শুধু যে ভয়েস কল তা নয়। তার সঙ্গে ঝাঁকে-ঝাঁকে ই-মেল আর ভিডিয়ো কল। কন্ট্রোল রুমের সব কর্মীর একবারে পাগল হওয়ার জোগাড়।
বেগতিক দেখে কন্ট্রোল রুমের চিফ অফিসার সিন্ডিকেট বিল্ডিং-এ শ্রীধর পাট্টাকে ফোন করলেন।
সেখানে শ্রীধরের তখন প্রায় একই অবস্থা। ই-মেল আর ভিডিয়ো কলের সুনামিতে একেবারে খাবি খাচ্ছেন। সবাই একই দাবি জানাচ্ছে : ‘জিশানকে এক্ষুনি অপটিক্যাল ট্যাবলেট দিন। কিল গেমের থ্রিল আর স্ট্যান্ডার্ড নষ্ট করবেন না।’ অসংখ্য ই-মেল আর কলের মধ্যে কেউ-কেউ শ্রীধরকে দু-চারটে বাজে কথাও বলেছে। কিন্তু এই চাপের সময়ে সেইসব নচ্ছার মানুষগুলোকে লোকেট করে শায়েস্তা করা অসম্ভব। তবে শ্রীধর অবাক হয়ে মানুষগুলোর মাথাচাড়া দেওয়া স্পর্ধার কথা ভাবছিলেন। জিশান ছেলেটা নিউ সিটির সিটিজেনদের স্পর্ধা উসকে দিয়েছে। জিশানের জনপ্রিয়তার যে এরকম মাশুল দিতে হবে সেটা শ্রীধর পাট্টা ভাবেননি।
শ্রীধরের একটা বড় গুণ হচ্ছে, পরিস্থিতি আঁচ করে তিনি খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এখনও তাই নিলেন। স্যাটেলাইট ফোন তুলে পরপর তিনজন কর্তাকে ফোন করলেন। চটপট কতকগুলো ইনস্ট্রাকশন দিলেন। তারপর ফোন পকেটে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
অন্যান্য কিল গেমে কখনও এরকম ব্যাপার হয়নি। শ্রীধরের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। যাক, এখনকার মতো তো কেসটাকে সামলে নেওয়া গেছে। জিশানের দাবি তিনি মেনে নিয়েছেন। জিশানের জন্য নতুন একটা স্যাটেলাইট ফোন আর অপটিক্যাল ট্যাবলেট কাম ট্র্যাকার নিয়ে একটা শুটার রওনা হচ্ছে। তাও আবার একটা ট্যাবলেট নয়—দু-দুটো ট্যাবলেট। কারণ, এই মুহূর্তে পাবলিক আনরেস্ট শুরু হয়ে গেলে কিল গেমের তেরোটা বেজে যাবে। হাজার-হাজার লক্ষ-লক্ষ কোটি টাকার লোকসান হয়ে যাবে।
শ্রীধর হাতঘড়ির দিকে তাকালেন। তাঁর ডায়রেক্টিভ পাওয়ামাত্র সিন্ডিকেট বিল্ডিং-এর ছাদ থেকে শুটার রওনা হয়ে গেছে। দুটো ফ্যালকন হেলিকপ্টার অনেকক্ষণ ধরেই গেম সিটির ওপরে কড়া নজরদারির কাজ চালাচ্ছে। ওদের সঙ্গে শুটারের সিকিওরিটি অফিসার ওয়াকিটকিতে কথা বলে নেবে। জিশানের এগজ্যাক্ট লোকেশন কো-অর্ডিনেট জেনে নেবে।
টেনশনে ঘরের মধ্যে পায়চারি শুরু করে দিলেন। দু-হাত মুঠো করলেন, খুললেন। পরপর কয়েকবার। তারপর ভাবলেন, শুধু তো আজকের রাতটা! কাল সকালে জিশান থাকবে কি না ঠিক নেই। তারপর ধীরেসুস্থে পাবলিক আনরেস্ট প্রবলেমটার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করবেন।
পকেট থেকে ফোন বের করলেন শ্রীধর। জিশানের নম্বর লাগালেন। খেয়াল করলেন, ওঁর আঙুলগুলো অল্প-অল্প কাঁপছে।
‘জিশান!’
উত্তরে কয়েক সেকেন্ড ঘড়ঘড় শব্দ শুনতে পেলেন। সেই আওয়াজটা কমতেই প্রায় চেঁচিয়ে বললেন, ‘জিশান! তোমার অপটিক্যাল ট্যাবলেট শুটারে করে রওনা হয়ে গেছে। একটা নয় দুটো। তার সঙ্গে একটা নতুন স্যাটেলাইট ফোন। ডোন্ট উয়ারি…।’
ও-প্রান্তে জিশানের হাসির শব্দ শোনা গেল। হয়তো জিশানের হ্যান্ডসেটের সমস্যার জন্য শব্দটা খুব চাপা শোনাল। হাসির শেষে উনতিরিশ বছরের লড়াকু ছেলেটা যে-ভঙ্গিতে ‘থ্যাংক…য়ু।’ কথাটা উচ্চারণ করল তাতে স্পষ্ট বোঝা গেল, কথাটার ওপরে ব্যঙ্গের নুন-মরিচ বেশ ভালো করেই ছেটানো রয়েছে।
•
জিশানের বাঁ-হাতে লাগানো মাইক্রোইলেকট্রনিক ট্রান্সমিটারের সিগন্যাল ট্র্যাক করে শুটারটা খুব সহজেই জিশানকে খুঁজে পেল। ওর বেশ কাছাকাছি একটা ছোট্ট মাপের ফাঁকা জায়গায় আকাশযানটা শিস দিয়ে ভারটিক্যালি ল্যান্ড করল। জিশান সেদিকে এগিয়ে গেল।
অফিসারটির সঙ্গে ওর কোনও কথা হল না—শুধু জিনিস বিনিময় হল। ভেজা রুকস্যাক, বিকল অপটিক্যাল ট্যাবলেট আর স্যাটেলাইট ফোন চলে গেল শুটারে। আর শুটার থেকে পাওয়া গেল নতুন রুকস্যাক—যার ভেতরে রয়েছে একজোড়া নতুন অপটিক্যাল ট্যাবলেট আর স্যাটেলাইট ফোন।
শুটারটা শূন্যে উঠে পড়তেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ক্যামেরার লেন্সকে আড়াল করে সিকিওরিটি অফিসার জিশানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে মাথা নেড়ে চোখ মারল। যার অর্থ একটাই : ‘লড়ে যাও, ভাই।’
জিশানের শরীরে নতুন শক্তি ঝলসে উঠল। ও জঙ্গলের গভীরে ছুট লাগাল। ছুটতে-ছুটতেই অপটিক্যাল ট্যাবলেটের লাল চৌকো বোতামটা টিপল। ফুড ম্যাপ ফুটে উঠল পরদায়। খাবার চাই, খাবার। জিশানের পাগলের মতো খিদে পাচ্ছে।
একটুও সময় নষ্ট না করে নিয়ারেস্ট ফুড পয়েন্টের দিকে ছুটল। মাটি খুঁড়ে খাবারের বাক্স বের করে ফেলল চটপট।
খেতে-খেতে জিশানের মনে হল, খিদের শক্তি অন্যান্য অনেক শক্তির চেয়ে জোরালো।
একটু পরে খাওয়া প্রায় শেষ করে ট্র্যাকারে দুজন কিলারের পজিশন দেখল। মোটামুটি দূরে রয়েছে ওরা। তা ছাড়া ওরা সংখ্যায় একজন কমে যাওয়ায় ‘ত্রিভুজ’ ফাঁদে জিশানকে আর ফেলতে পারবে না। ওদের কাছ থেকে দূরত্ব বাড়ানোর জন্য জিশান জঙ্গলের আরও গভীরে ঢুকতে লাগল। তখনও ওর চোয়াল নড়ছে—খাওয়া তখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
এদিকটা শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। সূর্যের আলো ভেতরে প্রায় ঢুকতেই পারছে না। শুধু গাছের পাতা থেকে ঠিকরে আসা অথবা ঈষদচ্ছ পাতা ভেদ করে আসা মোলায়েম এক আলো চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে। কখনও-কখনও পশু-পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। ঘুঘুর ডাকও শুনতে পেল জিশান। ডাকটার মধ্যে কেমন যেন দুপুর-দুপুর গন্ধ।
