জিশান বেশ বুঝতে পারছিল, বাইকের শব্দটা ওর শত্রু। এই নির্জন শহরে বহু দূর থেকে ওর বাইকের আওয়াজ শোনা যাবে। তা ছাড়া বাইকটা কোথাও রেখে ও যে কোনও একটা গোপন আস্তানায় লুকিয়ে পড়বে তারও উপায় নেই। ট্র্যাকারের সবুজ ডট ওর নিখুঁত কো-অর্ডিনেট শত্রুদের জানিয়ে তো দেবেই, উপরন্তু ওর ছেড়ে যাওয়া বাইকটা নি:শব্দ চিৎকারে জানিয়ে দেবে যে, ও কাছাকাছিই কোথাও লুকিয়ে আছে।
তা হলে শত্রুদের চোখে ধুলো দেওয়ার উপায় কী?
এসব কথা ভাবতে-ভাবতে জিশান বোধহয় একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল। হঠাৎই ও দূরে গাছের আড়ালে দুটো হরিণ দেখতে পেল। হরিণ দুটোর গায়ের রং সোনালি-বাদামি আর সাদা। পেটের কাছ বরাবর লম্বা গাঢ় বাদামি দাগ। মোটরবাইকের আওয়াজে ওরা চমকে তাকিয়েছে জিশানের দিকে। তারপরই জঙ্গলের মধ্যে ছুট লাগিয়েছে।
জিশান বাইক থামাল। আর কতক্ষণ ও এই বাইকটা নিয়ে ছুটবে? কারণ, আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই হয়তো এই মেশিনটার তেল ফুরিয়ে যাবে। তখন?
জিশানের বিভ্রান্ত লাগল। নানান চিন্তা ওর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল।
একটু পরেই ট্র্যাকারটা বের করে দেখল ও। একটা লাল ডট ওর সবুজ ডটের বেশ কাছে এসে গেছে। সেটা কে? অপাশি কানোরিয়া? না সুখারাম নস্কর? নাকি তিন নম্বর কিলার?
আর ভাবার দরকার নেই। ট্র্যাকার উলটে অপটিক্যাল ট্যাবলেট দেখল। ওর মনে হল, ঘর-বাড়ির এলাকায় গেলেই ওর লড়াইয়ের কাজটা সহজ হবে। সুতরাং ও সেদিকে বাইক ছুটিয়ে দিল।
কিছুটা পথ চলার পরই জঙ্গলের মধ্যে অনেকটা ফাঁকা জায়গা দেখতে পেল। জায়গাটা গাছের পাতায় ঢাকা। টাটকা আর শুকনো গাছের পাতা কেউ যেন সেখানে ঝেঁটিয়ে এনে জড়ো করেছে।
জিশান বাইক চালাতে-চালাতেই এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। আর ঠিক সেই সময়েই দুর্ঘটনাটা ঘটে গেল।
ওর বাইক চলে এসেছিল গাছের পাতায় ঢাকা জায়গাটার ওপরে। আর সঙ্গে-সঙ্গে গাছের পাতাগুলো চোরাবালির মতো বাইকসমেত জিশানকে গিলে ফেলল।
জিশান নীচের দিকে পড়তে লাগল। গাছের পাতাগুলো বৃষ্টির মতো ওর শরীরের ওপরে ঝরে পড়ছিল। একটু পরেই নরম মাটিতে ও বাইকসমেত আছড়ে পড়ল। এবং বাইক থেকে ছিটকে গেল।
কয়েকটা মুহূর্ত হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তারপরই নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কোমরে ব্যথা। ডানহাতের কনুইয়েও সামান্য লেগেছে। গা থেকে কয়েকটা শুকনো পাতা ঝেড়ে ফেলল ও। বাইকটাকে সোজা করে দাঁড় করানোর আর চেষ্টা করল না। কারণ, বাইক নিয়ে এই গর্ত থেকে বেরোনোর কোনও গল্প নেই।
গর্তটা অনেকটা গন্ডার বা হাতি শিকারের ফাঁদের মতো। শুধু গর্তের নীচে শূলের মতো কাঠের গজাল পোঁতা নেই এই যা! কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে এরকম ফাঁদের ব্যবস্থা কেন?
ঠিক সেই মুহূর্তে জিশানের স্যাটেলাইট ফোন বেজে উঠল।
ফোন ধরল জিশান। শ্রীধর পাট্টা।
‘এই গর্তটা সারপ্রাইজ, জিশান। গেম সিটিতে এরকম আরও অনেক সারপ্রাইজ তোমার জন্যে ওয়েট করছে…।’
জিশান বিরক্তভাবে ‘থ্যাংক য়ু ভেরি মাচ’ বলে ফোন কেটে দিল। এখন এই সাইকোপ্যাথটার সঙ্গে বাজে বকার সময় নেই। আগে এই গর্তটা থেকে বেরোনো দরকার। কে জানে, হয়তো কোনও কিলার এই মুহূর্তে ওকে খতম করতে গর্তটার দিকেই এগিয়ে আসছে। প্লেট টিভিটা একবার দেখা যাক। সেই সঙ্গে ট্র্যাকারটাও।
পড়ে থাকা বাইকের কেরিয়ারের দিকে হাত বাড়াল। যন্ত্র দুটো এখনও ঠিকঠাক আছে তো!
ট্র্যাকারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল জিশান। একটা লাল ডট সবুজ ডটের মারাত্মক কাছাকাছি। সঙ্গে-সঙ্গে ট্র্যাকার রেখে প্লেট টিভি অন করল।
পরদায় অপাশি কানোরিয়ার মুখ। কী যেন একটা করছে ও।
একটু পরেই দেখা গেল ও কী করছে। একটা বড়সড় জেরিক্যান থেকে জলের মতো কী যেন ঢালছে জঙ্গলের ঘাস-পাতার ওপরে। একটু দূরে একটা মোটরবাইক দাঁড় করানো রয়েছে।
কমেন্টেটর তখন বলছেন, ‘ফোকস, শিকার আর শিকারি এখন অনেক কাছাকাছি এসে গেছে। পরিভাষায় যাকে বলে স্ট্রাইকিং ডিসট্যান্স। জিশানকে জঙ্গলের মধ্যে ট্র্যাক করার জন্যে কিলার অপাশি কানোরিয়া একটু আগেই গাড়ি ছেড়ে দিয়ে মোটরবাইক নিয়েছে। এখন ও বাইক থেকে নেমে অভিনব অপারেশান শুরু করেছে। জেরিক্যান থেকে অপাশি কী একটা লিকুইড যেন ঢালছে…।’
তখনই পেট্রলের গন্ধ পেল জিশান। শুকনো গাছের পাতা ভেজাতে-ভেজাতে তরল জ্বালানি নেমে আসছে গর্তের ভেতরে। জিশানের মরণকূপে। এরপর শুধু দরকার একটা দেশলাই-কাঠি।
অপাশি তা হলে অস্ত্র হিসেবে পেট্রল ভরতি কয়েকটা জেরিক্যানও নিয়েছিল!
জিশান ক্ষিপ্রগতিতে ট্র্যাকার আর টিভি ঢুকিয়ে দিল ওর রুকস্যাকে। তারপর হাঁচড়পাঁচড় করে গর্ত বেয়ে উঠে আসতে চাইল। কিন্তু বারবার হাত-পা স্লিপ করতে লাগল। তবে চারবারের চেষ্টায় খানিকটা উঠতে পারল। আর তখনই পেট্রলের ভেজা পথ ধরে আগুনের লকলকে শিখা ছুটে এল গর্তের দিকে।
জিশান একটা গাছের শিকড় ধরে এক হ্যাঁচকায় শরীরটাকে টেনে তুলল ওপরে। তখনই দাউদাউ শিখা ডিঙিয়ে অপাশি কানোরিয়াকে দেখতে পেল। নির্বিকার শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাতে লম্বা একটা চপার। তার চকচকে ফলা থেকে কমলা রঙের আগুনের ছায়া ঠিকরে বেরোচ্ছে। অপাশির বেশ কিছুটা পিছনে দাঁড় করানো রয়েছে একটা মোটরবাইক।
