টিভি আর ট্র্যাকার চটপট রুকস্যাকে ঢুকিয়ে নিল জিশান। পকেট থেকে স্যাটেলাইট ফোন বের করল। স্পিড ডায়াল মোডে শ্রীধর পাট্টাকে ফোন করল।
ও-প্রান্তে একবার রিং বাজতেই শ্রীধর ফোন ধরলেন।
‘বলো, জিশান—হাউ আর য়ু?’
‘এসব কী হচ্ছে! বাড়ির মধ্যে আর্মস নিয়ে ঢুকেছে অপাশি। গেমের রুলে তো এটা বারণ ছিল!’
‘সারপ্রাইজ! সারপ্রাইজ!’ ও-প্রান্তে চিবিয়ে হাসলেন শ্রীধর : ‘তা ছাড়া কানোরিয়া বিল্ডিং-এ শুধু আর্মস নিয়ে ঢুকেছে—ইউজ তো করেনি। তাই অফিশিয়ালি ও এখনও ক্লিন। আর সেকেন্ড পয়েন্টটা হল, তোমাদের মোকাবিলা যদি হয় তো সেটা হবে ছাদে। সেটাও অফিশিয়ালি ”বাড়ির ভেতরে” হল না।’ শ্রীধর ছোট করে দুবার কাশলেন : ‘সুতরাৎ এসব ছোটখাটো ইস্যু নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে লড়াই করো, জিশান। ফাইট। সারভাইভ।’ আচমকা ফোন কেটে দিলেন শ্রীধর।
আর তখনই জিশান টিভিতে দেখতে পেল, অপাশি ছাদের দরজা ডিঙিয়ে ছাদে পা দিচ্ছে। টিভি থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকিয়েও দেখতে পেল একই দৃশ্য।
সঙ্গে-সঙ্গে রুকস্যাকের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল জিশান। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটা মিনি গ্রেনেড বের করে নিল। তারপর শোওয়া অবস্থাতেই সেটার পিন দাঁতে টেনে অপাশিকে লক্ষ্য করে ছুড়ে দিল।
জিশানকে অবাক করে ওই মোটা শরীর নিয়েও অপাশি আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায় বাঁ-দিকে লাফিয়ে পড়ল। নিউক্লিয়ার পিস্তল ফায়ার করল জিশানকে তাক করে।
আপেক্ষিক গতিবেগের জটিলতায় স্বাভাবিক কারণেই অপাশির নিশানা তাকছুট হয়ে গেল। আর জিশানের মিনি গ্রেনেডও অপাশির গায়ে লাগেনি। তবে বিকট শব্দ, আগুন আর ধোঁয়া বাড়ির সবাইকে বিস্ফোরণের খবর পাঠিয়ে দিল।
অপাশি তখনও ছাদের মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর জিশান সবে হাঁটুগেড়ে উঠে বসেছে। হঠাৎই ছাদের দরজা দিয়ে পাঁচ-ছ’জন ‘সিটিজেন’ ঢুকে পড়ল খোলা ছাদে। ওরা ঝড়ের বেগে ছুটে গিয়ে অপাশির ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওকে এলোপাতাড়ি কিল-চড়-ঘুসি মারতে লাগল।
ওদেরই মধ্যে দুজন চেঁচিয়ে বলে উঠল, ‘জিশান, পালাও! পালাও!’
জিশান রুকস্যাকটা তুলে নিয়ে ছুট লাগাল ছাদের দরজার দিকে।
সিঁড়ি নামতে-নামতে জিশান সদ্য-হওয়া অভিজ্ঞতাটার কথা ভাবছিল। এই আবেগমাখানো সমীকরণটার কথা নিশ্চয়ই শ্রীধর পাট্টা ভাবতে পারেননি। জিশানের পাবলিক ইমেজ আসল জিশানের চেয়ে বোধহয় অনেক বড়। নইলে এইরকম নিয়ম-ভাঙা ঘটনা কখনও ঘটে!
শ্রীধরকে ফোন করে জিশানের বলতে ইচ্ছে করল, ‘সারপ্রাইজ! সারপ্রাইজ!’
দোতলা থেকে একতলার দিকে নামতে-নামতে টিভির ধারাবিরণী কানে এল ওর : ‘আশ্চর্য! অবাক কাণ্ড! চমকে দেওয়া ঘটনা। গেম সিটির ছ’জন ”সিটিজেন” কিলার অপাশির ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে প্রবল পেটাচ্ছে। জিশানকে ওরা নিউক্লিয়ার পিস্তলের মুখ থেকে কান ঘেঁষে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আপনারা তো জানেন, বন্ধুগণ, কিল গেমের দিন গেম সিটিতে যেসব মক ”সিটিজেন” হাজির থাকে তারা প্রত্যেকেই পুরস্কার হিসেবে পঞ্চাশ হাজার টাকা পায়। কিন্তু এই মুহূর্তে জিশানকে বাঁচানোর জন্যে ওরা প্রত্যেকে কুড়ি হাজার টাকা করে বোনাস পুরস্কার পাবে। কিল গেম জমে উঠেছে, বন্ধুগণ—দারুণ জমে উঠেছে…।’
বাড়িটা থেকে বেড়িয়ে এসেই আবার ছুট, ছুট, ছুট। একটা মোটরবাইক চাই। এক্ষুনি। ওই তো, দেখা যাচ্ছে!
রাস্তা পেরিয়ে জিশান ছুটে গিয়ে চড়ে বসল একটা মোটরবাইকে। পুশবাটন স্টার্ট দিতেই বাইকটা গর্জন করে উঠল। সাইলেন্সার পাইপ দিয়ে অল্প ধোঁয়া বেরোল। তারপর ‘হুউশ’ করে ছুটে গেল সামনের দিকে।
নিউক্লিয়ার পিস্তল আর চপারের ভয় দেখিয়ে অপাশি ‘সিটিজেন’দের জটলা থেকে কোনওরকমে বেরিয়ে এল।
রাগে ওর ভিতরটা গরগর করছিল। তিনতলার একটা ঘরের ভিতর থেকে টিভির আওয়াজ ছুটে আসছিল : ‘অপাশি কানোরিয়া ব্যর্থ হয়েছে। দ্য সুপার কিলার হ্যাজ ফেইলড। এখন অপাশি সিঁড়ি দিয়ে নামছে…তাড়া করছে জিশানকে। কিন্তু মনে হয় না এ-দফায় ও কিছু করতে পারবে। কারণ, জিশান এখন বাইক নিয়ে ছুটছে…।’
কানোরিয়া ঢুকে পড়ল ঘরটার ভেতরে। সেখানে দুজন বয়স্ক পুরুষ প্লেট টিভির দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। হাতে ফ্লাফি কুকিজের প্যাকেট। ওদের হাত আর মুখ চলছিল।
একটা নোংরা গালাগাল দিল অপাশি। তারপর এক ঝটকায় টিভির কাছে গিয়ে যন্ত্রটার ওপরে চপারের কোপ বসিয়ে দিল। আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছিটকে বেরোল টিভি থেকে। শর্ট সার্কিটের ‘ফটফট’ শব্দ হল। টিভির পরদা দপ করে আঁধার হয়ে গেল।
‘সিটিজেন’ দুজন ভয়ে চিৎকার করে উঠল। অপাশি সেটাকে আমল না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এল বাইরে। ওর পক্ষে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব তত তাড়াতাড়ি সিঁড়ি নামতে শুরু করল। জিশান—জিশানকে এখন ওর চাই। জিশানের রক্ত চাই।
জিশান বাইক ছুটিয়ে দিয়েছিল নদীর দিকে। সেখানে ফ্লাইওভার পেরিয়ে ও চলে যেতে চায় গেম সিটির পশ্চিমদিকে। সেখানে একটা বিশাল এলাকা জুড়ে ঘন জঙ্গল রয়েছে। দিনেরবেলাটা ও জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে সময়টা কাটিয়ে দিতে চায়। তারপর সন্ধে হলে, অন্ধকার নামলে, ওর লুকিয়ে থাকার কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
পথে বাইক দাঁড় করিয়ে ও একবার ট্র্যাকার দেখে নিয়েছে। তিনটে লাল ডটের অবস্থান এখন খানিকটা এলোমেলো। কারণ, জিশানের গতিবিধি ওদের হিসেবকে গুলিয়ে দিয়েছে। তাই ওরা চক্রবূহ্যের মতো সবুজ ডটটাকে ঘিরে ধরতে পারেনি।
