ঘড়ি দেখল। আর তিন কি চার ঘণ্টা। তারপরই আঁধারের ছায়া নামবে আকাশে।
ঠিক তখনই মোটরবাইকের শব্দ শুনতে পেল জিশান। শব্দটা ভয়ংকর রকমের কাছাকাছি।
অবাক হয়ে তাড়াতাড়ি ট্র্যাকার দেখল। না:, কিলার দুজন তো বেশ দূরে। তা ছাড়া ওরা রয়েছে একেবারে অন্যদিকে।
জিশান গাছের আড়ালে-আড়ালে শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে চলল। ডানহাতে তুলে নিল মিসাইল গান। জলে ভিজে গেলেও অস্ত্রটা দিব্যি ঠিকঠাক আছে। কারণ, এর বুলেটগুলোর প্রোপালসিভ ফোর্স বারুদের বদলে নিউক্লিয়ার পাওয়ার থেকে তৈরি হয়।
খানিকটা পথ পেরোতেই গাছের ফাঁক দিয়ে মোটরবাইকটাকে দেখতে পেল জিশান। কালো আর হলদে রঙের গাড়িটার ওপরে সওয়ার হয়ে রয়েছে একজন মাঝবয়েসি ভদ্রলোক। মোটাসোটা। মাথায় টাক। গালে চাপদাড়ি। গায়ে হালকা নীল রঙের ফুল স্লিভ শার্ট আর গাঢ় নীল জিনস। মোটরবাইক দাঁড় করিয়ে জঙ্গলের এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, উঁকিঝুঁকি মারছে।
আড়াল থেকে লোকটিকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
কে এই লোকটা? কিলার অপাশির রিপ্লেসমেন্ট কিলার? শ্রীধরের নতুন সারপ্রাইজ?
না:, সেরকম মনে হচ্ছে না। তা ছাড়া লোকটির সঙ্গে কোনওরকম অস্ত্রশস্ত্র আছে বলে ঠাহর হচ্ছে না।
গাছের আড়াল থেকে প্রকাণ্ড এক লাফ দিল জিশান। মাটিতে একবার পাক খেয়ে বলের মতো গড়িয়ে লোকটির কাছে পৌঁছে গেল। বাঁধন ছেড়া গোটানো স্প্রিং-এর মতো ছিটকে সোজা হয়ে দাঁড়াল এবং মিসাইল গানের লম্বা নলটা লোকটার মাথার পিছনে ঠেকাল। থেমে-থেমে বলল, ‘ট্রিগার টেপামাত্রই তোমার কপাল ফুঁড়ে গুলি বেরিয়ে চলে যাবে…।’
লোকটি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল, ‘জিশান ভাইয়া, ম্যায় তেরেকো হেলপ করনেকো আয়া। তেরে লিয়ে টিভি লায়া…।’
কথাটা শোনামাত্রই জিশান ব্যাপারটা বুঝতে পারল। লোকটা লাইভ টেলিকাস্ট থেকে জানতে পেরেছে, জিশানের টিভি অকেজো হয়ে গেছে। তাই ওর জন্য টিভি নিয়ে এসেছে।
বাইকের কেরিয়ার থেকে একটা ছোট টিভি বের করল চাপদাড়ি লোকটা। জিশানকে দিল। জিশান ওটা তাড়াতাড়ি রুকস্যাকে ঢুকিয়ে নিল।
কিন্তু লোকটা জিশানকে খুঁজে পেল কী করে?
এই প্রশ্নের উত্তরে লোকটা হিন্দিতে যা বলল, তার সারাংশ হল এই :
লাইভ টেলিকাস্টে জিশানের টিভির সমস্যা জানার পর গেম সিটির ‘মক’ সিটিজেনরা খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন একটা বাড়িতে জড়ো হয়ে জিশানকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বাইশ জন সিটিজেন বাইশটা মোটরবাইকে চড়ে বসে। প্রত্যেকের সঙ্গে একটা করে টিভি। ওরা ঠিক করে যে, পুরো গেম সিটি চষে বেড়িয়ে যে করে হোক জিশানকে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর বাইশজনের মধ্যে যে প্রথমে জিশানের দেখা পাবে, সে ওর হাতে কালার টিভিটা তুলে দেবে।
লোকটির নাম রউফ লালা। রউফ সবার আগে জিশানকে খুঁজে পেয়েছে বলে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করছে। যে-বাইশজন জিশানের খোঁজে বাইক নিয়ে বিপজ্জনক অভিযানে বেরিয়ে পড়েছে সুপারগেমস কর্পোরেশন ইতিমধ্যেই তাদের জন্য কুড়ি হাজার টাকা করে বোনাস পুরস্কার ঘোষণা করেছে। আর রউফ যেহেতু জিশানের দেখা পেয়েছে, ওর হাতে টিভিটা দিতে পেরেছে, তাতে মনে হয় রউফের জন্য আরও উঁচুদরের বোনাস পুরস্কার ঘোষণা করা হবে।
রউফ লালা জিশানের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল। হাতজোড় করে নমস্কারের ভঙ্গি করল : ‘জিশান ভাইয়া, ম্যাঁয় বহত লাকি হুঁ। কিঁউ কে তেরে সাথ আচানক মেরা সবসে পহেলে ভেট হো গিয়া…।’
এমন সময় গাছের পাতায় আওয়াজ তুলে একটা বড়সড় ইটের টুকরো অথবা পাথর ওদের কাছ থেকে খানিকটা দূরে এসে পড়ল। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ। এবং কয়েকটা গাছে আগুন ধরে গেল। শুরু হল পাখপাখালি আর নানান প্রাণীর চিৎকার।
জিশানের মনে হল, এটা বোধহয় হাই-এনার্জি রকেট লঞ্চারের কীর্তি। ও রউফকে কিছু বলে ওঠার আগেই রউফ বলল, ‘ডেঞ্জার, জিশান ভাইয়া! জলদি! তু মেরা বাইক লেকে জলদি নিকল যা। মেরা ফিকর মত কর…।’
পলকে তাই হল। জিশান রউফের বাইকে চড়ে এঁকেবেঁকে রওনা দিল। আর রউফ একটা গাছের গুঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে জিশানের চলে যাওয়া দেখতে লাগল। দেখতে-দেখতে বিড়বিড় করে বলল, ‘সরফরোশি কি তমন্না অব হামারে দিল মে হ্যায়/দেখনা হ্যায় জোর কিতনা বাজু-এ কাতিল মে হ্যায়…।’
আগুন এর মধ্যেই বড়সড় চেহারা নিয়েছে। রউফ সতর্কভাবে চারপাশে তাকাল। গাছের আড়ালে-আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ও ফেরার পথ খুঁজতে লাগল।
কয়েক পা যেতে না যেতেই কী একটা যেন আচমকা ছুটে এসে ওর বুকে ভীষণ জোরে ধাক্কা মারল। পিছনদিকে ছিটকে পড়ার সময় ও অবাক হয়ে দেখল, ওর বুকে হঠাৎ করে একটা প্রকাণ্ড গর্ত গজিয়ে উঠেছে। গর্তের ভেতরটা টকটকে লাল।
রউফ লালা মারা যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ওর সবচেয়ে প্রিয় নামটা ধরে চিৎকার করে উঠল : ‘আ—ল—লা—আ…আ…আ…!’
ওর মুখ দিয়ে শব্দ আর রক্ত একইসঙ্গে বেরিয়ে এল।
ঠিক তখনই দূরের একটা পিপুল গাছের আড়াল থেকে কিলার প্রাোটনের মুখটা দেখা গেল। চোখে আইগিয়ার থাকায় চোখ দেখা যাচ্ছে না। তবে ওর ঠোটের কোণে এক চিলতে হাসি নজরে পড়ছে।
•
জঙ্গল পেরিয়ে জিশান আবার রাস্তায় নেমে পড়ল। কিছুক্ষণ ধরেই ও বাতাসে পোড়া গন্ধ পাচ্ছিল। জঙ্গল পুড়ছে। এই আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা জঙ্গলকে না শেষ করে দেয়!
