মানুষটার পিছনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা নীল রঙের গাড়ি।
জিশান লক্ষ করল, আকাশের দুটো হেলিকপ্টার এখন মাথার ওপরে ব্যস্তভাবে চক্কর কাটছে। বোধহয় ওরা অপাশি আর জিশানের মোকাবিলাটা দেখতে পেয়েছে।
নদীর স্রোতের সঙ্গে গা ভাসিয়ে জিশান সাঁতার কাটতে লাগল। একইসঙ্গে ও নিজের বেখাপ্পা অবস্থাটার কথা ভাবতে লাগল।
ওর কাছে এখন অপটিক্যাল ট্যাবলেট নেই। ট্র্যাকার নেই। ফুড ম্যাপ নেই। মোটরবাইক নেই। অস্ত্র নেই—যা-ও বা আছে, জলে ভেজা। আর স্যাটেলাইট ফোনটার কী হাল কে জানে!
এখন ও খাবার খুঁজে পাবে কোথায়?
তবে ভালো খবর হল, এখন ওকে তিনজনের বদলে দুজন কিলারের সঙ্গে লড়তে হবে। লড়াই করে বাঁচতে হবে।
মিনি নিশ্চয়ই ওর লড়াই দেখেছে—দেখছে।
জিশান একটা হাত আর দুটো পা ব্যবহার করে কোনওরকমে সাঁতার কাটছিল। চেষ্টা করছিল, নদীর বাঁ-দিকের পাড়ের কাছে সরে যেতে। তখনই ও দেখতে পেল লম্বা ছিপের মতো অনেকগুলো মেটাল লিভার নদীর দিকে ঝুঁকে রয়েছে। সেগুলোর ডগায় ক্যামেরা বসানো। অর্থাৎ, জিশান সবসময় লক্ষ-লক্ষ কোটি-কোটি দর্শকের চোখের সামনে রয়েছে।
একটু পরেই নদীর পাড়ে উঠে এল। হাতে-পায়ে কোথাও-কোথাও বোধহয় কেটে-ছড়ে গেছে, কারণ, জ্বালা করছে।
ধপ করে বসে পড়ল আগাছা আর বুনো ঘাসের ওপরে। বড়-বড় শ্বাস ফেলতে লাগল। ভেজা রুকস্যাকটা পিঠ থেকে নামিয়ে রাখল পাশে। ওটা আয়তনে বড় হওয়ায় ওকে জলে ভেসে থাকতে সাহায্য করেছে।
এবার স্যাটেলাইট ফোনটা নিয়ে পড়ল। শ্রীধর পাট্টাকে এখুনি ফোন করা দরকার।
ফোনের বোতাম টিপতে লাগল জিশান।
•
ডায়াল করতেই একটা ঘড়ঘড় শব্দ জিশানকে অভ্যর্থনা জানাল। তার ওপরে সুপারইমপোজড হয়ে রিং বাজতে লাগল।
এক হাতে ফোন কানে চেপে ধরে অন্য হাতে রুকস্যাকের কভার ফ্ল্যাপ খুলতে লাগল জিশান।
ফোনটা এখনও ঘড়ঘড় ফাটা আওয়াজে বাজছে। শ্রীধর ফোন ধরতে এত দেরি করছেন কেন?
ভেজা, সপসপে রুকস্যাক থেকে ট্যাবলেট বেরোল। ছোট টিভিটাও বেরোল। সব ইলেকট্রনিক পরদা অন্ধকার। কোনও আলোর চিহ্ন নেই সেখানে।
জিশানের বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। চারিদিক যেন ইলেকট্রনিক পরদার মতোই অন্ধকার দেখাল। কী করে এখন ও লড়াই চালাবে! কী করে কিলারদের লোকেশান ট্র্যাক করবে! কী করে খাবার খুঁজে পাবে?
ফোন কানে চেপে ধরে জিশান অধৈর্য হয়ে পড়ছিল। মনে-মনে শ্রীধরকে বলছিল, ‘শ্রীধর…ধর…ধর…।’
একটু পরেই শ্রীধর পাট্টার গলা পাওয়া গেল : ‘জি-জি-শ-শান!’
শ্রীধরের গলায় স্বর কেটে-কেটে যাচ্ছিল।
স্যাটেলাইট ফোনটা যে অল্পবিস্তর কাজ করছে সেই প্রমাণটুকু জিশানকে আশাভরসা দিল। ও ফোনের সনিক রিসিভারের সামনে মুখ নিয়ে গিয়ে প্রায় চিৎকার করে বলল, ‘আমাকে এখুনি একটা অপটিক্যাল ট্যাবলেট দিন, ট্র্যাকার দিন। আমার ট্যাবলেট, ট্র্যাকার, টিভি, সব জলে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে—।’
ও-প্রান্তে খলখল করে হাসলেন শ্রীধর। আওয়াজটা ফাটা ডায়াফ্রামের কাঁপুনির মতো শোনাল। তার ওপরে ফোনের কথা কেটে-কেটে যাওয়ায় শ্রীধরের হাসি শুনে মনে হচ্ছিল কোনও পিশাচের হাসি।
এরপর শ্রীধর কথা বলতে শুরু করলেন। বারবার ইলেকট্রনিক হোঁচট খেলেও কথাগুলো বুঝতে পারছিল জিশান।
‘সরি, জিশান। কিল গেম ইজ আ ভেরি ফেয়ার গেম। নো এক্সট্রা সাপোর্ট। নো এক্সট্রা ব্যাক-আপ। নো এক্সট্রা অ্যাডভান্টেজ…। এই গেমটার নাম কিল গেম—কোনও ছেলেখেলা নয়।’
জিশান বুঝতে পারছিল হাতে সময় কম। কিলার প্রাোটন আর কিলার সুখারাম হয়তো এই মুহূর্তে নির্ভুল লক্ষ্যে ওর দিকে কনভার্জ করছে, ওর সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনছে।
জিশানের প্রচণ্ড রাগ হল। শ্রীধর পাট্টাকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করল। আচমকা খেপে গিয়ে গলার শিরা ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল ও।
‘শ্রীধর….পাট্টা! এই মুহূর্তে কোটি-কোটি মানুষ টিভিতে আমাকে দেখছে। আমি জানি, ওরা আমার সঙ্গে আছে। আমার অপটিক্যাল ট্যাবলেট চাই, চাই, চাই! এটা আমাকে না দিলে কিল গেমের সারভাইভাল ফ্যাক্টর জিরো হয়ে যাবে। তাই আমি নিউ সিটির জনতার আদালতে বিচার চাইছি।’ কথা বলতে-বলতে উঠে দাঁড়াল জিশান। দু-হাত শূন্যে তুলে টিভিতে লাইভ টেলিকাস্ট দেখা দর্শকদের উদ্দেশ করে চিৎকার করে বলল, ‘আপনারা আমাকে ন্যায়বিচার দিন! আপনাদের কাছে আমি বিচার চাইছি! আপনারা মার্শালকে বলুন, যেন উনি এক্ষুনি আমাকে একটা অপটিক্যাল ট্যাবলেট দেন…এক্ষুনি…!’
ভেজা রুকস্যাকটা তুলে নিয়ে জঙ্গলের দিকে ছুটল জিশান। এবার গা-ঢাকা দেওয়া দরকার। টিভির দর্শকরা নিশ্চয়ই ওর আবেদন ঠিকঠাক শুনতে পেয়েছে, ওকে সরাসরি দেখতেও পেয়েছে। এখন দেখা যাক কী হয়।
•
সঙ্গে-সঙ্গে যেটা হল সেটা শ্রীধর পাট্টাকে একটা বিশাল ধাক্কা দিল।
সুপারগেমস কর্পোরেশনের কিল গেম কন্ট্রোল রুমের হেলপলাইনে একের পর এক ফোন আসতে লাগল। নিউ সিটির সিটিজেনরা সবাই যেন জিশানের জন্য পাগল হয়ে গেছে। ওরা শুধু ফোনের বোতাম টিপছে। কন্ট্রোল রুমে কেউ ফোন ধরামাত্রই শুনছে, ‘এক্ষুনি জিশানকে অপটিক্যাল ট্যাবলেট আর ট্র্যাকার দিন। ডোন্ট স্পয়েল দ্য গেম, য়ু ড্যাম ফুল!’
হুড়মুড়িয়ে ফোন আসতে লাগল আর ফোনের ভাষা ক্রমশ রুক্ষ আর নোংরা হতে লাগল। শেষ পর্যন্ত, কয়েক মিনিটের মধ্যেই, ভাষাটা কাঁচা খিস্তির পর্যায়ে পৌঁছে গেল।
