সিনেমাটা দেখে অবাক হয়ে গেল পিলটু। কোথাও কোনও ভুল নেই। ও যেমন-যেমন স্টেটমেন্ট দিয়েছে, নানান প্রশ্নের উত্তরে যা-যা বলেছে, ঠিক সেই-সেই ঘটনাগুলোর চলমান ছবি এঁকে ওরা ওর চোখের সামনে সাজিয়ে দিয়েছে।
একটা আশ্চর্য ভিডিয়ো গেম দেখছিল পিলটু। মানুষগুলো একটু পুতুলের মতো লাগছিল ঠিকই, তবে বাকি সবকিছু যেন আসলের মতো। গাড়ির ব্রেক কষার শব্দ, মোটরবাইকের শব্দ, গুলির আওয়াজ—এমনকী বাদুড় আর চামচিকের ডানা ঝাপটানোর শব্দটাও ওরা আসলের মতো তৈরি করে ঠিকমতো জুড়ে দিয়েছে।
পিলটুকে নিয়ে এসব যখন চলছিল তখন বলধর পাট্টা নিউ সিটির এক্সট্রিম মেডিকেল কেয়ার ইউনিটে সেরে উঠেছিল। তার সেরে ওঠার খবর পিস ফোর্সের অফিসারদের কাছেই শুনছিল পিলটু। বলধরের গায়ে চারটে গুলি লেগেছে, কিন্তু এখন সে বিপদের আওতার বাইরে। চিফ মেডিক অন্তত তাই বলেছেন।
পিস ফোর্সের অফিসাররা বলধরের স্টেটমেন্টও নিয়েছেন। সেই স্টেটমেন্ট পিলটুর স্টেটমেন্টের সঙ্গে মিলিয়ে তবেই ফাইনাল ভিডিয়ো সিমুলেশানটা তৈরি করা হয়েছে। সেটা দেখে বলধর অ্যাপ্রুভ করেছে। সুতরাং এই ফাইনাল সিমুলেশানটাই এভিডেন্স আরকাইভে রাখা হবে।
মার্শাল বলধর পিলটুর সাহসের খুব প্রশংসা করেছে। বলেছে, ‘ও আমার স্পেশাল গেস্ট। ওর আদর যত্নে যেন কোনও ফাঁক না থাকে।’
না, কোনও ফাঁক নেই। কিন্তু সে তো মাত্র ক’দিন! তারপর, বলধরের এই রোমাঞ্চকর মামলার আঁচ মিটে গেলে, পিলটুকে নিশ্চয়ই ফিরিয়ে দেওয়া হবে ওল্ড সিটিতে—ওর আগের জায়গায়, ছেঁড়া-ফাটা পলিথিনে ছাওয়া ঝুপড়ির নীচে। তখন একদিনের জন্য সত্যি হওয়া স্বপ্নটা আবার শুধু স্বপ্ন হয়ে যাবে। আবার ওকে ভিক্ষে করতে হবে, পকেট মারতে হবে, গাড়ির পার্টস চুরি করে বিক্রি করতে হবে।
স্ক্রু-ড্রাইভারটার কথা মনে পড়ল পিলটুর। পিস ফোর্সের অফিসাররা ওটা ওকে আর ফেরত দেননি। বলেছেন, ওটা নাকি ওঁদের এভিডেন্স আরকাইভে রেখে দেওয়া হবে। সুতরাং, হাতুড়িটা সঙ্গে থাকলেও পিলটুকে নতুন একটা স্ক্রু-ডাইভার কিনতে হবে। গাড়ির ‘কাজ’ শুরু করতে গেলে ওটা কেনা দরকার।
গোল্ডেন পেন্টহাউসে বসে পিলটু যখন এসব কথা ভাবছে তখনই ও খবর পেল, বলধর পাট্টা পুরোপুরি সেরে উঠে ওর বাড়িতে ফিরে গেছে। এর সঙ্গে আরও যে-খবরটা ওকে দেওয়া হল সেটা শুনে ওর বুকের ধুকপুকুনি আচমকা বেড়ে গেল। হাতুড়ি পেটার শব্দ হতে লাগল বুকের ভেতরে।
বলধর পাট্টা ওকে ডেকে পাঠিয়েছে নিজের বাড়িতে।
আস্তানা বদলে গেল ছেলেটার।
এক একর সবুজ জমির ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক বিমূর্ত ছাঁদে তৈরি একটা তিনতলা ছোট বাড়ি। তাকে ঘিরে পার্ক, দিঘি, গাছপালা—আরও কত কী! এই বাড়িতে থাকে একজনমাত্র মানুষ। তাকে ঘিরে হুকুম তামিল করার জন্য আছে আরও বারোজন পুরুষ।
বলধর পাট্টা আর একডজন পুরুষ। পিলটু সেখানে গিয়ে মোট পুরুষের সংখ্যা চোদ্দোয় নিয়ে গেল।
আভিজাত্য আর অহঙ্কারে সাজানো একটা বিশাল মাপের ড্রইংরুমে বলধরের মুখোমুখি হল ছেলেটা। বলধরকে ভালো করে দেখল।
মেরুন রঙের ড্রেসিং গাউন পরা প্রৌঢ় কাঠামোটা টান-টান হয়ে দাঁড়িয়ে। মাথার সামনের দিকে শতকরা প্রায় চল্লিশভাগ টাক পড়ে গেছে। বাকিটা কাঁচা-পাকা পাতলা চুলে ঢাকা। চোয়াল চওড়া। দাড়ি-গোঁফ কামানো পরিষ্কার মুখে বয়েসের ভাঁজ। তবে সেইসঙ্গে রুক্ষতার ছাপও আছে। ঠোঁটজোড়া বড় বেশিরকম লালচে। ড্রেসিং গাউনের হাতার বাইরে বেরিয়ে থাকা হাতের শিরা ফুলে আছে। হাতের আঙুলগুলো যে শক্তিশালী সেটা চওড়া গাঁট আর খসখসে চামড়া থেকে আঁচ করা যায়।
পিলটু অবাক চোখে বসবার ঘরের জাঁকজমক দেখছিল। সেইসঙ্গে বিস্ময়ভরা চোখে বলধরকে দেখছিল। অগাধ ক্ষমতা এই মানুষটার। ক্ষমতার সাগরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা এক লাইটহাউস। সেই লাইটহাউসের চূড়া থেকে ক্ষমতার অবিরাম বিকিরণ ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে।
ভারী গলায় বলধর বলল, ‘পিলটু—তাই তো নাম তোমার?’
বোবা পিলটু মাথা নেড়ে জানাল, ‘হ্যাঁ।’
‘পিলটু, তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ।’ বলধর ধীরে-ধীরে বলল, ‘তা ছাড়া তোমার সাহসও কম নয়। কারণ, সেইদিনকার ঘটনার ভিডিয়ো সিমুলেশানটা আমি দেখেছি। য়ু আর রিয়েলি ব্রেভ, পিলটু। আই অ্যাম রিয়েলি প্রাউড অফ য়ু।’
শেষের ইংরেজি কথাগুলোর অর্থ ছেলেটা কিছুই বুঝতে পারছিল না। কিন্তু তবুও ও আন্দাজ করতে পারল যে, কথাগুলো প্রশংসার।
একটু থেমে বলধর পাট্টা আবার বলল, ‘তুমি আমাকে নতুন জীবন দিয়েছ, পিলটু। ওই বিপদের সময় আমি তোমাকে বলেছিলাম, তুমি যা চাও সব দেব। আজ সে-কথা আমি ভুলে যাইনি। বলধর পাট্টা একবার যা বলে তার কখনও নড়চড় হয় না।’ একটু থামল, পিলটুর কাছে এগিয়ে এসে ঝুঁকে পড়ল : ‘বলো, তুমি কী চাও। কোনওরকম সঙ্কোচ বা লজ্জা করবে না। বলো…।’
কয়েকমুহূর্ত বলধরের দিকে তাকিয়ে রইল ছেলেটা। ওর গলা কেমন শুকিয়ে যাচ্ছিল। চারপাশে তাকিয়ে ও ঘরের দেওয়ালের কারুকাজ দেখছিল, বিচিত্র আলোকসজ্জা দেখছিল, বাতাসে নাক টেনে কেমন এক সুগন্ধ টের পাচ্ছিল। আর বিস্ময়ে স্থবির হয়ে ভাবছিল, এটা পৃথিবী, না স্বর্গ?
‘বলো, বলো—লজ্জা কোরো না।’
‘আমি স্যার আপনার কাছে থাকতে চাই।’
