আগুনের তাপ আর শিখায় ভয় পেয়ে গেল গাছের পাখিরা। ওরা গাছের আশ্রয় ছেড়ে ছিটকে গেল আকাশে। একটা খরগোশ আর একটা বনবেড়াল কোন আড়াল থেকে বেরিয়ে দিগভ্রান্তের মতো ছুট লাগাল।
জিশানও ঘাবড়ে গিয়ে ছুটতে শুরু করল। বিদ্যুৎঝলকের মতো ওর মনে পড়ল, অপাশি কানোরিয়ার ফেরোসিটি কোশেন্ট 9.4।
‘জিশা—ন!’ বলে মিহি গলায় ডেকে উঠল অপাশি। আর একইসঙ্গে আদিবাসী যোদ্ধাদের ক্ষিপ্রতায় ওর হাতের চপারটা জিশানকে লক্ষ্য করে ছুড়ে দিল। ইস্পাতের অস্ত্রটা শূন্যে লাট খেয়ে তিরবেগে ছুটে এল জিশানের দিকে।
ছুটতে-ছুটতেই জিশান আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল মাটিতে। চপারটা ওর শরীরের ইঞ্চিছয়েক ওপর দিয়ে বাতাস কেটে বেরিয়ে গেল। গেঁথে গেল একটা গাছের গুঁড়িতে। থরথর করে কাঁপতে লাগল।
আবার উঠল জিশান। আবার ছুট। গাছপালার আড়ালে-আড়ালে, এঁকেবেঁকে। নাকে আসছে গাছ-পাতা পোড়ার গন্ধ। সেইসঙ্গে শরীরে টের পাচ্ছে গরম বাতাসের ছোঁয়া।
ছুটতে-ছুটতেই পকেটে হাত ঢোকাল। টেনে বের করে নিল মিসাইল গান। থমকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অপাশিকে লক্ষ্য করে ট্রিগার টিপল। এক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে অপাশি সরে গেল একটা গাছের গুঁড়ির আড়ালে। ও যে শুধু সেজন্য বেঁচে গেল তা নয়। এখানে-সেখানে আগুন তখনও জ্বলছিল। ফলে মিসাইলের ইনফ্রারেড ট্র্যাকিং সিস্টেম বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। মিসাইলটা জলন্ত গাছ-পাতার আগুনের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
এ-অঞ্চলের বাড়ি-ঘরগুলো কোনদিকে আছে জিশানের সেটা ভালোই আন্দাজ ছিল। ও মোটামুটি সেদিক লক্ষ্য করেই দৌড়তে লাগল। এক্ষুনি আর-একটা মোটরবাইক ওর দরকার। এক্ষুনি।
পিছন থেকে অপাশির মোটরবাইক স্টার্ট করার শব্দ কানে এল। সঙ্গে-সঙ্গে জিশান দৌড়ের গতি আরও বাড়িয়ে দিল। ও এটুকু বুঝেছিল, গাছপালার গোলকধাঁধার মধ্যে অপাশি কখনই খুব জোরে বাইক ছোটাতে পারবে না।
একটু পরেই জিশান বেরিয়ে পড়ল ফাঁকা রাস্তায়।
বেলা প্রায় দশটা। কংক্রিটের রাস্তা রোদে ঝকঝক করছে। রাস্তার দুপাশে ফুলের বাগান। তাতে ছবির মতো ফুল। সেই ফুলের টানে বেশ কয়েকটা প্রজাপতি ওড়াউড়ি করছে।
রাস্তা ধরে একটু এগোতেই বেশ কিছু দোকানপাট আর অনেকগুলো বাড়ির ব্লক। বাড়িগুলোর সামনে সার বেঁধে গাড়ি আর বাইক পার্ক করা রয়েছে।
জিশান ছুটতে-ছুটতে একটা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, কংক্রিটের রাস্তা ধরে অপাশির বাইক ছুটে আসছে।
শ্রীধরের কথা জিশানের মনে পড়ল : কোনও বাড়ি কিংবা দোকানের ভেতরে যদি জিশান আর কিলারদের কোনও মোকাবিলা হয় তো সেটা হবে পুরোপুরি অস্ত্রহীন মোকাবিলা। অপাশির যা চেহারা জিশান দেখেছে তাতে খালি হাতের লড়াইয়ে ও জিশানের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না। সেটাই এবার পরখ করে দেখা দরকার।
জিশান ঢুকে পড়ামাত্রই বাড়িটায় হইচই হাঙ্গামা শুরু হয়ে গেল। এ-ঘর সে-ঘর থেকে ‘জিশান! জিশান!’ রব উঠল। কেউ-কেউ আনন্দে সিটি বাজাল।
কিন্তু জিশানের কোনওদিকে নজর ছিল না। ও লোকজনকে ঠেলে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল। হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, ‘অপাশি কানোরিয়া আমার পেছনে তাড়া করে আসছে। আমি ছাদে যাচ্ছি—।’
‘চারতলায়! ছাদ চারতলায়!’ ওপরদিকে আঙুল দেখিয়ে চেঁচিয়ে উঠল দুজন ‘সিটিজেন’।
গেম সিটিতে যেসব ‘সিটিজেন’রা আজ হাজির রয়েছে তারা প্রত্যেকেই হাজিরা দেওয়ার জন্য পুরস্কার পাবে। এ ছাড়াও নানান অ্যাক্টিভিটির জন্য রয়েছে ‘সারপ্রাইজ প্রাইজ মানি’। তাই এই মানুষজনের উৎসাহ-উদ্দীপনার অন্ত নেই।
জিশান তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। একবার ছাদে পৌঁছতে পারলে ও অনেকটা নিশ্চিন্ত। সেখানে ও অনেকটা খোলা জায়গা পাবে। তা ছাড়া মার্শালের নিয়ম অনুযায়ী সেখানে সশস্ত্র লড়াই করা যাবে না। সুতরাং ছাদে শেষ পর্যন্ত যেটা হবে সেটা অপাশির সঙ্গে ওর হাতাহাতি লড়াই। সে-লড়াইয়ে অপাশি নস্যি।
ছাদে এসে পৌঁছল জিশান। বিশাল বড় খোলা ছাদ। আকাশের দিকে মুখ করে বুক চিতিয়ে পড়ে আছে। মাথার ওপরে সূর্য ঠিক-ঠিকভাবে নিজের কাজ করে যাচ্ছে। আলো আর উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছে চারিদিকে।
জিশান ছুটে গেল বাঁ-দিকের পাঁচিলের কাছে। ঝুঁকে পড়ে নীচের রাস্তার দিকে তাকাল। অপাশি এখন কোথায়?
প্রশ্নের উত্তর দিল মিসাইল গান। অপাশি মিসাইল গান হাতে তোলার সঙ্গে-সঙ্গেই বসে পড়েছিল জিশান। তাই ছাদের পাঁচিল বর্ম হয়ে ওকে বাঁচিয়ে দিল। কিন্তু বিকট শব্দ হল। পাঁচিলের একটা অংশ ভেঙে চৌচির হয়ে খসে পড়ল। জিশান ছুটে সরে এল ছাদের ঠিক মাঝখানে। এখান থেকে ছাদের দরজার দূরত্ব অনেকটাই। ফলে অপাশি ছাদে এলে ও তৈরি হওয়ার জন্য অনেকটা সময় পাবে।
তারপর হাতাহাতি লড়াই।
রুকস্যাকটা পিঠ থেকে নামাল জিশান। চটপট ট্র্যাকার আর টিভি বের করে দেখল।
ট্র্যাকারে একটা লাল ডট সবুজ ডটের খুব কাছাকাছি। ওটা বোধহয় অপাশি কানোরিয়া। বাকি দুটো ডট তার তুলনায় মোটামুটি দূরে।
এবার টিভি অন করল জিশান। অপাশি একটা বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে—সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। কিন্তু ওর হাতে ওগুলো কী?
শ্রীধর পাট্টা তো নিয়ম করেছেন বাড়ির ভেতরে অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে না! কারণ, তাতে গেম সিটির ‘সিটিজেন’দের বিপদ হবে। তা হলে অপাশির দু-হাতে দুটো অস্ত্র কেন? বাঁ-হাতে একটা ধারালো চপার, আর ডানহাতে টুয়েন্টি এমএম টেন শটার নিউক্লিয়ার পিস্তল।
