যে-প্লেট টিভিটা গেম সিটির ‘সিটিজেন’রা জিশানকে হইহই করে গিফট করেছে সেটার মাপ মাত্র আট ইঞ্চি। জিশান ইচ্ছে করেই সবচেয়ে ছোট মাপের টিভিটা চেয়েছে। ওটা দেখারও সুবিধে, ক্যারি করাও সুবিধে।
বাইকের কেরিয়ার থেকে আবার প্লেট টিভিটা বের করে নিল জিশান। তারপর সুইচ অন করল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রঙিন ছবি ফুটে উঠল টিভিতে। আর সেই ছবি দেখামাত্রই জিশান হতবাক হয়ে গেল।
কারণ, টিভির পরদায় তখন অপাশি কানোরিয়াকে দেখা যাচ্ছে। নিষ্পাপ, গোলগাল ফরসা মুখ। গাল আর থুতনিতে হালকা দাড়ি। এই খুনিকে জিশান টিভির পরদাতে আগেও দেখেছে। কিল গেমের তিনজন কিলারের পরিচয় নিয়ে যখন কম্পিটিশন চলছিল তখন।
সেই প্রতিযোগিতার শেষে দুজন কিলারের পরিচয় দর্শকদের জানানো হয়েছিল। আর তিন নম্বর কিলারের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল—শ্রীধর পাট্টার নির্দেশে। ফলে প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়নি, আর পুরস্কারও মুলতবি রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, কিল গেমের সময়েই তিন নম্বর কিলারকে প্রথম দেখা যাবে, আর তখনই প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিজেতাদের নাম টিভিতে ঘোষণা করা হবে। সারপ্রাইজ।
না, এসব ব্যাপারের জন্য জিশান অবাক হয়নি। কারণ, এসব তথ্য ওর আগে থেকেই জানা।
ও অবাক হয়েছে, কিলার অপাশি কানোরিয়ার হাতে একটা স্যাটেলাইট ফোন দেখে। যে-ফোনে অপাশি এখন কথা বলছে আর-একজন কিলার সুখারাম নস্করের সঙ্গে।
তিনজন খুনি যে নিজেদের মধ্যে স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করবে এ-কথা শ্রীধর পাট্টা জিশানকে জানাননি। কারণ, সারপ্রাইজ!
জিশান বুঝতে পারল, স্যাটেলাইট ফোনের একটানা সাহায্য নিয়ে তিনটে লাল ডট অত্যন্ত সাবলীলভাবে সবুজ ডটের নিখুঁত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। আর জিশানের স্যাটেলাইট ফোনটা শুধুমাত্র শ্রীধর পাট্টার সঙ্গে কথা বলার জন্য। অনেকটা যেন শ্রীধর আর ওর মধ্যে ইন্টারকম ফোন।
কিলার অপাশি গাড়ি চালাচ্ছিল। গাড়ি চালাতে-চালাতেই ফোনে কথা বলছিল।
আর কিলার সুখারাম একটা চলন্ত বাইকের পিঠে বসে আছে। লাল আর কালো রঙের বাইক। বাঁ-হাতে একটা হাতল ধরে রয়েছে। ডানহাতে ফোন।
টিভিতে ধারাবিবরণী চলছিল।
পোড়খাওয়া মোটাসোটা কমেন্টেটর তখন বলছেন, ‘কিলারদের কথাবার্তা আমরা ভালো করে শুনতে পাচ্ছি না, তবে ওদের প্ল্যানটা মোটামুটি গেস করা যাচ্ছে। ওরা জিশানকে ট্রায়াঙ্গুলার ট্র্যাপে ফেলতে চায়। তাড়াহুড়োর কোনও ব্যাপার নেই…ওদের হাতে এখনও অনেক সময় আছে…।’
এবার টিভির ক্যামেরা অপাশি কানোরিয়ার সিটের ওপরে ফোকাস করল।
কানোরিয়ার পাশেই সিটের ওপরে রাখা আছে কয়েকটা অস্ত্র। তার মধ্যে একটা অদ্ভুত ধরনের বন্দুক। রিভলভারের চেয়ে মাপে একটু বড়, তবে নলটা একটু বেশি মোটা আর লম্বা। ধারাভাষ্যকার অস্ত্রটার পরিচয় দিল : মিসাইল গান। এ থেকে যে-বড় মাপের বুলেট বা শেল বেরোয় সেটা ইনফ্রারেড রশ্মির উৎস লক্ষ্য করে ছুটে যায়। জীবন্ত মানুষের শরীর হল তাপের উৎস। সেই উৎস থেকে অবলোহিত রশ্মি বেরোয়। ফলে আঁকাবাঁকা পথে ছুটে পালানো একজন মানুষকে এই মিসাইল গানের বুলেট আঁকাবাঁকা পথে তাড়া করে হিট করতে পারে।
মিসাইল গানের পাশেই রয়েছে নানান মাপের তিনটে চপার। কানোরিয়ার ‘বাউন্ডারি’ মারার ‘ব্যাট’। কিন্তু আজ ওর সামনে বাউন্ডারি মারার সুযোগ নেই। আজ শুধু জিশান—মানে, একটা ‘শর্ট রান’। কিন্তু এই শর্ট রান নিতে গেলে শত্রুর কাছে পৌঁছতে হবে। দুশমনটাকে পেতে হবে চপারের নাগালে।
কানোরিয়া সম্পর্কে টিভিতে অনেক কথাই শুনেছে জিশান। জেনেছেও অনেক কথা। কিন্তু সেইসব ভয়ংকর তথ্য জানার পরেও ওর কোনও হেলদোল হয়নি। কারণ, ভয় পাওয়ার ব্যাপারটা জিশানের মধ্যে থেকে কয়েক মাস আগেই উধাও হয়ে গেছে।
কিলার অপাশির সঙ্গে কিলার সুখারামের ফোনে কথাবার্তা চলছিল। টিভি ক্যামেরা পালা করে একবার একে আর-একবার ওকে দেখাচ্ছিল—ঠিক সিনেমার মতন।
ছোটমাপের এই প্লেট টিভিটা হাতে না পেলে জিশান খুনিদের স্যাটেলাইট ফোনের ব্যাপারটা জানতেই পারত না। ভাগ্যিস একটা টিভি জোগাড় করার কথা ওর মনে হয়েছিল!
টিভির খোঁজ করতে কাঞ্চন আর টুকটুকিদের বাড়ির কাছেই আবার ফিরে গিয়েছিল জিশান। ওকে ফিরে আসতে দেখে জনতা হইহই করে উঠেছিল। ওর মোটরবাইক ঘিরে ধরেছিল চোখের পলকে।
দু-হাত তুলে ওদের হুল্লোড় আর উৎসাহ থামিয়ে একটা ছোট টিভির জন্য আবেদন করেছিল জিশান। ব্যস, তাতেই কাজ হল। এক মিনিটের মধ্যেই নানান মাপের ছ’-ছ’টা প্লেট টিভি এসে হাজির হল ওর সামনে। তার মধ্যে থেকে আট ইঞ্চি ডায়াগনালের ছোট প্লেট টিভিটা জিশান বেছে নিয়েছিল।
জিশান আর দেরি করল না। ট্র্যাকার আর টিভি গুছিয়ে রেখে বাইকে স্টার্ট দিল। ফ্লাইওভার পেরিয়ে বাঁ-দিকের ঢালু রাস্তা ধরে নেমে গেল।
একটু পরেই জঙ্গল শুরু হয়ে গেল। গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে প্যাঁচালো সুঁড়িপথ। তার ওপর পথটা আবার ডাল, পাতা আর আগাছায় ঢাকা। তারই ওপর দিয়ে জিশানের বাইক কোনওরকমে এগিয়ে চলল।
বাইকের গর্জনে গাছে বসে থাকা পাখিরা চঞ্চল হয়ে ডাকতে লাগল, ডানা ঝাপটে এ-গাছ থেকে ও-গাছে ওড়াউড়ি করতে লাগল। ছোট চেহারার গোলাপি বানরের দল চিঁ-চিঁ শব্দ করে ডালে-ডালে ছোটাছুটি করতে লাগল। ছাইরঙের দুটো খরগোশ চমকে উঠে ছুটে পালাল।
