এমনসময় বিকট গর্জন তুলে একটা হাই-পাওয়ার মোটরবাইক ছুটে এল। বাইকটা ধুলো-কাদা মাখা। তার সামনে-পিছনে অনেকগুলো লাইট লাগানো। বাইকে বসে আছে দুজন লোক। মাথায় কালো হেলমেট, চোখে কালো সানগ্লাস। গায়ে কালো টি-শার্ট, পায়ে ফেডেড জিনস। পিছনে বসে থাকা লোকটার হাতে একটা লম্বা নলওয়ালা পিস্তল।
সুট-বুট পরা লোকটা টলতে-টলতে ছুটে গেল একটা ধসে পড়া বাড়ির দিকে। ততক্ষণে বাইকটাকে দাঁড় করিয়ে দুজন লোক রাস্তায় নেমে পড়েছে এবং ছুটে পালানো লোকটাকে তাক করে পিস্তলওয়ালা পরপর দুবার ট্রিগার টিপেছে।
‘সুঁই—’ করে দুবার শব্দ হল। পিলটু বুঝল পিস্তলে সাইলেন্সার লাগানো আছে।
ছুটে পালানো লোকটার কপাল ভালো—ওর গায়ে গুলি লাগল না। ও কপালে রুমাল চেপে ভাঙাচোরা বাড়িটার ভেতরে ঢুকে গেল। আর বাইকের পাবলিক দুজন সানগ্লাস হেলমেট সব ছুড়ে ফেলে দিয়ে শিকারকে তাড়া করল।
পিলটু তখন নিজের মতো করে অঙ্ক কষতে শুরু করল।
যদি ওই পোড়ো বাড়িটার ভেতরে গোলাগুলি চলে তা হলে দু-একটা লাশ পড়ার সম্ভাবনা আছে। তারপর সব গন্ডগোল মিটে গেলে, আততায়ীরা চলে গেলে, লাশ অথবা লাশগুলো চলে আসবে পিলটুর দখলে। তখন তাদের পকেট সাফ করা যাবে। আর শরীরে আংটি, তাবিজ, লকেট যা কিছু পাবে সেগুলোও হাতিয়ে নেওয়া যাবে।
সুতরাং তিনজন মানুষ বাড়িটায় ঢুকে পড়ার পর ছেলেটাও চোরের মতো পা টিপে-টিপে ঢুকে পড়ল।
ভেতরটা অন্ধকার। দেওয়ালের ধসে পড়া ফাঁকফোকর দিয়ে যেটুকু দিনের আলো ঠিকরে আসছে সেটাই একমাত্র আলো। মেঝেতে রাজ্যের ধুলো আর রাবিশ। তারই ওপরে ছড়িয়ে পড়ে আছে লোহার রড, কাঠের টুকরো। সিলিং-এর কাছাকাছি একটা বড় মাপের মাকড়সার জালও চোখে পড়ল।
বাড়িটার ভেতরে পুরোনো দুর্গন্ধ। ওরা চারজন ঢুকে পড়ায় যে-শব্দ-টব্দ হয়েছে তাতে লুকিয়ে থাকা বাদুড় আর চামচিকের দল ওড়াওড়ি শুরু করে দিয়েছে। দেখতে না পেলেও ওদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল।
যে-জায়গাটায় ওরা ঢুকেছে সেটা এককালে বোধহয় ঘর-টর কিছু ছিল। এখন ঘরের দেওয়ালগুলো প্রায় না থাকায় জায়গাটাকে বড়মাপের গোডাউন বা ফ্যাক্টরির শেড বলে মনে হচ্ছিল।
পিলটু খুব সাবধানে পা ফেলে অন্ধকারের আড়ালে-আড়ালে এগোচ্ছিল। তারপর একটা ভাঙা দেওয়ালের পিছনে গিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বসে পড়ল। চোরা নজরে উঁকি মেরে বাকি তিনজনকে খুঁজতে লাগল।
আধো-অন্ধকারে চোখ সয়ে আসতেই ওদের দেখতে পেল।
কাছাকাছি আর-একটা ভাঙা দেওয়ালের আড়ালে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে প্রৌঢ় মানুষটি। ওর মুখে যে-সামান্য আলোর আভা দেখা যাচ্ছে তাতে পিলটু বুঝল লোকটা এখনও ফোনের বোতাম টিপে কাউকে ধরার চেষ্টা করছে. আর একইসঙ্গে হাঁ করে হাঁপাচ্ছে।
কিলার দুজন খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে। নিজেদের মধ্যে ইশারা করছে, পা টিপে-টিপে জায়গা বদল করছে, ইট-কাঠ-লোহা কিছু পায়ে ঠেকলেই সেদিকে না তাকিয়ে লাথি মেরে সরিয়ে দিচ্ছে। তাতে যে শব্দ হচ্ছে তা নিয়ে ওদের কোনও মাথাব্যথা নেই।
পিলটুর চোখের সামনে ইঁদুর-বেড়াল খেলা চলতে লাগল।
হঠাৎই একটা আলো জ্বলে উঠল। আলোছায়ামাখা পোড়ো ঘরের এখানে-সেখানে একটা হলদে আলোর বৃত্ত ঘুরে বেড়াতে লাগল।
কিলারদের কেউ টর্চ জ্বেলেছে।
দেওয়াল থেকে ঠিকরে আসা আলোর আভায় দুজন কিলারকেই দেখতে পেল পিলটু।
প্রথমজন পিস্তল উঁচিয়ে সাবধানে পা ফেলে উঁকিঝুঁকি মেরে শিকারকে খুঁজছে। আর দ্বিতীয়জন বাঁ-হাতে একটা টর্চ ধরে রয়েছে।
পিলটু নিজেকে অন্ধকার খাঁজে আরও মিশিয়ে দিতে চাইল। ওর একটু-একটু যে ভয় করছিল না তা নয়। ও টের পাচ্ছিল, ওর হাত-পায়ের পেশি দপদপ করছে, কাঁপছে। কিন্তু এখন তো পালিয়ে যাওয়া যাবে না! ওকে দেখামাত্রই ওরা গুলি করবে। কারণ, খুনের সাক্ষী না রাখাটাই দস্তুর।
আচমকা মোবাইল ফোনের সুরেলা রিং টোন শোনা গেল।
একটা ধসে পড়া দেওয়ালের পিছনে আলোর আভা চোখে পড়ল। জ্বলছে-নিভছে। সেই আভায় শূন্যে ভেসে থাকা একটা মুখের আদলও দেখা গেল।
প্রথম লোকটার স্যাটেলাইট ফোন।
লোকটা বোধহয় বোতাম টিপে ফোন কেটে দিল। কারণ, রিং টোনটা হঠাৎ থেমে গেল। আর ফোনের আলোটাও হারিয়ে গেল। হয়তো ফোনের আলো চাপা দিতে ফোনটাকে পোশাকের আড়ালে কোথাও চটপট লুকিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু ততক্ষণে শব্দ এবং আলো লক্ষ্য করে পিস্তলের গুলি ছুটে গেছে। একবার নয়—অন্তত চারবার। চাপা ‘সুঁই-সুঁই—’ শব্দ হিসেব করে পিলটুর অন্তত তাই মনে হল।
একইসঙ্গে যন্ত্রণার আর্তনাদ শোনা গেল।
শিকারের গায়ে গুলি লেগেছে।
কিলার দুজন নিজেদের মধ্যে আঙুল তুলে ইশারা করল। পিস্তল হাতে লোকটা লম্বা-লম্বা পা ফেলে রাবিশ, লোহা, কাঠ ডিঙিয়ে আহত শিকারের দিকে ছুটে গেল। ভাঙা দেওয়ালের পিছনে গিয়ে শিকারের ওপরে ঝুঁকে পড়ল।
ঠিক তখনই রিভলভারের গুলির শব্দে গোটা বাড়িটা থরথর করে কেঁপে উঠল। পরপর দুবার।
সঙ্গে-সঙ্গে বাড়িটায় যেন হইচই শুরু হয়ে গেল।
অন্ধকারে আস্তানা গেড়ে থাকা চামচিকের ঝাঁক মিহি কিচকিচ শব্দ করে উড়তে শুরু করল। বাদুড়ের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ পাওয়া গেল। টর্চের আলোয় বেশ কয়েকটা ছটফটে উড়ন্ত শরীর দেখা গেল। একবার যাচ্ছে, একবার আসছে।
