কে আছে ওই গাড়িতে? কিলার সুখারাম? নাকি প্রাোটন?
রিয়ারভিউ মিরারে তাকাল জিশান। ও ব্রেক কষার ফলে পিছনে ছুটে আসা ফুটকিটা এখন মাপে অনেক বড় দেখাচ্ছে। অপাশি কানোরিয়াকে অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। গোলগাল মোটাসোটা চেহারাটা উত্তল দর্পণে আরও মোটা আর বিকৃত দেখাচ্ছে।
ঝটিতি সিদ্ধান্ত নিল জিশান। সামনে থেকে ছুটে আসা অটোমোবিলটার সঙ্গে যদি ওর কলিশন হয় তা হলে মোটরবাইকটার আস্ত থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। তার সঙ্গে জিশানেরও।
তার চেয়ে বরং অপাশির মোটরবাইকের সঙ্গে কিছু একটা করার চেষ্টা করা অনেক ভালো।
সুখারাম নস্কর এর মধ্যেই বাইক পালটে গাড়ি নিয়েছে।
নীল গাড়িটার জানলা দিয়ে একটা আলট্রা হাই-পাওয়ার রাইফেলের নল বেরিয়ে এল। তারপর জিশানের বাইক লক্ষ্য করে ট্রিগার টিপল কিলার সুখারাম। ‘ক্র্যাক’ এবং ‘সাঁই’ শব্দ হল। হেভিওয়েট বুলেট ছুটে গেল জিশানের দিকে।
ব্রেক কষলেও জিশান একটিবারের জন্যও বাইক থামায়নি। প্যাঁচালো পথে নকশা বুনে ফ্লাইওভারের ওপরে বাইকটাকে ঘুরপাক খাওয়াচ্ছিল। কারণ, ‘সিটিং টারগেট’-এর চেয়ে ‘মুভিং টারগেট’ অনেক ভালো। ও বেশ বুঝতে পারল, একটা গরম বুলেট ওর বাইকের কাছ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। তারপরই ও রাইফেলের শব্দটা শুনতে পেল।
সঙ্গে-সঙ্গে অপাশিকে লক্ষ্য করে বাইক ছোটাল জিশান। ইঞ্জিনে ‘গোঁ-ওঁ-ওঁ’ শব্দ তুলে বাইকের স্পিড তুলে দিল চরমে। তারপর স্টিয়ারিঙের কায়দায় সাপের মতো আঁকাবাঁকা পথে ছিটকে গেল অপাশির দিকে।
কিলার অপাশি মিসাইল গান ফায়ার করতে সাহস পাচ্ছিল না। কারণ, যদি ও টার্গেট মিস করেও তা হলে মিসাইলের ইনফ্রারেড ট্র্যাকার ওর বাইকের ইঞ্জিন লক্ষ্য করে ছুটে আসতে পারে।
সুতরাং ও চলন্ত অবস্থাতেই বাইকের কেরিয়ার থেকে মেশিন পিস্তল বের করে পরপর দুবার ফায়ার করল।
কিন্তু মিস করল। কারণ, জিশানের বাইক বলতে গেলে সার্কাসের কসরত দেখাতে-দেখাতে এদিক-ওদিক হেলে অপাশির দিকে ছুটে আসছিল।
মেশিন পিস্তল ফেলে একটা চপার তুলে নিল ও। ততক্ষণে লং রেঞ্জ পিস্তল তুলে নিয়ে অপাশিকে লক্ষ্য করে দুবার ফায়ার করেছে জিশান। কিন্তু দুটো ছুটন্ত মোটরবাইকের বিচিত্র আপেক্ষিক গতিবেগ জিশানকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করে দিল।
ততক্ষণে অপাশির ছুড়ে দেওয়া চপার বাতাসে লাট খেয়ে জিশানের দিকে ছুটে আসছে। জিশান নিমেষের মধ্যে ছুটন্ত বাইকটাকে কাত করে একটা চোখা বাঁক নিল। অপাশির চপার ওর পিছনের সিটে কেটে বসে গেল।
অপাশি দাঁত খিচিয়ে মিহি চিৎকার করে উঠল। আবার মেশিন পিস্তল তুলে নিল হাতে। শত্রুকে এত কাছে পাওয়া গেছে! এইবার খতম।
আর উত্তরে জিশান নিখুঁত লক্ষ্যে ওর বাইকের চাকা দিয়ে অপাশির বাইকের পিছনের চাকায় আড়াআড়ি ধাক্কা মারল।
দুরন্ত গতির সংঘর্ষ। ফলে যা হওয়ার তাই হল।
অপাশির বাইক লাট্টুর মতো ঘুরপাক খেতে-খেতে শূন্যে উঠে পড়ল। সরাসরি গিয়ে ধাক্কা খেল ফ্লাইওভারের রেলিঙে। ‘দড়াম’ শব্দ হল। রেলিং আর বাইকের মাঝে পড়ে অপাশির মাথা থেঁতলে গেল। ওর হাতে তখনও মেশিন পিস্তল ধরা রয়েছে।
একটা মিহি আর্ত চিৎকার শোনা গেল। অপাশি এবং ওর বাইক ছিটকে গেল আকাশে। তারপর অদ্ভুত এক কক্ষপথে বাতাস কেটে পড়তে লাগল নদীর দিকে।
সংঘর্ষের পর জিশানের বাইকও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। অপাশির বাইকের সংঘর্ষের জায়গা থেকে প্রায় বারো-তেরো ফুট বাঁ-দিকে ওর বাইক ফ্লাইওভারের রেলিঙে ধাক্কা মারল। ঠিক তার আগের মুহূর্তে জিশান বাইক ছেড়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠল। বাইকটা রেলিঙের খানিকটা অংশ ধসিয়ে দিয়ে বোমার সপ্লিন্টারের মতো ছিটকে গেল বাতাসে। জিশান তখন ওর বাইক থেকে কয়েক হাত দূরে বাতাস কেটে নদীর দিকে পড়ছিল। ওর মনে হচ্ছিল, ওর কোনও ওজন নেই। আর সেই অদ্ভুত সময়ে প্যাসকোর কথা মনে পড়ে গেল ওর।
অপাশির বাইকটা নীচে পড়তে-পড়তে আচমকাই শূন্যে বোমার মতন ফেটে গেল। বিস্ফোরণের শব্দে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়। বাইক আর অপাশির ছোট-বড় টুকরো ভয়ংকর গতিতে ঠিকরে গেল চারিদিকে। বিস্ফোরণের আগুনের তেজ আর ঝলক জিশানের চোখ ধাঁধিয়ে দিল।
বাতাসে পোড়া গন্ধ, কালো ধোঁয়া। ও চোখ বুজে ফেলল। ভাসতে-ভাসতেই হাঁটু মুড়ে দু-হাতে হাঁটুজোড়া জাপটে ধরল। ওর শরীরটা শূন্যে কয়েকবার লাট খেল। তারপরই চোখ খুলল জিশান। দেখল, নদীর ঘোলাটে জল ওর দিকে ছুটে আসছে। সঙ্গে-সঙ্গে দক্ষ ডাইভারদের মতো হাত দুটো সামনে টান-টান করে বাড়িয়ে ধরল। এবং শরীরটাকে সামান্য নিয়ন্ত্রণ করতেই ওর হাত দুটো বর্শার ফলার মতো নদীর জল চিরে ঢুকে গেল। তার পিছন পিছন ঢুকে পড়ল জিশানের শরীর।
একটা চাপ। একটা ঠান্ডা অনুভূতি। চোখের নজর ঘোলাটে। মুখে কিছুটা জল ঢুকে গেল। নদীর জলের ঘাত-প্রতিঘাতে জিশানের শরীরটা বেসামাল হয়ে গেল।
কিন্তু একটু পরেই জলের ওপরে ‘ভু-উ-স’ করে ভেসে উঠল জিশান। তাড়াতাড়ি পকেট হাতড়ে স্যাটেলাইট ফোনটা বের করল। বেশ কিছুটা ভিজে গেছে। অকেজো হয়ে গেল কি না কে জানে!
ফোনটাকে ডানহাতে শূন্যে তুলে ধরল। জল ঝরানোর জন্য ওটা কয়েকবার জোরে-জোরে ঝাঁকাল। তারপর চোখ তুলল ফ্লাইওভারের দিকে। সেখানে একটা মানুষের সিলুয়েট দেখতে পেল। ভাঙা রেলিঙের কাছে দাঁড়িয়ে নদীর জলের দিকেই তাকিয়ে আছে। মনে হয়, জিশানকে দেখছে কিলার সুখারাম।
