‘তোমার কোনও ভয় নেই। আমাদের অ্যাকশন ফোর্স এক্ষুনি ওখানে পৌঁছে যাচ্ছে। ডোন্ট উয়ারি, ব্রেভ বয়! ওভার অ্যান্ড আউট।’
ফোন কেটে গেল। সব কথার মানে স্পষ্ট বুঝতে না পারলেও ছেলেটা বুঝল পিস ফোর্স সামরিক পরিস্থিতির ঢঙে কাজে নেমে পড়েছে।
হলও ঠিক তাই। পিস ফোর্স সেই জরাজীর্ণ বাড়িটায় পৌঁছে গেল দশমিনিটের মধ্যেই।
আকাশ থেকে নীল-সাদা চারটে শুটার রাস্তায় নেমে এল। একইসঙ্গে কালো রঙের চারটে গাড়ি শব্দ করে ছুটে এসে তীব্রভাবে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল বৃষ্টিভেজা রাস্তায়। ডিশ অ্যানটেনা লাগানো একটা সাদা ভ্যান তার পাশাপাশি এসে থামল। তার গায়ে লেখা ‘ইমার্জেন্সি মেডিকেল ইউনিট’। সেই ভ্যানের দরজা খুলে ছ’জন মেডিক নেমে পড়ল রাস্তায়। তাদের হাতে অক্সিজেন মাস্ক, ফাইবারের স্ট্রেচার আর ‘এস. ও. এস.’ মেডিকেল কিট। তারা ব্যস্তভাবে ছুটে গেল ভাঙা বাড়িটার দিকে। কেউ একজন চিৎকার করে সবাইকে নির্দেশ দিচ্ছিল।
তারপরই অনেকগুলো হ্যালোজেন টর্চের আলোয় পিলটুদের ‘যুদ্ধক্ষেত্র’টা ভেসে গেল। মেঝেতে, দেওয়ালে, সিলিং-এ সেই উজ্জ্বল সাদা আলো অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় চলে বেড়াতে লাগল। ভারী বুটের শব্দে বাদুড় চামচিকেরা আবার সচকিত হয়ে উঠল। উড়ে বেড়াতে লাগল।
আলোর কাটাকুটি খেলার আড়াল থেকে কেউ একজন ডাকল : ‘পিলটু—।’
‘এই যে। আমি এখানে।’
কয়েকসেকেন্ডের মধ্যেই সবক’টা দেহ আর মৃতদেহ পিস ফোর্সের দখলে চলে গেল।
এরপর যা হল তা পিলটু স্বপ্নেও কখনও ভাবেনি।
শুটারে চড়ে ও আকাশপথে উড়ে চলল নিউ সিটির দিকে। নীচে, বহু নীচে, দেখা যাচ্ছে ওল্ড সিটির জরাজীর্ণ রুগ্ন চেহারা। একটা পুরোনো ঘা-এর মতো ছড়িয়ে রয়েছে শহরটা। আয়ু ফুরিয়ে আসা, বিছানায় মিশে থাকা, একটা রুগির মতো ধুকপুক করছে শহরটার হৃৎপিণ্ড। শ্রান্ত-ক্লান্ত শহরটা হাঁপাচ্ছে।
এই শহরে যদি আর ফিরতে না হয় তা হলে দারুণ হবে। সেই আশায় মনে-মনে প্রার্থনা করতে লাগল পিলটু। আর একইসঙ্গে চাপা উত্তেজনায় ওর বুকের ভেতরটা ধকধক করতে লাগল। ছলনাময়ী ভাগ্যশ্রী এখন ওর জন্য কী উপহার সাজিয়ে রেখেছে কে জানে!
শিসের শব্দ তুলে নীল সাদা রঙের শুটার আকাশপথে ছুটছিল। ছেলেটার পাশে একজন পিস ফোর্সের লোক। ঝকঝকে পোশাক দেখে মনে হয় ফোর্সের কেউকেটা একজন হবেন। আর সামনের সিটে দুজন—তার মধ্যে একজন শুটারের পাইলট।
শুটারটা স্বচ্ছ ডোমে ঢাকা। ভেতরটা এয়ারকন্ডিশনড। সিটে বসে নিউ সিটির মিনিয়েচার ছবি দেখতে পাচ্ছিল ছেলেটা। ঠিক যেন আর্কিটেক্টের তৈরি একটা ঝিনচাক শহরের মডেল। মডেল তো নয়—স্বপ্ন। যেন সেই জীবন্ত স্বপ্নকে কেউ পরম যত্নে মাটিতে বিছিয়ে দিয়েছে।
সেই স্বপ্নের দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে ছেলেটা বিলাসিতার কল্পনা করছিল। আর ওর চোখের সামনে স্বপ্নটা খুব ধীরে-ধীরে বড় হচ্ছিল, সাকার হচ্ছিল। কারণ শুটার নামতে শুরু করেছিল।
স্বপ্নের দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে ক্লান্তিতে ছেলেটা কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল।
ল্যান্ডিং জোনে শুটার ল্যান্ড করতেই ছেলেটার ঘুম ভেঙে গেল। তারপর পিস ফোর্সের লোকজন ওকে নিয়ে যা শুরু করল তাতে ছেলেটার মনে হল ও কোনও দেশের রাষ্ট্রপতি—অতিথি হয়ে নিউ সিটিতে এসেছে। এখানকার কর্মকর্তারা ওকে কোলে বসাবেন না মাথায় রাখবে ভেবে পাচ্ছেন না।
পিস ফোর্সের লোকজন আর কর্মকর্তাদের কথাবার্তা শুনে ছেলেটা বুঝতে পারল, ওকে টপমোস্ট সিকিওরিটি জোনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে একটা গোল্ডেন পেন্টহাউসে টপমোস্ট কমফোর্ট লেভেলে ওকে রাখা হবে। পিস ফোর্সের ছ’জন স্টাফ চব্বিশঘণ্টা ওর তদারকিতে থাকবে।
ছেলেটার মনে হল, স্বপ্ন যখন সত্যি হয় বোধহয় এরকম হঠাৎ করেই হয়। আর সেইজন্যই ও ব্যাপারটাকে ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না।
ঝকঝকে নতুন জামাকাপড় পরে পেন্টহাউসের বেডরুমে বিছানায় বসে ছিল ছেলেটা। ঘিয়ে রঙের সিল্কের চাদরে ঢাকা নরম বিছানা। তার ওপরে ধীরে-ধীরে হাত বুলিয়ে ও বুঝতে চাইছিল ব্যাপারটা স্বপ্ন, না বাস্তব।
বাস্তব হয়ে ওঠা স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে ছেলেটার দিন কাটতে লাগল। আর তারই মধ্যে চলতে লাগল জিজ্ঞাসাবাদ।
পিস ফোর্সের নানান স্তরের লোকজন ওর ঘরে আসতে লাগল। তারা পালা করে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ওকে প্রশ্ন করতে লাগল। সেদিন দুপুরে বলধর পাট্টাকে দেখা থেকে শুরু করে পিস ফোর্সের অফিসাররা অকুস্থলে এসে পৌঁছনো পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা ওকে বারবার বলতে হচ্ছিল।
সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, পিলটুর কথা শুনে-শুনে ওরা ওর স্টেটমেন্টের রিয়েল টাইম ভিডিয়ো সিমুলেশান তৈরি করছিল। ওর ঘরের মধ্যে কমপিউটার এবং আরও কীসব যন্ত্রপাতি এনে তিনজন লোক সিমুলেশানের কাজে ব্যস্ত ছিল। আর দুজন অফিসার পিলটুকে একের পর এক প্রশ্ন করছিল।
পিলটুর উত্তর শুনে-শুনে ওরা সিমুলেশান তৈরি করছিল, কারেকশান করছিল, পিলটুকে বারবার ওটা দেখাচ্ছিল। এইভাবে চারদিন কেটে যাওয়ার পর অডিয়ো-ভিশুয়াল সিমুলেশানটা ঠিকঠাক তৈরি হয়েছে বলে ওদের মনে হল।
পিলটু যখন ফাইনাল সিমুলেশানটা দেখল তখন ও অবাক হয়ে গেল। সেইদিনকার ঘটনাগুলো নিয়ে কেউ যেন একটা সিনেমা তৈরি করেছে।
সেই সিনেমা শুরু হল। কমপিউটারের পরদার এককোণে সময় দেখা যাচ্ছে। ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে-সঙ্গে একসেকেন্ড-একসেকেন্ড করে সময় পালটে যাচ্ছে। পরদায় ঘটনা শুরু হল। ঝাঁ-চকচকে কালো গাড়িটা মাতালের মতো ছুটে এসে রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মারল।
