দ্বিতীয় কিলারের টর্চের আলো গিয়ে পড়েছিল তার সঙ্গীর ওপরে। সে দেখতে পেল দুটো শরীর জট পাকিয়ে পড়ে আছে। ডান পকেটে হাত ঢুকিয়ে সে একটা ছোটমাপের রিভলভার বের করে নিল। তারপর এক-পা-এক-পা করে দুটো শিথিল শরীরের দিকে এগোতে লাগল।
পিলটু সবকিছুই লক্ষ করেছে। ওর দমবন্ধ হয়ে আসছিল। বুকের ভেতরে যেন হাতুড়ি পড়ছিল। কী এক অজানা ভয়ে ও পকেট থেকে স্ক্রু-ড্রাইভারটা বের করে শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। তারপর ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করতে লাগল।
হঠাৎই উড়ন্ত দুটো চামচিকে ওর মুখে এসে ধাক্কা মারল। নিজের অজান্তেই ও হাতের ঝটকা দিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে লাফিয়ে উঠল। মুখ দিয়ে ছোট্ট একটুকরো চিৎকারও বেরিয়ে গেল।
সঙ্গে-সঙ্গে টর্চের আলো নিভে গেছে। দ্বিতীয় খুনিকে ছেলেটা আর দেখতে পাচ্ছিল না। হয়তো ওর চিৎকার শুনে অন্ধকারের ভাঁজে গা-ঢাকা দিয়েছে।
পিলটু এখন কী করবে? এখানে কতক্ষণ অপেক্ষা করবে? টর্চ নিভিয়ে লোকটা গেল কোথায়? কোথায় গেল?
দ্বিতীয় খুনির সঙ্গে পিলটুর দূরত্ব ছিল মাত্র দশ-বারো ফুট। সুতরাং পিলটুর চিৎকার ও স্পষ্টই শুনতে পেয়েছে। আর সেইজন্যই আলো নিভিয়ে দিয়েছে। যাতে অন্ধকারে অচেনা শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলাটা বেশ জটিল এবং কঠিন হয়ে ওঠে।
পিলটুর বুকের ভেতরে বিগ ড্রাম বাজাচ্ছিল কেউ। নিশাচর প্রাণীর মতো অন্ধকারে চোখ মেলে ও প্রাণপণে দেখতে চেষ্টা করছিল। বাড়িটার বোটকা দুর্গন্ধ ওর নাকে একেবারে চেপে বসছিল। চঞ্চল চামচিকেগুলো ওদের ওড়াউড়ি এখনও থামায়নি।
বাড়িটার সদরের দিকে নজর দিল পিলটু। সেদিকে তাকালে দরজার হাঁ করা ফ্রেমের মাপে দিনের মেঘলা আলো দেখা যাচ্ছে। পিলটু কি এখন সেদিক লক্ষ্য করে দৌড় দেবে? পকেট বা লকেট হাতানোর মতলব এখন মুলতুবি থাক। আগে নিজের প্রাণটা নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গিয়ে সুরক্ষিত করা দরকার।
পিলটু খুব সাবধানে উঠে দাঁড়াল। এবারে শুরু হবে ওর বিপজ্জনক মরণছুট। ওয়ান—টু—থ্রি—।
কিন্তু ছুট শুরু হওয়ার আগেই ওর মুখে আচমকা টর্চের আলো এসে পড়ল। টর্চ হাতে দ্বিতীয় খুনি ওর খুব কাছেই দাঁড়িয়ে। সিগারেট আর মদের গন্ধ পেল পিলটু।
‘কে তুই?’ জড়ানো গলায় খুনি ওকে জিগ্যেস করল।
সঙ্গে-সঙ্গে পিলটু স্ক্রু-ড্রাইভারটা খুনির পেটে ঢুকিয়ে দিল।
পিলটু কখনও মাখন খায়নি। মাখনের মধ্যে ছুরি ঢুকিয়ে দিলে ঠিক কীরকম অনুভূতি হয় ও জানে না। কিন্তু তবুও ওর মনে হল, ব্যাপারটা যেন অনেকটা সেইরকম।
একইসঙ্গে পিলটু ভয়ার্ত পশুর মতো তীব্র চিৎকার করে উঠেছে এবং লোকটাকে প্রচণ্ড জোরে এক ধাক্কা মেরেছে।
অন্ধকারে ইট-কাঠের ওপরে উলটে পড়েছে খুনি। হাত থেকে টর্চ ছিটকে গেছে। ছোট পিস্তল থেকে ‘গুড়ুম’ শব্দ করে একটা গুলি ছুটে গেছে ঘরের ভাঙাচোরা সিলিং-এর দিকে।
প্রচণ্ড ভয় থেকে মানুষের মধ্যে একটা কোণঠাসা বেপরোয়া ব্যাপার জেগে ওঠে। চোদ্দোবছরের ছেলেটারও তাই হল। ও হুড়মুড় করে পৌঁছে গেল মেঝেতে পড়ে থাকা টর্চটার কাছে। ওটা তুলে নিয়ে হাতুড়ির মতো বসিয়ে দিল খুনির মাথায়। সংঘর্ষের ঝটকায় টর্চ নিভে গেল।
স্ক্রু-ড্রাইভার পেটে বেঁধা অবস্থাতেই লোকটা উঠে বসার চেষ্টা করছিল, কিন্তু টর্চের দ্বিতীয় আঘাত ওকে আবার মাটিতে পেড়ে ফেলল। একটা চাপা গোঙানি বেরিয়ে এল লোকটার মুখ দিয়ে।
পিলটু বড়-বড় শ্বাস ফেলে হাঁপাচ্ছিল। ওর এবার মনে হল পালানো দরকার। কারণ, এতবার গুলির শব্দ হয়েছে, চিৎকার-চেঁচামেচি হয়েছে যে, লোকজন এসে পড়তে পারে। বরং একটু পরে ও ঘুরেফিরে এখানে আবার আসবে। তখনও যদি বডিগুলো বেওয়ারিশভাবে পড়ে থাকে তা হলে চটপট ওর কাজ সেরে নেবে।
হাতের চর্চটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে পা বাড়াল। পনেরো-কুড়ি ফুট দূরেই হাঁ-করা সদর দরজা। সেই ফাঁক দিয়ে আলো আর বৃষ্টি দেখা যাচ্ছে।
মেঝেতে পড়ে থাকা ইট-পাথর আর কাঠ ডিঙিয়ে ছেলেটা চার-ছ’পা এগোতেই মোবাইল ফোনের সুরেলা বাজনা শোনা গেল।
বাজনার সুরটা ছেলেটার চেনা। প্রথম লোকটার স্যাটেলাইট ফোন।
পিছন ফিরে তাকাল। দূরে অন্ধকারে রঙিন আলো জ্বলছে-নিভছে। কেউ ফোন করেছে লোকটাকে।
বিদ্যুৎঝলকের মতো একটা লোভ ঝলসে উঠল মাথায়। পরে যখন কাজ সারতে আসবে, আসবে। এখন স্যাটেলাইট ফোনটা নিয়ে চম্পট দিলে কেমন হয়?
লোভ আর আশঙ্কার লড়াইয়ে লোভ জিতে গেল।
পিলটু ঘুরে দাঁড়াল। পায়ে-পায়ে ফিরে চলল স্যাটেলাইট ফোনটার দিকে।
যখন ও ফোনের খুব কাছে পৌঁছে গেল তখনও ফোনটা বাজছিল। ফোনের আলোয় দেখল দুটো কাহিল শরীর এখনও জট পাকিয়ে পড়ে আছে। তারই একটার হাতের মুঠোয় ফোনটা ধরা।
ঝুঁকে পড়ে ফোনটার দিকে হাত বাড়াতে যাবে অমনি বোতাম টিপে কলটা রিসিভ করল কেউ। গোঙানির স্বরে কেউ ‘হ্যালো! হ্যালো!’ বলতে লাগল।
আবছা আঁধারে দৃশ্যটা বড় অদ্ভুত লাগছিল। জটপাকানো শরীর দুটোর দিকে তাকিয়ে পিলটু ‘হ্যালো’ বলা মুখটাকে খুঁজে পাচ্ছিল না। অথচ জটের বাইরে বেরিয়ে থাকা একটা হাত কলটা রিসিভ করেছে।
ফোন থেকেও যে কেউ ‘হ্যালো! হ্যালো!’ বলছে সেটাও ক্ষীণভাবে পিলটুর কানে আসছিল। ও কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না।
কয়েকসেকেন্ডের দ্বিধা কাটিয়ে ও ফোনটা দুর্বল হাতের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিল।
