ও রউফ লালার কথা ভাবছিল। হাসতে-হাসতে ঝুঁকি নেওয়া এক আশ্চর্য মানুষ! জিশানকে একবার সামনাসামনি দেখতে পেয়েই যে-মানুষটা নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতে পারে। ওর ‘তুই-তুই’ সম্বোধনের মধ্যেও কোথায় যেন একটা ভালোবাসার, আন্তরিকতার, টান ছিল।
ওই ভাগ্যবান মানুষটা ভালো থাকুক। মনে-মনে বলল জিশান। তারপর রাস্তা ধরে বাইক ছোটাল।
খাঁ-খাঁ গেম সিটির সব জায়গা যেন একইরকম। ধুধু পথঘাট। কোথাও খোলা মাঠ, কোথাও গাছপালা জঙ্গল। আবার কোথাও থোকা-থোকা ফুলের মতো দশ-বিশটা বাড়ি। কখনও চোখে পড়ছে পাথুরে পাহাড়, কখনও-বা নদী।
শহরটায় সব আছে, শুধু প্রাণ নেই। নিউ সিটির অবস্থাটাও যেন অনেকটা তাই। শুধু অল্প কিছু মানুষের বুকের ভেতরে সত্যিকারের মানুষ রয়েছে।
জিশান ভীষণ জোরে বাইক চালাচ্ছিল। কখনও রাস্তায়, কখনও খোলা মাঠের ওপর দিয়ে, কখনও গেম সিটির সিটিজেনদের বাড়ির পাশ দিয়ে, কখনও টিলার ওপর দিয়ে, কখনও-বা ফ্লাই ওভারের ওপর দিয়ে। তবে পথ চলার ফাঁকে-ফাঁকে ও থামছিল। ফুড ম্যাপ দেখছিল, ট্র্যাকার দেখছিল, টিভি দেখছিল। আর খিদে পেলে খেয়ে নিচ্ছিল।
টিভিতে ভাষ্যকারদের গলায় স্বরে উত্তেজনার পারদ বেশ কয়েক ধাপ চড়ে গেছে। কিল গেমের ইঁদুর-বেড়াল খেলা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের নানান মতামত শোনানো হচ্ছে। তারই মাঝে-মাঝে ঢুকে পড়ছে পুরোনো সব কিল গেমের ক্লিপিংস। আর এসবের ফাঁকফোকরে রুটিনমাফিক বিজ্ঞাপনের ব্রেক তো আছেই!
মাথার ওপরে সূর্য অন্তত পনেরো ডিগ্রি হেলে গেছে পশ্চিম দিকে। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা—তারপরই অন্ধকার। যেটা ভগবানের দেওয়া জিশানের কালো পোশাক। তখন ওকে সুখারাম আর প্রাোটন দেখতে পাবে না। অবশ্য জিশানও ওদের দেখতে পাবে না। কিন্তু তা সত্বেও জিশান মাথা তুলে সূর্যের দিকে তাকাল। সূর্যদেবকে তাড়াতাড়ি অস্ত যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল।
এক ঝাঁক বাড়ি-ঘরের পাশ দিয়ে জিশানের বাইক ছুটে যাচ্ছিল। সিটিজেনদের হইচই জিশানের কানে এল। ওদের অনেকেই এখন বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। কিল গেমের রোমাঞ্চ আরও ভালো করে অনুভব করছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে ওদের সাহসও বেড়েছে।
জিশানের বারবার মিনি আর শানুর কথা মনে পড়ছিল। কিন্তু ও জোর করে ওদের মন থেকে সরিয়ে রাখতে চাইছিল। ওদের নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবলেই জিশান দুর্বল হয়ে পড়বে। ও চায় না, টিভির লক্ষ-লক্ষ কোটি-কোটি দর্শক ওর দুর্বলতা দেখে ফেলুক।
জিশান মনকে শক্ত করছিল। বলছিল, মনে-মনে, ‘আর তো মাত্র পনেরো ঘণ্টা!’ কিন্তু ওর ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল। সেই ভোর ছ’টা থেকে ও ছুটছে, শুধু ছুটছে। মোটরবাইকের ইঞ্জিনের তাপ ওর শরীরের সমস্ত রস যেন ক্রমাগত শুষে নিচ্ছে। হয়তো সেইজন্যই ওর এত বেশি ক্লান্ত লাগছে, একটু-আধটু ঘুমও পাচ্ছে।
কিন্তু এখন ঘুম পেলে চলবে না। পনেরো ঘণ্টা পর ও ঘুমোবে।
বাইক চালাতে-চালাতে নকল পাহাড়ের কাছে পৌঁছে গেল। পাশাপাশি দুটো নকল পাহাড়—দেখতে হুবহু আসল পাহাড়ের মতো, তবে উচ্চতায় বড়জোর একশো মিটার। প্রথম পাহাড়টার পাকদণ্ডী বেয়ে জিশানের বাইক ওপরে উঠতে লাগল।
সরু এবড়োখেবড়ো পথ। তার একপাশে ঝোপঝাড় কাঁটাগাছ। আর অন্যদিকে নকল পাথরের দেওয়াল। সেই দেওয়ালের ফাটল থেকে ছোট-বড় গাছ গজিয়েছে। সেই গাছে ফুটে রয়েছে গোলাপি, সাদা আর কমলা রঙের অসংখ্য ছোট-ছোট ফুল।
জিশানের মনে হল, কতদিন পর একজন মানুষ ফুলগুলোকে দেখতে এল। তাও আবার ওল্ড সিটির দূরের শহর থেকে। ওর আরও মনে হল, ওকে দেখে ফুলগুলো যেন খুশিতে হাসছে, অল্প-অল্প দুলছে।
অপাশিরা কথাও মনে পড়ছিল জিশানের। অপাশিকে ও চেনে না, জানে না—কিন্তু তা সত্বেও ওকে খুন করে বসল! যে-মানুষ দুটো পরস্পরের অচেনা, যাদের মধ্যে এককণাও ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা বিনিয়ম হয়নি, তারা একে অপরের প্রাণের জন্য পাগল!
নিজেকে ধিক্কার দিল জিশান। ওর সান্ত্বনা শুধু এটুকুই যে, অপাশি কানোরিয়ার জন্য সুনিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছিল। আর প্রাোটন কিংবা সুখারামের ক্ষেত্রেও তাই।
পাহাড়ে অনেকটা উঠে আসার পর জিশান থামল। এই উচ্চতা থেকে শহরটাকে কী সুন্দর দেখাচ্ছে! রাস্তার পাশে বাইক থামিয়ে পাহাড়ের ছায়ায় ঘাস আর আগাছার ওপরে ও বসে পড়ল। কয়েক মুহূর্তের জন্য কিল গেমের কথা ভুলে গেল। ভুলে গেল, ওর নাম কী, ও কোথায়, কী করতে এই পাহাড়ে বসে আছে।
চোখের সামনে সাদা আর নীল মেশানো আকাশ। কয়েকটা কালো পাখি। চিড়িক-চিড়িক করে ডাকতে-ডাকতে জিশানের চোখ বরাবর উড়ে গেল। শব্দ করে বাতাস বইছে। জিশানের মনে হচ্ছিল, বাতাস ওর সঙ্গে কথা বলছে।
জিশান কেমন উদাসীন হয়ে গেল, আনমনা হয়ে গেল।
হঠাৎই একটা চিলের চিৎকারে ও বাস্তবে ফিরে এল। পোশাকের হাতা দিয়ে কপাল আর গালের ঘাম মুছল। বাঁ-হাতের অপারেশনের জায়গাটা অল্প-অল্প ব্যথা করছে। ট্র্যাকারের মাইক্রোট্রান্সমিটারটা এই জায়গায় মাংসের আড়ালে আস্তানা গেড়ে আছে।
উঠে দাঁড়াল। ক্লান্ত পায়ে রুকস্যাকের দিকে এগোল। হাত দুটো শূন্যে তুলে কয়েকবার ঘোরাল। পা টানটান করে কাল্পনিক শত্রুর দিকে কয়েকবার লাথি ছুড়ল। জড়তা কাটিয়ে চাঙ্গা হওয়া দরকার।
