এনার্জি সল। বিদেশ থেকে এই তরল আমদানি করেন শ্রীধর। শুধুমাত্র নিজের জন্য। নিউ সিটির আর কেউ জানে না এই তরলের রহস্য। সারাদিনে কয়েকবার এই ওষুধটা নেন শ্রীধর। এটা ওঁর শরীরে নতুন শক্তি তৈরি করে। এটা খাওয়ার পরই মনে হয় শরীরের ভেতরে অফুরান শক্তি বাজপাখির মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে।
এই আশ্চর্য ওষুধের গোপন রহস্য শ্রীধরকে জানিয়ে গেছে বলধর। নিজের অভ্যাসের উত্তরাধিকার দিয়ে গেছে ‘ছোট ভাই’-কে। এ ছাড়া বলধর আরও একটা ‘অভ্যাস’ শ্রীধরকে ধরিয়ে গেছে। লিপস্টিক। ফ্লুওরেসেন্ট লিপস্টিক। তবে ছড়া কেটে কথা বলার ব্যাপারটা শ্রীধরের নিজস্ব।
কাবার্ডের দরজা বন্ধ করলেন। তোয়ালে দিয়ে আর একবার গা মুছে জিমের লাগোয়া ড্রেসিংরুমে চলে এলেন।
নিজের শত্রুদের কথা ভাবতে লাগলেন শ্রীধর।
বলধরের শত্রু ছিল। এটা খুবই স্বাভাবিক। ক্ষমতায় যদি কেউ থাকে তার শত্রু থাকবেই। সেই কারণেই বলধর নিজের জন্য বিশেষ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। নিজের বিশ্বস্ত গুপ্তচর সে ছড়িয়ে রেখেছিল নিউ সিটির মানুষজনের মধ্যে আর সিন্ডিকেটের নানান স্তরে—এমনকী সিন্ডিকেটের সাধারণ কর্মীদের মধ্যেও মিশে ছিল বলধরের অনুচরের দল। তাদের সবাইকে বলধর নিয়মিত টাকা দিত। বছরের পর বছর ক্ষমতায় থেকে বলধর সবাইকে টাকা চিনতে শিখিয়েছে। বোঝাতে চেয়েছে, টাকাই সব। বোঝাতে চেয়েছে, ‘মূল্যবোধ’ শব্দটার আসল অর্থ ‘মূল্যের বোধ’—অর্থাৎ, অর্থমূল্যের বোধ। ‘মূল্য’ আর ‘দাম’ শব্দ দুটোর মধ্যে কোনও তফাত নেই। ঠিক যেমন ইংরেজি ‘ভ্যালু’ আর ‘প্রাইস’ শব্দ দুটোর মধ্যে কোনও তফাত নেই।
সেই পথেই পা ফেলে এগিয়ে চলেছেন শ্রীধর। গুপ্তচর, টাকা ইত্যাদির বিনিময়ে নিজেকে সুরক্ষিত করার বন্দোবস্ত যেমন করেছেন তেমনই ইমার্জেন্সি সিচুয়েশানের জন্য নিজের আওতায় রেখেছেন স্পেশাল শুটার। তিনটে ইঞ্জিন লাগানো এই শক্তিশালী শুটার শ্রীধর নিজেই চালাতে পারেন। এই শুটারের মধ্যে লুকোনো রয়েছে অ্যান্টি-ডেসট্রাকশন স্টিল বক্স। থার্মাল ইনসুলেশান দেওয়া এয়ারটাইট এবং ওয়াটারপ্রুফ সেই বাক্সের ভেতরে রয়েছে শ্রীধরের ইমার্জেন্সি ফান্ড—কয়েক লক্ষ মার্কিন ডলার।
যদি কখনও প্রয়োজন হয় শ্রীধর এই স্পেশাল শুটারে করে নিউ সিটি ছেড়ে উড়ে যাবেন পৃথিবীর যে-কোনও দেশে। সেখানে নিরাপদে জীবন কাটাবেন। একইসঙ্গে ক্ষমতায়নের পুনর্বাসনের অপেক্ষায় থাকবেন। তারপর প্রথম সুযোগেই ফিরে আসবেন নিউ সিটিতে।
কাবার্ডের পাল্লা বন্ধ করে আপনমনে মাথা নাড়লেন শ্রীধর। হাসলেন। যতই এসব ব্যবস্থা থাকুক না কেন শ্রীধর জানেন, এসবের কোনও প্রয়োজন হবে না। শ্রীধর পাট্টা আছেন, এবং থাকবেন। কখনও-কখনও নিজেকে সত্যি অমর বলে মনে হয় শ্রীধরের। তিনি কখনও চান না নিউ সিটিতে তিনি ছাড়া আর কোনও ‘হিরো’ তৈরি হোক। যখনই শ্রীধর এরকম সম্ভাবনা দেখেছেন তখনই ‘ব্যবস্থা’ নিয়েছেন। দ্বিতীয় আর কোনও ব্যক্তিত্বকে মাথা তুলতে দেননি। জনগণকে বুঝিয়ে দিয়েছেন নিউ সিটির ‘মালিক’ কে।
কিন্তু জিশান? এই জিশান পালচৌধুরী ছেলেটা? ওল্ড সিটি থেকে কিল গেম-এর পার্টিসিপ্যান্ট খুঁজতে গিয়ে ওকে বেছে নিয়েছিলেন শ্রীধর। ভেবেছিলেন, নানান খেলায় ছেলেটা জিতবে, কিন্তু কিল গেম পর্যন্ত পৌঁছবে না। বড় জোর পিট ফাইট পর্যন্ত যাবে। তারপর…।
