ওর মুখে ফোনের রঙিন আলো পড়ায় ফোনের আহত মালিক বোধহয় ওকে দেখতে পেল।
ভাঙাচোরা কাতর গলায় অন্ধকার মেঝের দিক থেকে কেউ বলে উঠল, ‘খোকা, আমাকে বাঁচাও…।’
লোকটা এখনও বেঁচে আছে!
পিলটু অবাক হল। কলটা কেটে দেওয়ার জন্য ও আন্দাজে ফোনের নানান বোতাম টিপতে লাগল। ফোনের ‘হ্যালো! হ্যালো!’টা হঠাৎই থেমে গেল।
ফোনটা এবার কণ্ঠস্বরের দিকে ফেরাল পিলটু। দেখল, গাড়ি থেকে নেমে আসা সেই সুট পরা মানুষটা। ওর কপাল মুখ সব রক্তে মাখামাখি। হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছে। ওর বুকের ওপরে উপুড় হয়ে পড়ে আছে কালো টি-শার্ট পরা একটা দেহ। সেইজন্যই সুট পরা মানুষটা ফোনটা মুখের কাছে নিয়ে ‘হ্যালো’ বলতে পারছিল না।
‘আমাকে বাঁচাও! তুমি…তুমি যা চাও তাই দেব…তাই দেব।’ কাতর অনুনয়ের সুরে প্রৌঢ় বলল।
পিলটু কী করবে ভেবে না পেয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
‘তোমার…নাম কী?’
কয়েকসেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, ‘পিলটু…।’
‘পিলটু, প্লিজ…আমাকে…আমাকে বাঁচাও। আমি নিউ সিটির পিস ফোর্সের…মার্শাল। ক্রিমিনাল রিফর্ম ডিপার্টমেন্টের মার্শাল… বলধর পাট্টা। বলধর পাট্টা। আ-আমাকে বাঁচাও। আমার…আমার…গায়ে গুলি লেগেছে। অনেকগুলো। আমাকে…বাঁচাও। প্লিজ। এখানে ফেলে…যেয়ো না। তুমি যা চাও…সব দেব। প্লিজ…।’ যন্ত্রণায় মোচড় খাওয়া কথাগুলো উচ্চারণ করতে গিয়ে মানুষটা প্রবল হাঁপাচ্ছিল। ফোনের আবছা আলোয় ওর চোখদুটো মরা মানুষের চোখের মতো লাগছিল।
কিন্তু এ কী শুনছে ছেলেটা!
বলধর পাট্টা! পিস ফোর্সের মার্শাল! চিফ! নিউ সিটিতে বলতে গেলে যার কথাই শেষ কথা! যার নামে বুকের ভেতরটা ভয়ে কেঁপে ওঠে! শিরদাঁড়া দিয়ে বরফের স্রোত নেমে যায়। গলা শুকিয়ে যায়! যার ধমকে অনেকেই প্যান্ট ভিজিয়ে ফ্যালে!
রাস্তায়-রাস্তায় বসানো অসংখ্য প্লেট টিভির দৌলতে বলধর পাট্টার কুখ্যাতির কথা পিলটুর অজানা ছিল না। ওল্ড সিটিতে সবাই বলে, বলধরের ডাকনাম হল ‘শয়তান’। বলধর হিংস্রতায় এম. এ., পিএইচ. ডি. আর নিষ্ঠুরতায় ডি. এসসি.।
সেই ‘সাক্ষাৎ যম’ অমানুষটা কাতর অসহায়ভাবে পড়ে আছে ছেলেটার পায়ের কাছে! হদ্দ ভিখারির মতো প্রাণভিক্ষা চাইছে এই কিশোরের কাছে! বলছে, ‘তুমি যা চাও তাই দেব…।’
পিলটুর শরীরে রোমাঞ্চ খেলে গেল। ও পলকে সিদ্ধান্ত নিল। ফোনটা পকেটে রাখল। তারপর ঝুঁকে পড়ে কালো টি শার্ট পরা বডিটাকে টেনে সরাতে লাগল।
কয়েকবারের চেষ্টাতেই বডিটা বলধরের শরীরের ওপর থেকে নামিয়ে দিল পিলটু। ওর দু-বগলে হাত ঢুকিয়ে টেনে ওকে সোজা করল। তারপর পিঠটা দেওয়ালে হেলান দিয়ে কোনওরকমে বসাল।
বলধর যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিল। ‘আ:! লাগছে…আস্তে…’ এসব বলছিল।
পিলটুর হাত চটচটে কীসে যেন ভিজে গেল। আঁশটে গন্ধ নাকে এল।
‘ফোনটা…ফোনটা…আমাকে দাও…।’
বলধরের মিনমিনে দুর্বল স্বর যেন বহুদূর থেকে পিলটুর কানে ভেসে এল।
ও কোনও কথা না বলে স্যাটেলাইট ফোনটা পকেট থেকে বের করে বলধরের ডানহাতে ধরিয়ে দিল।
কাঁপা আঙুলে ফোনের বোতাম টিপল বলধর। তারপর ফোনটা কানে চেপে ধরল।
মেঘ বোধহয় কিছুটা পরিষ্কার হয়েছিল। কারণ, হঠাৎই পিলটু খেয়াল করল, দিনের আলো খানিকটা বেড়ে গেছে। চামচিকে কিংবা বাদুড়ের ওড়াউড়ির শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না। শব্দ বলতে শুধু বলধর আর পিলটুর শ্বাস -প্রশ্বাসের শব্দ।
ও-প্রান্তে ফোনটা কেউ ধরতেই বলধর ক্লান্ত গলায় বলল, ‘মার্শাল পাট্টা। পিস ফোর্স। এস. ও. এস। জলদি এসো। ইমার্জেন্সি—লেভেল থ্রি। জি. পি. এস. কো-অর্ডিনেট সেভেন পয়েন্ট টু থ্রি বাই ফোর পয়েন্ট জিরো ওয়ান। ওল্ড সিটি, ব্লক নাইন। ইমার্জেন্সি—লেভেল থ্রি। এস. ও. এস.। কাম রাইট নাউ। এখানে…আমি আর পিলটু আছি। পিলটু…ওল্ড সিটির ইয়াং বয়। কাম। মেক…ইট…কুইক। সেভ মি। সেভ মি…।’
স্রেফ ইচ্ছাশক্তির জোরে ফোনে একটানা কথা বলছিল বলধর। তারপর হঠাৎই চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো ওর কথা থেমে গেল। হাত থেকে ফোনটা খসে পড়ল। শরীরটা প্রায় চল্লিশ ডিগ্রি কাত হয়ে গেল মেঝের দিকে।
পিলটু তাড়াতাড়ি বসে পড়ল ওর হেলে পড়া শরীরের কাছে। ওকে আরও হেলিয়ে দিয়ে ওর রক্তাক্ত মাথাটা প্রায় কোলে নিয়ে নিল। বেশ বুঝতে পারল ওর জামা-প্যান্টে রক্ত মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হোক। মার্শালের মাথা কোলে নিতে পারে ক’জন? মার্শাল ওকে বলেছে, ও যা চায় সব দেবে। সব।
বলধরের মাথা কোলে নিয়ে সেই ‘সব’-এর আশায় বসে রইল পিলটু। ওল্ড সিটিতে অনেক হয়েছে। এবার নিউ সিটির স্বপ্নকে ছুঁতে চায় ও।
পিলটু বলধরকে ডাকল, ‘স্যার! স্যার!’
কিন্তু কোনও সাড়া পেল না।
বলধরকে নাড়া দিল পিলটু। তাতে বলধরের শরীরটা যেভাবে নড়ল পিলটু আন্দাজ করল মার্শাল বোধহয় অজ্ঞান হয়ে গেছে।
এমনসময় মেঝেতে পড়ে থাকা ফোনটা আবার বাজতে শুরু করল।
ফোনটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ছেলেটা। কে ফোন করছে মার্শালকে?
ফোনটা তুলে নিল। আন্দাজ করে কল রিসিভ করার বোতামটা টিপল। তারপর ফোনে ‘হ্যালো’ বলল।
ওপাশ থেকে একটা ভারি গলা শোনা গেল : ‘কে, পিলটু?’
থতমত খেয়ে ছেলেটা বলল, ‘হ্যাঁ—।’
‘স্যার তোমার কাছে?’
‘হ্যাঁ।’ কথা বলতে গিয়ে পিলটুর গলা কেঁপে গেল। ও বুঝতে পারল পিস ফোর্সের কেউ ওর সঙ্গে কথা বলছে।
